“কোথায় ভূমিষ্ঠ হয়েছিলেন লোকনাথ? আইনি জবানবন্দি ও চাকলাধামের জোরালো সওয়ালে নতুন মোড় !”

Main দেশ ধর্ম ভ্রমণ রাজ্য
শেয়ার করুন

Reporter: Aniruddha Pal

এসপিটি নিউজ, বারাস্‌ ২৫ ডিসেম্বর: আধ্যাত্মিক সাধক মহাপুরুষ ত্রিকালদর্শী বাবা শ্রীশ্রী লোকনাথ ব্রহ্মচারী বাবার জন্মস্থান নিয়ে কয়েক দশক ধরে চলা ‘চাকলা বনাম কচুয়া’ বিতর্কে এবার চূড়ান্ত মোড়। সম্প্রতি উত্তর ২৪ পরগণার চাকলাধামে আয়োজিত ‘বিশ্ব লোকনাথ ভক্ত মহামিলন উৎসব’-এ শ্রীশ্রী লোকনাথ সেবাশ্রম সঙ্ঘের পক্ষ থেকে একটি বিশেষ তথ্যসমৃদ্ধ পুস্তিকা প্রকাশ করা হয়েছে। যেখানে তথ্য-প্রমাণ ও অকাট্য যুক্তি দিয়ে দাবি করা হয়েছে— লোকনাথ বাবার প্রকৃত জন্মস্থান বারাসত মহকুমার দেগঙ্গা ব্লকের অন্তর্গত ‘চাকলা’ গ্রামেই।

আদালতের নথিতে স্বয়ং বাবার স্বীকৃতি: এক অকাট্য প্রমাণ

চাকলাধাম থেকে প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে ১৮৮৫ সালের ৮ই এপ্রিল তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার নারায়ণগঞ্জ আদালতে দেওয়া বাবা লোকনাথের জবানবন্দিকে। ওইদিন অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যাজিস্ট্রেট মি. টি. নেলরের সামনে একটি মামলায় সাক্ষ্য দিতে গিয়ে লোকনাথ বাবা নিজের পরিচয় দিতে গিয়ে বলেছিলেন:

“My name is Lokenath Brahmachari, My father’s name is Ram Narain Ghosal. I am by caste Brahman. My home is at Mouza Chakla, Thana, Zillah Barasat, I reside at present in Mouza Bardi, Thana Narayanmganj, Zillah Dacca, where I am priest” এই জবানবন্দিতে আরও রয়েছেঃ The deposition of Lokenath Brahmachari aged about 60 years….। জনশ্রুতি আছে সাক্ষ্যদানকালে বিপক্ষের উকিল বাবার বয়স জানতে চাইলে বাবা বলেছিলেন, সঠিক বলতে পারব না, তবে ১৫০ কি ১৫৫ বছর হবে। বিপক্ষের উকিল সহ অনেকেই বাবার ঐ বয়স বিশ্বাসযোগ্য মনে করেননি। তখন বাবাব বলেছিলেন, ‘তোমরা যা সঙ্গত মনে করো, তাই লিখে নাও’!

প্রতিবেদনে বলিষ্ঠভাবে যুক্তি দেওয়া হয়েছে যে, যিনি “রণ-বনে-জলে-জঙ্গলে” ভক্তদের রক্ষা করার অভয়বাণী দেন এবং যিনি আজীবন সত্যের পথে চলে ব্রহ্মজ্ঞানী হয়েছেন, তিনি আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে নিজের জন্মস্থান নিয়ে কোনো মিথ্যা তথ্য দিতে পারেন না। তাঁর নিজের দেওয়া এই জবানবন্দিই সমস্ত বিতর্কের অবসান ঘটানোর জন্য যথেষ্ট।

গবেষক ও সমসাময়িক লেখকদের কলমে ‘চাকলা’

পুস্তিকাটিতে একগুচ্ছ প্রথিতযশা লেখক ও সাধকের রচনার উদ্ধৃতি দিয়ে প্রমাণ করা হয়েছে যে, বহু পূর্ব থেকেই চাকলা গ্রামই জন্মস্থান হিসেবে স্বীকৃত।

  • শ্রী নিত্যগোপাল সাহা: বিখ্যাত ‘জীবন্ত গীতা লোকনাথ’ গ্রন্থের লেখক নিত্যগোপাল সাহা (নিত্যদাদু) ১৯৭৬/৭৭ সালে চাকলা গ্রামে বাবার জন্মভিটার খোঁজে এসেছিলেন। তিনি তাঁর গ্রন্থে স্পষ্ট লিখেছেন, ২৪ পরগণা জেলার বারাসত মহকুমার অন্তর্গত দেগঙ্গা থানার চৌরাশি চাকলা গ্রামই হলো সেই মহাপীঠ।
  • অধ্যাপক মহম্মদ আব্দুল নইম: ‘লোকগুরু লোকনাথ’ গ্রন্থের রচয়িতা আব্দুল নইম তাঁর গবেষণায় বারাসত দেগঙ্গা ব্লকের চৌরাশি চাকলা গ্রামকেই বাবার পবিত্র জন্মস্থান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
  • ডঃ অলোক কুমার চক্রবর্তী: তাঁর ‘অন্য চোখে শ্রীশ্রী লোকনাথ ব্রহ্মচারী’ গ্রন্থে বিচার-বিশ্লেষণ ও যুক্তি-তর্কের মাধ্যমে দেখিয়েছেন কেন চাকলাই বাবার প্রকৃত জন্মভূমি।
  • কেদারেশ্বর সেনগুপ্ত: ‘শ্রীশ্রী লোকনাথ-মাহাত্ম্য’ গ্রন্থে তিনি উল্লেখ করেছেন, পিতা রামনারায়ণ ঘোষাল এবং মাতা কমলাদেবীর কোল আলো করে চৌরাশি চাকলা গ্রামেই বাবার আবির্ভাব ঘটেছিল।
  • শঙ্করনাথ রায় তাঁর “ভারতের সাধক” গ্রন্থে লিখেছেন চব্বিশ পরগনার বারাসাত মহকুমার অন্তর্গত “চাকলা” সেই সময়কার এক বর্ধিষ্ণু এবং বিখ্যাত গ্রাম। এই গ্রামের ধর্মপরায়ণ ব্রাহ্মণ বংশীয় ঘোষাল পরিবারের চতুর্থ পুত্র সন্তানই মহাপুরুষ বাবা লোকনাথ।
  • “আমি-ই সেই পরমাত্মা লোকনাথ” গ্রন্থে নারিশা বাবার মুখে শুনে বিভুপদ কীর্তি লিখেছেন, এই কলকাতার কাছাকাছি , বারাসাতের চৌরাশী চাকলা গ্রামে বাংলা ১১৩৮ সনে লোকনাথ জন্মগ্রহণ করেন বলে শুনেছি।
  • “মহাযোগী লোকনাথ ব্রহ্মচারী” গ্রন্থে মিহির কুমার বিশ্বাস বাবা লোকনাথের আবির্ভাব বাংলা ১১৩৭ সনে এবং তিরোধান ১২৯৭ সনে বলেছেন। তিনি লিখেছেন-“২৪ পরগনা জেলার অধীন বারাসাতের অন্তর্গত “চাকলা” গ্রামে রামনারায়ণ ঘোষালের ঔরসে কমলাদেবীর গর্ভে লোকনাথের জন্ম।“
  • “শিবকল্প মহাযোগী বাবা লোকনাথ” গ্রন্থে স্বামী শুদ্ধানন্দ ব্রহ্মচারী লিখেছেন,”১৭৩০ খ্রিস্টাব্দে পশ্চিমবঙ্গের ২৪ পরগনা জেলার বারসাত সাব-ডিভিশনের অন্তর্গত চৌরাশি চাকলা নামে একটি গ্রামে বাবা লোকনাথ জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তাঁর পিতার নাম রামনারায়ণ ঘোষাল এবং মাতার নাম কমলাদেবী।

বাবার মহানাম প্রচারক ও শ্রীশ্রী লোকনাথ সেবাশ্রম সঙ্ঘ , চাকলার চেয়ারম্যান নবকুমার দাস বলেন-“এই পুস্তিকায় ক্ষুদ্র পরিসরে শুধুমাত্র বাবার জন্মস্থান নিয়ে কোনও আলোচনা আমাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নয়। জীবন জগতের কল্যণে, সমাজের সংস্কার, ধর্মীয় মূল্যবোধ, তথা মানব কল্যাণে লোকনাথ বাবার মতো উচ্চকোটি মহাপুরুষের কর্ম ও দর্শন কি , তা জানা একান্ত প্রয়োজন। তাই আমাদের এই ক্ষুদ্র প্রচেষ্টার দ্বারা পুস্তিকাটিতে আলোকপাত করা হয়েছে।“

বিশ্ব মহামিলন উৎসব ও বারদীধামের উপস্থিতি

সম্প্রতি চাকলাধামে অনুষ্ঠিত ভক্ত সম্মেলনে এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত তৈরি হয়। এই উৎসবে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশের ঢাকার বারদীধামের (যেখানে বাবা মহাসমাধি লাভ করেন) প্রতিনিধিরা। বারদীধামের প্রতিনিধিদের এই উপস্থিতি এবং তাঁদের হাতে জন্মস্থান হিসেবে ‘চাকলা’ সংবলিত পুস্তিকা তুলে দেওয়া এক বিশাল কূটনৈতিক ও আধ্যাত্মিক বিজয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। উল্লেখযোগ্যভাবে, সঙ্ঘের পক্ষ থেকে কচুয়ধামের প্রতিনিধিদেরও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল, যা সত্য অনুসন্ধানে তাঁদের স্বচ্ছ মনোভাবকেই প্রকাশ করে।

বিভ্রান্তি নিরসনে সঙ্ঘের কড়া বার্তা

পুস্তিকাটিতে আক্ষেপ প্রকাশ করে বলা হয়েছে যে, একশ্রেণীর লেখক ও আলোচক নিজেদের পাণ্ডিত্য জাহির করতে গিয়ে বাবার জন্মস্থান এমনকি পিতার নাম নিয়েও বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছেন। সঙ্ঘের বক্তব্য, ভক্তদের হৃদয়ের আবেগকে পুঁজি করে অসত্য প্রচার করা ধর্মীয় অপরাধের শামিল। পুস্তিকাটিতে আরও মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, প্রতিবেশী রাষ্ট্র বাংলাদেশের পাঠ্যপুস্তকেও (হিন্দুধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা, ষষ্ঠ শ্রেণী) লোকনাথ বাবার জন্মস্থান হিসেবে চাকলা গ্রামের উল্লেখ রয়েছে।

সঙ্ঘের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সূর্যের আলোকে যেমন হাত দিয়ে ঢেকে রাখা যায় না, তেমনই লোকনাথ বাবার স্বকণ্ঠে বলা সত্যকেও কেউ চিরকাল চাপা দিয়ে রাখতে পারবে না। চাকলা গ্রাম থেকেই ১১ বছর বয়সে উপনয়ন সেরে ভগবান গাঙ্গুলীর সাথে সন্ন্যাস ব্রত পালনে গৃহত্যাগ করেছিলেন বাবা। দীর্ঘ সাধনার পর হিমালয়ের গুহায় ব্রহ্মত্ব লাভ করে তিনি যখন বারদীতে আসীন হন, তখন থেকেই তিনি ‘চাকলা’র সন্তান হিসেবে পরিচিত ছিলেন।

বাবা লোকনাথের মহানাম প্রচারক ও  চাকলা লোকনাথ সেবাশ্রম সঙ্ঘের চেয়ারম্যান নবকুমার দাস এবং কোষাধ্যক্ষ স্বপন সেন জানান,  এই নতুন পুস্তিকা এবং সংগৃহীত নথিপত্র আগামী দিনে গবেষক ও লক্ষ লক্ষ লোকনাথ ভক্তদের জন্য এক নতুন দিশা দেখাবে। সমস্ত বিতর্কের মেঘ কাটিয়ে ‘চাকলা’ যে প্রকৃতই বাবার জন্মস্থান, তা প্রতিদিন হাজার হাজার ভক্তদের উপস্থিতি জোরালো ইঙ্গিত দিয়ে চলেছে ।


শেয়ার করুন