সারা বিশ্বে এক অনন্যা কালীপুজো: বিন্দোলে ষোড়শী দেবীর আরাধনায় তারাপীঠের মাতৃসাধক শ্রী শিশির কুমার শর্মা

এসপিটি এক্সক্লুসিভ দেশ ধর্ম
শেয়ার করুন

  • তারাপীঠের ত্রিণয়নী আশ্রম প্রতিষ্ঠাতা সাধক শ্রী শিশির কুমার শর্মার বাসভবন বিন্দোলে এই ষোড়শী কালীপুজো এ বছর ৪৩তম বর্ষে পা দিয়েছে।

  • বামাক্ষ্যাপা বাবার উত্তরসূরী শ্রী শঙ্করক্ষ্যাপা বাবার সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় শ্রী শিশির কুমার শর্মার।

  • মা ষোড়শী দশ মহাবিদ্যার তৃতীয় রূপ। ত্রিপুরাসুন্দরী বা ললিত-ত্রিপুরাসুন্দরী মা ভবানী রূপেও খ্যাত। দেবী এখানে পূর্ণতা ও পূর্ণাঙ্গতার স্বরূপ।

সাংবাদিক– অনিরুদ্ধ পাল

Published on: অক্টো ২৫, ২০১৯ @ ২২:৫৪

Schedule for: Oct 27, 2019 @ 23:49

এসপিটি নিউজ, বিন্দোল(উত্তর দিনাজপুর): চিরাচরিত নিষ্ঠা সহকারে সারা ভারতের যে সকল স্থানে শক্তির আরাধনা হয়ে থাকে তার মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের উত্তর দিনাজপুর জেলার বিন্দোল গ্রামে মাতৃসাধক তন্ত্রগুরু মহারাজ শ্রী শিশির কুমার শর্মার পুজো ঐতিহ্য-অভিনবত্বে বিশেষ স্থান অর্জন করেছে। সারা বিশ্বের মধ্যে এ এক অনন্যা কালীপুজো। এ বছর সেই পুজো ৪৩তম বর্ষ স্পর্শ করল। এই পুজো দেখার জন্য শুধু দেশ নয় প্রতিবেশী প্রায় সমস্ত দেশ থেকে বহু ভক্ত একত্রিত হন। যা সত্যি দেখার মতো।

স্বপ্নাদেশেই স্থির হয় মায়ের গায়ের ও শাড়ির রঙ

স্বপ্নাদেশ অনুসারে প্রতিবছরই বদলায় ষোড়শী ভবতারিণী মায়ের শাড়ি ও গায়ের রঙ।পুজোর ভোগ খেতে আসে আজও শেয়ালের দল। সাতজন পুজারি সহযোগে ঁতারা মাতৃসাধক ও তন্ত্রগুরু শ্রী শিশির কুমার শর্মার মাতৃ আরাধনা দেখতে প্রসাদ গ্রহণ করতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার মানুষ ভিড় করেন উত্তর দিনাজপুরের রায়গঞ্জের বিন্দোল গ্রামে। তারাপীঠের ত্রিণয়নী আশ্রম প্রতিষ্ঠাতা সাধক শ্রী শিশির কুমার শর্মার বাসভবনে এই ষোড়শী কালীপুজো এ বছর ৪৩তম বর্ষে পা দিয়েছে।

শঙ্করক্ষ্যাপা বাবা সেদিন ভক্তদের বলেছিলেন, আজ মহাশ্মশানে এসেছে রাজসন্ন্যাসী

বামাক্ষ্যাপা বাবার উত্তরসূরী শ্রী শঙ্করক্ষ্যাপা বাবার সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় শ্রী শিশির কুমার শর্মার। সেই সময় মোক্ষকামী সন্ন্যাসী শঙ্করক্ষ্যাপা বাবা প্রথম দর্শনেই অনুভব করেন যে সৌম্যদর্শন যুবরাজ ভিখারির বেশে উপস্থিত হয়েছেন। শ্রী শঙ্করক্ষ্যাপা বাবা নিজের আসন থেকে উঠে পড়েন। ভক্তদের ডেকে শ্রী শিশির কুমার শর্মাকে দেখিয়ে বলেছিলেন- তোরা দেখে নে, আজ মহাশ্মশানে এসেছে রাজসন্ন্যাসী। বললেন- “ঁতারা নাম কর, ঁতারা নাম কর। পরে তিনি শব সাধনা করে শ্রীগুরুর আশীর্বাদে তন্ত্রসাধক ও শব সাধনায় সিদ্ধিলাভ করেন।

শব-সাধন কি

পরিব্রাজকাচার্য পরমহংস শ্রীমৎ স্বামী নিগমানন্দ সরস্বতী তাঁর ‘তান্ত্রিকগুরু’ বইতে শব-সাধন সম্পর্কে লিখছেন- “তন্ত্রের নামে যাহারা ভ্রু-কুঞ্চিত করিয়া থাকে, তাহারা একবার তন্ত্রশাস্ত্র পর্যালোচনা করিলে নিজের ভ্রম বুঝিতে পারিবে এবং বিস্মিত ও স্তম্ভিত হইয়া সসম্মানে নমস্কার করিবে। সাধনার এরূপ প্রকৃষ্ট পন্থা এবং সাধকের রুচিভেদে স্বভাবনুযায়ী সাধন-পন্থা আর কোন শাস্ত্র প্রকাশ করিতে পারেন নাই। কলির অল্পায়ু জীবগণ যাহাতে অতি অল্প সময়ে সিদ্ধিলাভ করিতে পারে, তন্ত্র সে বিষয়ে কৃতিত্ব দেখাইয়াছেন। অধিকারী হইতে পারিলে সাধক এক রাত্রিতেই ব্রহ্মবিদ্যা সিদ্ধি করিতে পারে। বীর-সাধন তাহার দৃষ্টান্ত। মেহারের সর্ববিদ্যা সর্বানন্দ ঠাকুর একরাত্রি মাত্র শব-সাধন করিয়া ব্রহ্মসাক্ষাৎকার লাভ করিয়াছিলেন।

পথ প্রদর্শক হিসেবে এগিয়ে এসেছেন তারাপীঠের মাতৃসাধক

এই শঙ্করবাবার জন্মস্থান তারাপীঠের কবিচন্দ্রপুরে।শ্রী শিশির কুমার শর্মা তারাপীঠেই ত্রিণয়নী আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন।প্রতি অমাবস্যা তিথিতে মহাসমারোহে মানব কল্যাণে মায়ের পুজোপাঠ যজ্ঞাদি ক্রিয়াকর্ম করে চলেছেন এই আশ্রমে আজকের সময়ে অনিন্দ্যসুন্দরদেবকান্তি দর্শন সাধক পুরুষ শ্যাম ও শ্যামা মায়ের সাধক শিশির কুমার শর্মা। অমন ধীর, স্থির, শান্ত, সংযত, নিষ্পৃহ, মাতৃতৃপ্তি ভক্ত খুব কমই চোখে পড়ে। তাঁর নির্মিত মা মনসা, শ্যাম ও শ্যামা মায়ের মন্দিরেও অসংখ্য ভক্ত ও গুণগ্রাহীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করছেন, তাদের কথা শুনেছেন, তাদের নানা ক্রিয়াকর্মের উপদেশ দিচ্ছেন। সেখানে তাদের কোনও ক্লান্তি নেই। সদাহাস্য, উজ্জ্বল, স্বর্ণমুখ দর্শনে ভক্তরা তৃপ্ত। আজকে যখন মানুষ আর্থিক-সামাজিক সংকটে দুর্দশাগ্রস্ত, রাজনৈতিক রোষানলে জর্জরিত, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট হতে চলেছে সামাজিক বিষ বাক্যে ধরাধাম কলুষিত তখন এগিয়ে এসেছেন দিশারী অর্থাৎ পথ প্রদর্শক হিসেবে। একমাত্র তন্ত্র সাধনায় যিনি সর্বশক্তিমান তিনি এগিয়ে এসে মানুষের দুঃখ-কষ্ট, জরা-ব্যাধি সমস্ত কিছুতেই শান্তি ও স্বস্তি প্রদান করেছেন এবং মহারাজের অলৌকিক ক্রিয়াকর্মে ভক্তরা আজ অভিভূত।

কে এই ষোড়শী

উত্তরবঙ্গের উত্তর দিনাজপুর জেলার বিন্দোল গ্রামে শ্রী শিশির কুমার শর্মার প্রতিষ্ঠিত ভিন্ন ধরনের ষোড়শী কালী পুজো হয়ে আসছে দীর্ঘ ৪২ বছর ধরে।ষোড়শী দশ মহাবিদ্যার তৃতীয় রূপ। এই দশ মহাবিদ্যা হলেন- কালী, ঁতারা, ষোড়শী, ভৈরবী, ভুবনেশ্বরী, ছিন্নমস্তা, ধুমাবতী, বগলা, মাতঙ্গী ও কমলাকামিনী। মা ষোড়শী ত্রিপুরাসুন্দরী বা ললিত-ত্রিপুরাসুন্দরী মা ভবানী রূপেও খ্যাত। দেবী এখানে পূর্ণতা ও পূর্ণাঙ্গতার স্বরূপ। শ্রীকুল সম্প্রদায়ের সর্বোচ্চ দেবী।

পুরাণের কাহিনি অনুসারে দশ মহাবিদ্যার প্রচলন নিয়ে খুব সুন্দর ঘটনা আছে। সেখানে উল্লেখ আছে যে শিব আ তাঁর স্ত্রী পার্বতীর পূর্বাতার দাক্ষায়নী সতীর মধ্যে এক দাম্পত্যকলহ থেকেই এই দশ মহাবিদ্যার সৃষ্টি। পিতা দক্ষের যজ্ঞে আমন্ত্রণ না পেয়েও সতী যখন সেখানে যেতে চান তখন শিব তাঁকে সেখানে যাওয়ার অনুমতি দেননি। ক্রুদ্ধ সতী তখন তাঁর তৃতীয় নয়ন থেকে আগুন বের করতে থাকেন। আর সেই আগুন থেকে কালী বা শ্যামায় পরিণত হন। এই অবস্থা দেখে ভীত শিব সেখান থেকে পালাতে গেলে সতী তাঁর দশ মহাবিদ্যার রূপ ধারণ করে চারিদিক দিয়ে শিবকে ঘিরে ফেলেন। তখন শিব যজ্ঞে যাওয়ার অনুমতি দেন।

‘তান্ত্রিকগুরু’ পুস্তকে মহাকালী সম্পর্কে নিগমানন্দ পরমহংসের ব্যাখ্যা

  • আচার্য নিগমানন্দ পরমহংসদেব তাঁর ‘তান্ত্রিকগুরু’ পুস্তকে মহাকালী সম্পর্কে সুন্দর বর্ণনা করেছেন। তিনি লিখছেন- “এই দেবীদ্বারাই এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড মুগ্ধ হইতেছে, ইনিই এ বিশ্ব সৃষ্টি করেন, ইহার নিকট প্রার্থণা করিলে ইনি তুষ্টা হইয়া জ্ঞান ও সম্পদ প্রদান করেন। এই মহাকালী কর্তৃক অনত বিশ্ব পরিব্যপ্ত আছে, ইনি মহাপ্রলয়কালে ব্রহ্মাদিকেও আত্মসাৎ করেন এবং খণ্ডপ্রলয়ে ইনিই সমস্ত প্রাণীগণকে বিনাশ করিয়া ফেলেন। সৃষ্টিসময়ে সমস্ত বিষয় সৃষ্টি করেন, আবার স্থিতিকালে প্রাণীদিগের পালন করেন, কিন্তু ইহার উৎপত্তি হয় না। ইনি নিত্যা, লোকের অভ্যুদয়কালে ইনি বৃদ্ধিপ্রদা লক্ষ্মী, আবার অভাবের সময়ে অলক্ষ্মীরূপে বিনাশ করিয়া থাকেন। ইহাকে স্তব করিয়া পুষ্প, গন্ধ, ধূপাদি দ্বরা পূজা করিলে বিত্তপুত্রাদি দান ও ধর্মে শুভবুদ্ধি প্রদান করিয়া থাকেন। এই মহাশক্তির শরণাপন্ন হইয়া ইহাকে আরাধনা করিতে পারিলে ভোগ, স্বর্গ ও মুক্তি লাভ হইয়া থাকে।”
  • নিগমানন্দ পরমহংস লিখছেন- “… আমাদের জ্ঞানকে সেই বিষয়রূপিণী মহামায়া সংসারস্থিতিকারণে বিদ্ধ্বংস করিয়া মমতাবর্তপূর্ণ মোহগর্তে নিপাতিত করেন। সে জ্ঞান সেই জ্ঞানাতীত মহামায়া বলদ্বারা আকর্ষণ ও হরণ করিয়া জীবকে সংমুগ্ধ করিয়া রাখেন। এইরূপ করিয়াই তিনি এ জগৎ স্থির রাখিয়াছেন। নতুবা কে কাহার- কাহার জন্য কি? যদি মায়াবরণ উন্মুক্ত হইয়া যায়, যদি মোহের চশমা খুলিয়া পড়ে- তখন কে কাহার পুত্র, কে কাহার কন্যা, কে কাহার স্ত্রী? সেই মহামায়া রূপ, রস, গন্ধ, স্পর্শ, শব্দের হাট বসাইয়া জীবগণকে প্রলুব্ধ করিয়া এই ভবের হাটে খেলা করিতেছেন। এই রূপ্‌ রস, গন্ধ, স্পর্শ, শব্দের প্রলোভনে জীব ছুটিয়া ঘুরিয়া বেড়াইতেছে- ইহার আকর্ষণে জীবসমুদয় উন্মত্ত। “

তন্ত্রগুরু মাতৃসাধক শ্রী শিশির কুমার শর্মা মায়ের রূপ বর্ণনা করলেন

তন্ত্রগুরু শ্রী শিশির কুমার শর্মার কথায়- ভবে-ভাবে এসেছেন মা ভবানী। চতুর্দশী রাতে পঞ্চমুণ্ডির আসন দশভুজা কষ্টিপাথরের ত্রিমুণ্ডি দেবী পূজা পান। পরদিন অমাবস্যার রাত ১২টায় শিবাভোগ ভৈরবী মন্দিরে হয়। এ বছর অমাবস্যা লেগেছে আজ বেলা ১২টা ২৩ মিনিটে ছেড়ে যাবে ২৮ তারিখ সকাল ৯টা ০৮মিনিটে।নিশির সময় রাত ১০টা ৫৫মিনিট থেকে শুরু হয়ে রাত ১১টা ৪৬মিনিট পর্যন্ত। তাই পুজো শুরু হবে রাত পোনে ন’টায়। চলবে নিশি রাত পর্যন্ত। এখানে এখনও শেয়াল এসে এই ভোগ গ্রহণ করে থাকে। ভক্তদের বিশ্বাস- দেবী শেয়াল রূপে এসেই এই প্রসাদ গ্রহণ করে থাকেন। এরপরেই শুরু হয়ে যায় মূল মন্দিরের ষোড়শীরূপে মা ভবানীর পুজো। পূর্ণযৌবনা ১৬ বছর বয়সী গোলাপী বর্ণের গৃহবধূ চুল ছাড়া, হালকা সবুজ রঙের বেনারসী শাড়ি, কোমরে নৃমুণ্ডমালিনী যা ভ্যানিটি ব্যাগে আবৃত, পদতলে শবরূপী শিব বাবা ভোলানাথ অধিষ্ঠিত। এ এক অনন্যা দেবী। পাশে মা মনসা, বাঁদিকে শিবমন্দির। এই দেবদেবীর পুজো করেন স্বয়ং সাধক তান্ত্রিক সন্ন্যাসী তারাপীঠের মহারাজ শ্রী শিশির কুমার শর্মা। এখানকার ষোড়শী ভবতারিণী দেবী মা নিজেই স্বপ্নাদেশ দিয়ে থাকেন। কী রঙের শাড়ি এবং নিজের গায়েরও। মায়ের আদিরূপ দর্শনের জন্য ঝাড়খণ্ড, বিহার, পশ্চিমবঙ্গ, বাংলাদেশ, নেপাল সহ বিভিন্ন এলাকার বহু-মানুষ কালীপুজোর দিন জমায়েত হন। প্রসাদ পান। এই পুজো দেখাটাও সৌভাগ্যের ব্যাপার।

Published on: অক্টো ২৫, ২০১৯ @ ২২:৫৪

Schedule for: Oct 27, 2019 @ 23:49


শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

48 − 40 =