
Published on: জুলা ৩০, ২০২৫ at ১৮:৪২
Reporter: Aniruddha Pal

এসপিটি নিউজ : ভারতীয় পর্যটকদের পছন্দের তালিকায় বিশ্বের সেরা ১০টি দেশ নির্ধারণ করা বেশ কঠিন, কারণ এটি ব্যক্তিগত রুচি, বাজেট এবং ভ্রমণের উদ্দেশ্যের উপর নির্ভর করে। তবে, সাম্প্রতিক প্রবণতা এবং বিভিন্ন সমীক্ষার রিপোর্ট অনুযায়ী কিছু দেশ ভারতীয়দের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়, ক্রম তালিকা অনুযায়ী তা তুলে ধরা হল। কেন ভারতীয়রা এই দেশগুলিতে ভ্রমণ করতে পছন্দ করে তার কারণও খোঁজার চেষ্টা করা হয়েছে।
1) সংযুক্ত আরব আমিরাত (UAE):
ভারতের কাছে সংযুক্ত আরব আমিরাত (UAE) একটি অত্যন্ত পছন্দের গন্তব্য, এর পেছনে বেশ কিছু শক্তিশালী কারণ রয়েছে। ভারতীয় পর্যটক, ব্যবসায়ী এবং প্রবাসীদের জন্য UAE-এর আকর্ষণ মূলত নিম্নলিখিত বিষয়গুলোর উপর নির্ভরশীল:
ভৌগোলিক নৈকট্য ও সহজ যোগাযোগ: ভারত থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতে পৌঁছাতে মাত্র ৩-৪ ঘণ্টা সময় লাগে, যা ভ্রমণের সময় এবং ক্লান্তি কমায়। ভারতের প্রায় সব বড় শহর থেকে দুবাই, আবু ধাবি এবং শারজাহ-তে অসংখ্য সরাসরি ফ্লাইট রয়েছে, যা যাতায়াতকে অত্যন্ত সুবিধাজনক করে তোলে।
ভিসা সহজলভ্যতা: ভারতীয়দের জন্য দুবাই ও অন্যান্য আমিরাতে ভিসা পাওয়া তুলনামূলকভাবে সহজ। অনেক সময় ট্রানজিট ভিসা, ট্যুরিস্ট ভিসা অথবা অন-অ্যারাইভাল ভিসার সুযোগও থাকে (নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষে)। এটি ভ্রমণের পরিকল্পনা সহজ করে।
পর্যটন আকর্ষণ ও বিনোদন:
বিশ্বমানের আকর্ষণ: বুর্জ খলিফা, দুবাই মল, পাম জুমেইরাহ, দুবাই ফাউন্টেন, মিরাকল গার্ডেন, গ্লোবাল ভিলেজ-এর মতো অসংখ্য আধুনিক ও দর্শনীয় স্থান রয়েছে।
বিনোদন পার্ক: থিম পার্ক যেমন দুবাই পার্কস অ্যান্ড রিসর্টস (মোশনগেট, বলিউড পার্কস, লেগোল্যান্ড), আইএমজি ওয়ার্ল্ডস অফ অ্যাডভেঞ্চার ভারতীয় পরিবার ও তরুণদের কাছে খুব জনপ্রিয়।
শপিং স্বর্গ: দুবাই ট্যাক্স-মুক্ত কেনাকাটার জন্য বিখ্যাত, যেখানে বিশ্বের সেরা ব্র্যান্ড থেকে শুরু করে ঐতিহ্যবাহী সোনা ও মশলার বাজার পর্যন্ত সবকিছু পাওয়া যায়। শপিং ফেস্টিভ্যালগুলোও (যেমন দুবাই শপিং ফেস্টিভ্যাল) ভারতীয়দের আকর্ষণ করে।
মরুভূমি সাফারি: অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমীদের জন্য মরুভূমি সাফারি, স্যান্ডবোর্ডিং এবং উটে চড়ার অভিজ্ঞতা একটি বড় আকর্ষণ।
নাইটলাইফ ও খাবার: সংযুক্ত আরব আমিরাতে বিশ্বমানের রেস্তোরাঁ ও নাইটলাইফের ব্যবস্থা আছে, যেখানে ভারতীয় খাবারেরও প্রচুর বিকল্প পাওয়া যায়।
অর্থনীতি ও ব্যবসায়িক সুযোগ: দুবাই মধ্যপ্রাচ্যের একটি প্রধান ব্যবসায়িক কেন্দ্র, যা ভারতীয় ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের জন্য বিনিয়োগ এবং বাণিজ্যের প্রচুর সুযোগ করে দেয়। সংযুক্ত আরব আমিরাতে ভারতীয় প্রবাসীদের একটি বিশাল জনসংখ্যা রয়েছে, যারা কাজের উদ্দেশ্যে সেখানে গেছেন। এই প্রবাসীরা তাদের পরিবার ও বন্ধুদের ভ্রমণের জন্য উৎসাহিত করেন।
নিরাপত্তা ও পরিচ্ছন্নতা: সংযুক্ত আরব আমিরাত বিশ্বের অন্যতম নিরাপদ ও পরিচ্ছন্ন দেশগুলির মধ্যে একটি। পর্যটকরা এখানে স্বাচ্ছন্দ্যে এবং নির্ভয়ে ঘোরাফেরা করতে পারেন।
ভারতীয় সংস্কৃতি ও জীবনধারার সাথে সাদৃশ্য: সংযুক্ত আরব আমিরাতে ভারতীয় প্রবাসীদের বিশাল উপস্থিতির কারণে, ভারতীয় খাবার, পণ্য এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এখানে সহজলভ্য। এটি ভারতীয় পর্যটকদের বিদেশে থেকেও নিজেদের দেশের সাথে একাত্মতা অনুভব করতে সাহায্য করে। অনেক স্থানে হিন্দি ভাষাও প্রচলিত, যা যোগাযোগের সুবিধা করে।
বিশ্বমানের অবকাঠামো: আধুনিক বিমানবন্দর, সুসংগঠিত পরিবহন ব্যবস্থা (যেমন দুবাই মেট্রো), এবং উচ্চমানের হোটেল ও রিসোর্ট পর্যটকদের অভিজ্ঞতাকে আরও উন্নত করে তোলে।

2) থাইল্যান্ড:
থাইল্যান্ড ভারতীয় পর্যটকদের কাছে একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় গন্তব্য, এর পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে। ভারতীয়রা বিভিন্ন কারণে থাইল্যান্ডকে তাদের পছন্দের তালিকায় রাখেন, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
খরচ-সাশ্রয়ী ভ্রমণ : থাইল্যান্ড অন্যান্য অনেক জনপ্রিয় আন্তর্জাতিক গন্তব্যের তুলনায় বেশ সাশ্রয়ী। বাসস্থান, খাবার, পরিবহন এবং কেনাকাটার খরচ তুলনামূলকভাবে কম। ভারতীয় মুদ্রার তুলনায় থাই বাথের বিনিময় হারও বেশ অনুকূল, যা বাজেট-সচেতন ভারতীয় পর্যটকদের আকর্ষণ করে।
ভিসা সহজলভ্যতা: ভারতীয়দের জন্য থাইল্যান্ডে ভিসা প্রক্রিয়া তুলনামূলকভাবে সহজ। বর্তমানে (জুলাই ২০২৫ অনুযায়ী) ভারতীয় পাসপোর্টধারীরা থাইল্যান্ডে “ভিসা অন অ্যারাইভাল” সুবিধা পান, যা ভ্রমণের পরিকল্পনাকে অনেক সহজ করে তোলে। এই সুবিধাটি নভেম্বরের (২০২৪ সালের) পর পরিবর্তন হতে পারে, তবে সামগ্রিকভাবে ভিসা প্রক্রিয়া সহজ হওয়ার প্রবণতা রয়েছে।
ভৌগোলিক নৈকট্য ও সহজ যোগাযোগ: ভারত থেকে থাইল্যান্ডের ফ্লাইট দূরত্ব খুব বেশি নয়, প্রায় ৩ থেকে ৫ ঘণ্টার ফ্লাইট লাগে। ভারতের বিভিন্ন বড় শহর থেকে সরাসরি ফ্লাইটের সহজলভ্যতাও একে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে।
বৈচিত্র্যময় আকর্ষণ: থাইল্যান্ড সব ধরনের পর্যটকদের জন্য কিছু না কিছু অফার করে:
সুন্দর সৈকত ও দ্বীপপুঞ্জ: ফুকেট, পাতায়া, ফি ফি দ্বীপ, কো সামুই, ক্রাবি-এর মতো স্থানগুলো তাদের মনোরম সৈকত, ফিরোজা জলরাশি এবং ওয়াটার স্পোর্টসের জন্য বিখ্যাত। এটি হানিমুন বা রিল্যাক্সিং ছুটির জন্য আদর্শ।
প্রাণবন্ত শহর ও নাইটলাইফ: ব্যাংককের মতো শহরগুলো তাদের ব্যস্ত রাস্তা, আধুনিক শপিং মল, ঐতিহ্যবাহী বাজার এবং দারুণ নাইটলাইফের জন্য পরিচিত।
ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক স্থান: ব্যাংককের গ্র্যান্ড প্যালেস, ওয়াট অরুন, ওয়াট পো-এর মতো অসংখ্য সুন্দর বৌদ্ধ মন্দির এবং প্রাচীন শহর আয়ুথায়া থাইল্যান্ডের সমৃদ্ধ সংস্কৃতি ও ইতিহাসের পরিচয় দেয়।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও অ্যাডভেঞ্চার: চিয়াং মাইয়ের পাহাড়, জঙ্গল ট্রেকিং, এলিফ্যান্ট স্যাংচুয়ারি, এবং স্কুবা ডাইভিং-এর মতো অ্যাডভেঞ্চার কার্যক্রমও পর্যটকদের আকর্ষণ করে।
সুস্বাদু খাবার: থাই খাবার বিশ্বজুড়ে বিখ্যাত। প্যাড থাই, টম ইয়াম স্যুপ, গ্রিন কারি এবং ম্যাঙ্গো স্টিকি রাইসের মতো পদগুলো ভারতীয়দের কাছেও খুব জনপ্রিয়। স্ট্রিট ফুডের বৈচিত্র্য ও সাশ্রয়ী মূল্য পর্যটকদের জন্য একটি বিশেষ আকর্ষণ।
কেনাকাটার সুযোগ : থাইল্যান্ড কেনাকাটার জন্য একটি স্বর্গ। ব্যাংককের চাতুচাক উইকেন্ড মার্কেট, এশিয়াটিক দি রিভারফ্রন্ট-এর মতো স্থানগুলোতে স্থানীয় হস্তশিল্প থেকে শুরু করে আধুনিক পণ্য পর্যন্ত সবকিছুই সাশ্রয়ী মূল্যে পাওয়া যায়।
ভারতীয় সংস্কৃতির সাথে কিছুটা সাদৃশ্য: থাইল্যান্ডে বৌদ্ধ ধর্মের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে, যা ভারতীয় সংস্কৃতির সাথে কিছু ক্ষেত্রে সাদৃশ্যপূর্ণ। থাই মানুষের উষ্ণ আতিথেয়তা এবং পারিবারিক মূল্যবোধও ভারতীয়দের কাছে পরিচিত মনে হয়।
পরিবার-বান্ধব গন্তব্য: থাইল্যান্ড পরিবার নিয়ে ভ্রমণের জন্য একটি চমৎকার জায়গা। এখানে শিশুদের জন্য অনেক বিনোদন পার্ক এবং আকর্ষণ রয়েছে, যা পুরো পরিবারের জন্য একটি আনন্দদায়ক ছুটি নিশ্চিত করে।

3) সিঙ্গাপুর:
সিঙ্গাপুর ভারতীয় পর্যটকদের কাছে একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় গন্তব্য, এর কারণগুলো হলো:
আধুনিক অবকাঠামো ও বিশ্বমানের সুযোগ-সুবিধা: সিঙ্গাপুর বিশ্বের অন্যতম পরিষ্কার এবং নিরাপদ শহরগুলির মধ্যে একটি। পর্যটকরা এখানে নিশ্চিন্তে এবং স্বাচ্ছন্দ্যে ঘুরে বেড়াতে পারেন। এমআরটি (MRT) এবং অন্যান্য পাবলিক পরিবহন ব্যবস্থা অত্যন্ত দক্ষ ও সহজলভ্য, যা সিঙ্গাপুরের বিভিন্ন স্থানে সহজে যাতায়াত নিশ্চিত করে। সব ধরনের বাজেট এবং রুচি অনুযায়ী এখানে বিলাসবহুল থেকে শুরু করে সাশ্রয়ী হোটেল ও আবাসন ব্যবস্থা রয়েছে।
পরিবার-বান্ধব গন্তব্য: সিঙ্গাপুরে শিশুদের জন্য অসংখ্য আকর্ষণ এবং বিনোদনের ব্যবস্থা রয়েছে। ইউনিভার্সাল স্টুডিওস সিঙ্গাপুর, সেন্টোসা দ্বীপ, এস.ই.এ. অ্যাকোয়ারিয়াম, সিঙ্গাপুর জু, নাইট সাফারি এবং গার্ডেনস বাই দ্য বে (সুপারট্রি গ্রোভ)-এর মতো স্থানগুলো পরিবার নিয়ে ভ্রমণের জন্য আদর্শ।
শপিং ও কেনাকাটা: সিঙ্গাপুর একটি শপিং হাব হিসেবে পরিচিত। অর্চার্ড রোড-এর মতো স্থানগুলোতে বিশ্বের সেরা ব্র্যান্ডের দোকান থেকে শুরু করে স্থানীয় জিনিসপত্র কেনার জন্য অসংখ্য শপিং মল ও বুটিক রয়েছে। ইলেক্ট্রনিক্স এবং অন্যান্য পণ্য এখানে ট্যাক্স-মুক্ত হওয়ায় তা আরও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।
বৈচিত্র্যময় রন্ধনপ্রণালী: সিঙ্গাপুরে বিভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের বসবাস, যার ফলে এখানে খাবারের বিশাল বৈচিত্র্য রয়েছে। চাইনিজ, মালয়, ইন্ডিয়ান, ওয়েস্টার্ন – সব ধরনের খাবার এখানে পাওয়া যায়। হকার সেন্টারগুলো (যেমন লাউ পা সাত, ম্যাক্সওয়েল ফুড সেন্টার) সাশ্রয়ী মূল্যে সুস্বাদু স্থানীয় খাবারের জন্য বিখ্যাত। ভারতীয় খাবারের সহজলভ্যতাও ভারতীয় পর্যটকদের জন্য একটি বাড়তি সুবিধা।
আকর্ষণীয় পর্যটন স্পট: গার্ডেনস বাই দ্য বে: অত্যাশ্চর্য সুপারট্রি গ্রোভ, ক্লাউড ফরেস্ট এবং ফ্লাওয়ার ডোম পর্যটকদের মুগ্ধ করে। সেন্টোসা দ্বীপ: এই দ্বীপে ইউনিভার্সাল স্টুডিওস, এস.ই.এ. অ্যাকোয়ারিয়াম, সি-লায়ন মূর্তি, বিচ এবং আরও অনেক বিনোদনমূলক আকর্ষণ রয়েছে। মেরিনা বে স্যান্ডস: আইকনিক এই হোটেল তার স্কাইপার্ক, ইনফিনিটি পুল এবং শপিং মলের জন্য পরিচিত। সিঙ্গাপুর জু ও নাইট সাফারি: বন্যপ্রাণী প্রেমীদের জন্য এটি একটি অসাধারণ অভিজ্ঞতা।
সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য: সিঙ্গাপুরে চাইনিজ, মালয়, ভারতীয় এবং ইউরেশীয় সংস্কৃতির এক সুন্দর মিশ্রণ দেখা যায়। লিটল ইন্ডিয়া এবং চায়নাটাউনের মতো স্থানগুলো বিভিন্ন সংস্কৃতির এক ঝলক দেখার সুযোগ করে দেয়।
বিমান যোগাযোগ ও ট্রানজিট সুবিধা: চাঙ্গি বিমানবন্দর বিশ্বের অন্যতম সেরা বিমানবন্দর, যা নিজেই একটি আকর্ষণ। অনেক ভারতীয় ইউরোপ বা অন্যান্য দূরবর্তী গন্তব্যে যাওয়ার পথে সিঙ্গাপুরে ট্রানজিট করে, এবং এই সুযোগে সিঙ্গাপুর ঘুরে দেখেন।

4) মালদ্বীপ:
মালদ্বীপ ভারতীয়দের কাছে একটি অত্যন্ত পছন্দের ভ্রমণ গন্তব্য হওয়ার বেশ কিছু কারণ রয়েছে। এখানে কিছু প্রধান কারণ আলোচনা করা হলো:
অপূর্ব প্রাকৃতিক সৌন্দর্য: মালদ্বীপ তার সুন্দর সাদা বালির সৈকত, ফিরোজা রঙের স্বচ্ছ জল এবং শ্বাসরুদ্ধকর প্রবাল প্রাচীরের জন্য বিশ্বজুড়ে বিখ্যাত। এই মনোমুগ্ধকর দৃশ্য ভারতীয় পর্যটকদের, বিশেষ করে হানিমুনার এবং যারা শান্ত পরিবেশে ছুটি কাটাতে চান, তাদের আকর্ষণ করে। প্রতিটি দ্বীপই যেন এক একটি ছবির মতো সুন্দর।
বিলাসবহুল রিসোর্ট এবং ওভারওয়াটার বাংলো: মালদ্বীপ তার বিলাসবহুল রিসোর্টগুলির জন্য পরিচিত, যার বেশিরভাগই ব্যক্তিগত দ্বীপে অবস্থিত। এখানে অত্যাধুনিক সুযোগ-সুবিধা সহ সুন্দর ওভারওয়াটার বাংলো এবং বিচ ভিলা রয়েছে, যা পর্যটকদের সম্পূর্ণ গোপনীয়তা এবং অনন্য অভিজ্ঞতা দেয়। এটি ভারতীয় উচ্চবিত্ত এবং সেলিব্রিটিদের কাছেও খুব জনপ্রিয়।
জলক্রীড়া এবং অ্যাডভেঞ্চার: মালদ্বীপে প্রচুর উত্তেজনাপূর্ণ জলক্রীড়া করার সুযোগ রয়েছে। স্নরকেলিং, স্কুবা ডাইভিং, সার্ফিং, কায়াকিং, প্যাডেলবোর্ডিং, জেট স্কিইং, প্যারাসেইলিং ইত্যাদি কার্যকলাপের মাধ্যমে পর্যটকরা এখানকার সমৃদ্ধ সামুদ্রিক জীবন এবং রঙিন প্রবাল প্রাচীর উপভোগ করতে পারেন।
যাতায়াতের সুবিধা এবং কম দূরত্ব: ভারতের দক্ষিণ প্রান্তের শহরগুলি (যেমন তিরুবনন্তপুরম, কোচি) থেকে মালদ্বীপের দূরত্ব তুলনামূলকভাবে কম। বিমানের ভাড়া সহজলভ্য হওয়ায় ভারতীয় পর্যটকদের জন্য এটি দ্রুত এবং সুবিধাজনক একটি গন্তব্য।
রোমান্টিক পরিবেশ: হানিমুনার এবং দম্পতিদের জন্য মালদ্বীপ একটি স্বপ্নের গন্তব্য। নির্জন রিসোর্ট, মনোরম প্রাকৃতিক দৃশ্য এবং বিলাসবহুল থাকার ব্যবস্থা এটিকে রোমান্টিক ছুটির জন্য উপযুক্ত করে তোলে। ক্যান্ডেললাইট ডিনার, দম্পতিদের ম্যাসাজ এবং সূর্যাস্তের ক্রুজ এই অভিজ্ঞতাকে আরও বিশেষ করে তোলে।
বিভিন্ন বাজেটের বিকল্প: যদিও মালদ্বীপ বিলাসবহুল গন্তব্য হিসাবে পরিচিত, তবে আজকাল স্থানীয় দ্বীপগুলিতে গেস্ট হাউস এবং বাজেট-বান্ধব থাকার জায়গার বিকল্পও উপলব্ধ। এটি বিভিন্ন বাজেটের ভারতীয় পর্যটকদের জন্য মালদ্বীপকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
ভারতীয় প্রভাব এবং সংস্কৃতি: মালদ্বীপের সংস্কৃতিতে ভারতীয়, শ্রীলঙ্কান এবং আরব সংস্কৃতির একটি মিশ্রণ দেখা যায়। স্থানীয়রা বন্ধুত্বপূর্ণ এবং স্বাগত জানায়, যা ভারতীয় পর্যটকদের জন্য একটি পরিচিত পরিবেশ তৈরি করে। এমনকি কিছু স্থানীয় রেস্তোরাঁতেও ভারতীয় খাবারের সন্ধান মেলে।
নিরাপত্তা এবং শান্তি: মালদ্বীপ একটি নিরাপদ এবং শান্তিপূর্ণ দেশ, যা পর্যটকদের জন্য একটি চিন্তামুক্ত ভ্রমণের অভিজ্ঞতা নিশ্চিত করে।

5) নেপাল:
নেপাল ভারতীয়দের কাছে একটি অত্যন্ত পছন্দের ভ্রমণ গন্তব্য হওয়ার বেশ কিছু সুস্পষ্ট কারণ রয়েছে। এর ভৌগোলিক নৈকট্য, সাংস্কৃতিক মিল এবং অর্থনৈতিক সাশ্রয় এটিকে ভারতীয় পর্যটকদের কাছে বিশেষ আকর্ষণীয় করে তুলেছে। নিচে এর প্রধান কারণগুলো তুলে ধরা হলো:
ভিসা-মুক্ত ভ্রমণ এবং সহজ প্রবেশাধিকার: ভারতীয় নাগরিকদের জন্য নেপাল ভ্রমণ করতে কোনো ভিসার প্রয়োজন হয় না। পাসপোর্ট, ভোটার আইডি কার্ড বা আধার কার্ডের মতো বৈধ ভারতীয় পরিচয়পত্র থাকলেই নেপালে প্রবেশ করা যায়। এটি ভ্রমণ প্রক্রিয়াকে অত্যন্ত সহজ এবং ঝামেলামুক্ত করে তোলে। স্থলপথ এবং আকাশপথে উভয় মাধ্যমেই নেপালে সহজে যাওয়া যায়।
সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় সাদৃশ্য: নেপাল একটি হিন্দু ও বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ, যেখানে অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় স্থান রয়েছে। পশুপতিনাথ মন্দির (হিন্দুদের জন্য), লুম্বিনি (গৌতম বুদ্ধের জন্মস্থান) এবং স্বয়ম্ভুনাথ স্তূপের মতো স্থানগুলো ভারতীয় ধর্মপ্রাণ পর্যটকদের জন্য অত্যন্ত আকর্ষণীয়। এখানকার সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং জীবনধারায় ভারতের সাথে অনেক মিল খুঁজে পাওয়া যায়, যা ভারতীয়দের জন্য একটি পরিচিত ও আরামদায়ক পরিবেশ তৈরি করে।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও হিমালয়: নেপাল হিমালয় পর্বতমালার পাদদেশে অবস্থিত একটি দেশ, যেখানে পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্টসহ অসংখ্য তুষারাবৃত পর্বত, সবুজ উপত্যকা, নদী এবং জলপ্রপাত রয়েছে। প্রকৃতিপ্রেমী এবং অ্যাডভেঞ্চার সন্ধানকারীদের জন্য নেপাল একটি স্বর্গরাজ্য। ট্রেকিং, মাউন্টেনিয়ারিং, প্যারাগ্লাইডিং, রাফটিং এবং বাঞ্জি জাম্পিংয়ের মতো অ্যাডভেঞ্চার কার্যকলাপের জন্য নেপাল বিশ্বজুড়ে বিখ্যাত। পোখরার মতো শহরগুলো লেক এবং পাহাড়ের মনোরম দৃশ্যের জন্য পরিচিত।
বাজেট-বান্ধব ভ্রমণ: মালদ্বীপের মতো বিলাসবহুল গন্তব্যের তুলনায় নেপাল ভারতীয়দের জন্য অনেক বেশি বাজেট-বান্ধব। থাকা-খাওয়া, যাতায়াত এবং পর্যটন খরচ তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায় কম খরচে বিদেশ ভ্রমণের স্বপ্ন পূরণ করতে ইচ্ছুক ভারতীয়দের কাছে এটি একটি আদর্শ গন্তব্য।
আতিথেয়তা এবং ভাষা: নেপালিরা তাদের উষ্ণ আতিথেয়তার জন্য পরিচিত। এছাড়া, নেপালি ভাষা ভারতের অনেক অঞ্চলের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ, এবং ইংরেজি ও হিন্দি ভাষাভাষীরাও নেপালে সহজেই যোগাযোগ করতে পারেন, যা ভারতীয় পর্যটকদের জন্য একটি স্বস্তিদায়ক অভিজ্ঞতা প্রদান করে।
ইতিহাস ও ঐতিহ্য: কাঠমান্ডু উপত্যকার তিনটি প্রাচীন শহর কাঠমান্ডু, পাটন এবং ভক্তপুর ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের অংশ। এখানকার প্রাচীন মন্দির, রাজপ্রাসাদ, ঐতিহাসিক স্থাপত্য এবং শিল্পকর্ম পর্যটকদের মন মুগ্ধ করে। এটি নেপালের সমৃদ্ধ ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সাক্ষী।
বন্যপ্রাণী এবং প্রকৃতি: নেপালের চিতওয়ান ন্যাশনাল পার্ক এবং বারদিয়া ন্যাশনাল পার্কের মতো স্থানে বেঙ্গল টাইগার, এক শিংওয়ালা গন্ডার, চিতাবাঘ এবং বিভিন্ন প্রজাতির পাখির মতো বন্যপ্রাণী দেখা যায়। বন্যপ্রাণী প্রেমীদের জন্যও নেপাল একটি আকর্ষণীয় গন্তব্য।

6) ভুটান:
ভুটান ভারতীয়দের কাছে একটি অত্যন্ত পছন্দের ভ্রমণ গন্তব্য হওয়ার বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে। এর মূল ভিত্তি হলো সাংস্কৃতিক নৈকট্য, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং বিশেষত ভুটানের “উচ্চ মূল্য, নিম্ন আয়তন” (High Value, Low Volume) পর্যটন নীতি, যা একটি অনন্য অভিজ্ঞতা প্রদান করে।
এখানে কিছু প্রধান কারণ আলোচনা করা হলো:
ভিসা-মুক্ত প্রবেশাধিকার (Permit System): ভারতীয় নাগরিকদের জন্য ভুটানে প্রবেশ করতে ভিসার প্রয়োজন হয় না। একটি বৈধ ভারতীয় পাসপোর্ট বা ভোটার আইডি কার্ড থাকলেই প্রবেশাধিকার (Entry Permit) পাওয়া যায়। এটি ভ্রমণ প্রক্রিয়াকে অত্যন্ত সহজ এবং ঝামেলামুক্ত করে তোলে। স্থলপথ বা আকাশপথে ভুটানে প্রবেশ করা যায়।
সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় সাদৃশ্য: ভুটান একটি বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ, যেখানে বজ্রযান বৌদ্ধধর্মের গভীর প্রভাব দেখা যায়। এখানকার মন্দির, মঠ এবং উপাসনা পদ্ধতি ভারতীয় বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী ও সংস্কৃতিপ্রেমীদের জন্য অত্যন্ত আকর্ষণীয়। ভুটানের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং জীবনধারায় ভারতের সাথে অনেক মিল খুঁজে পাওয়া যায়, বিশেষ করে হিমালয়ের পাদদেশের রাজ্যগুলির সাথে।
অপূর্ব প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও হিমালয়: ভুটান তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য পরিচিত। তুষারাবৃত পর্বতশৃঙ্গ, গভীর উপত্যকা, ঘন জঙ্গল, স্ফটিক স্বচ্ছ নদী এবং মনোরম দৃশ্যপট পর্যটকদের মুগ্ধ করে। এটি প্রকৃতিপ্রেমী এবং ট্রেকিং ও হাইকিংয়ের মতো অ্যাডভেঞ্চার কার্যকলাপের জন্য আদর্শ। “ড্রাগন কিংডম” নামে পরিচিত এই দেশটি তার পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য সুপরিচিত।
শান্তিপূর্ণ ও পরিচ্ছন্ন পরিবেশ: ভুটান বিশ্বের অন্যতম শান্তিপূর্ণ এবং পরিচ্ছন্ন দেশগুলির মধ্যে একটি। দূষণমুক্ত বাতাস এবং কোলাহলমুক্ত পরিবেশ পর্যটকদের জন্য একটি আরামদায়ক এবং সতেজ অভিজ্ঞতা প্রদান করে। এটি শহর জীবনের চাপ থেকে মুক্তির জন্য একটি আদর্শ স্থান।
সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ: ভুটান তার সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়। দেশটির স্থাপত্য, পোশাক, উৎসব এবং জীবনযাপন পদ্ধতি ঐতিহ্যবাহী ভুটানি রীতিনীতি দ্বারা প্রভাবিত, যা পর্যটকদের জন্য একটি অনন্য সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা প্রদান করে। পারো সেচু বা থিম্পু সেচুর মতো উৎসবগুলি দেখার মতো।
সীমাবদ্ধ পর্যটন নীতি (Sustainable Tourism): ভুটান “উচ্চ মূল্য, নিম্ন আয়তন” নীতি অনুসরণ করে। এর অর্থ হলো তারা পর্যটকদের সংখ্যা সীমিত রেখে পর্যটনের মান উন্নত করতে চায়। যদিও এটি অন্যান্য দেশের তুলনায় কিছুটা ব্যয়বহুল হতে পারে (ভারতীয়দের জন্য ভিন্ন নিয়ম প্রযোজ্য, পরে ব্যাখ্যা করা হয়েছে), এটি পরিবেশের উপর চাপ কমায় এবং পর্যটকদের জন্য আরও বিশেষ ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা নিশ্চিত করে।
আতিথেয়তা এবং নিরাপত্তা: ভুটানের মানুষ তাদের উষ্ণ আতিথেয়তার জন্য পরিচিত। পর্যটকদের প্রতি তাদের বন্ধুত্বপূর্ণ মনোভাব এবং দেশের উচ্চ নিরাপত্তা ভারতীয় পর্যটকদের জন্য একটি স্বস্তিদায়ক ভ্রমণের অভিজ্ঞতা নিশ্চিত করে।
বাজেট-বান্ধব বিকল্প (নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে): যদিও ভুটানে অন্যান্য দেশের পর্যটকদের জন্য একটি “সাস্টেনিবল ডেভেলপমেন্ট ফি” (SDF) বা দৈনিক ফি প্রযোজ্য, ভারতীয় পর্যটকদের জন্য এই ফি কিছুটা কম এবং সাম্প্রতিক সময়ে ভুটান সরকার ভারতীয়দের জন্য SDF চালু করেছে (প্রতিদিন প্রায় ১২০০ টাকা বা ১৫ ডলার)। তবে অন্যান্য দেশের নাগরিকদের জন্য এটি অনেক বেশি (১০০ ডলার বা তার বেশি)। এটি ভারতীয়দের জন্য ভুটানকে তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী করে তোলে।

7) শ্রীলঙ্কা:
শ্রীলঙ্কা ভারতীয়দের কাছে একটি অত্যন্ত পছন্দের ভ্রমণ গন্তব্য হওয়ার বেশ কিছু কারণ রয়েছে। ভৌগোলিক নৈকট্য, সাংস্কৃতিক মিল, বৈচিত্র্যময় আকর্ষণ এবং তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী হওয়ার কারণে এটি ভারতীয় পর্যটকদের কাছে বেশ জনপ্রিয়। নিচে এর প্রধান কারণগুলো তুলে ধরা হলো:
ভৌগোলিক নৈকট্য ও সহজ প্রবেশাধিকার: শ্রীলঙ্কা ভারতের দক্ষিণ উপকূলে অবস্থিত, যা বিমানে মাত্র কয়েক ঘণ্টার যাত্রা। ভারতের চেন্নাই, ব্যাঙ্গালুরু, মুম্বাই এবং দিল্লিসহ বিভিন্ন শহর থেকে সরাসরি ফ্লাইট পাওয়া যায়। এই সহজলভ্যতা এবং কম ভ্রমণের সময় ভারতীয়দের জন্য এটিকে একটি সুবিধাজনক আন্তর্জাতিক গন্তব্য করে তোলে।
ভিসা সুবিধা: শ্রীলঙ্কা ভারতীয় নাগরিকদের জন্য ভিসা প্রাপ্তি তুলনামূলকভাবে সহজ করে দিয়েছে। সাধারণত, অনলাইন এন্ট্রি ভিসা (ETA – Electronic Travel Authorization) এর মাধ্যমে সহজেই ভিসা পাওয়া যায়, যা ভ্রমণের প্রক্রিয়াকে সরল করে তোলে।
সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় সাদৃশ্য: শ্রীলঙ্কায় ভারতীয় সংস্কৃতির, বিশেষ করে তামিল সংস্কৃতির, গভীর প্রভাব রয়েছে। এখানকার ভাষা, খাদ্য এবং কিছু ঐতিহ্য ভারতীয়দের কাছে পরিচিতি অনুভব করায়। বৌদ্ধ ধর্মের তীর্থস্থান হিসেবেও শ্রীলঙ্কা গুরুত্বপূর্ণ, যেমন ক্যান্ডির ডালান্ডা মালিগাওয়া (বুদ্ধের দাঁতের মন্দির) এবং অনুরাধাপুরা, যা ভারতীয় বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয়। রামায়ণ সার্কিটের মতো স্থানগুলোও ভারতীয় হিন্দুদের কাছে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
বৈচিত্র্যময় আকর্ষণ: শ্রীলঙ্কা একটি ছোট দেশ হলেও এখানে পর্যটকদের জন্য রয়েছে অসংখ্য বৈচিত্র্যময় আকর্ষণ:
সুন্দর সমুদ্র সৈকত: ম্যালীবু, উনাওয়াতুনা, হিক্কাডুয়া এবং বেন্টোটার মতো সৈকতগুলো সূর্যস্নান, ওয়াটার স্পোর্টস এবং রিল্যাক্সেশনের জন্য চমৎকার।
সবুজ পাহাড় ও চা বাগান: নুয়ারা এলিয়া এবং এলা-র মতো পার্বত্য অঞ্চলে মনোমুগ্ধকর চা বাগান, জলপ্রপাত এবং মনোরম দৃশ্য রয়েছে, যা প্রশান্তিদায়ক।
বন্যপ্রাণী: ইয়ালার মতো জাতীয় উদ্যানগুলোতে লেপার্ড, হাতি এবং বিভিন্ন প্রজাতির পাখি দেখা যায়, যা বন্যপ্রাণী প্রেমীদের জন্য আদর্শ।
ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক স্থান: সিগিরিয়া রক ফোর্ট, ডাম্বুলা গুহা মন্দির, পোলোনারুয়া এবং অনুরাধাপুরার প্রাচীন ধ্বংসাবশেষগুলো ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে তালিকাভুক্ত এবং এগুলো শ্রীলঙ্কার সমৃদ্ধ ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে তুলে ধরে।
বাজেট-বান্ধব ভ্রমণ: মালদ্বীপের মতো বিলাসবহুল গন্তব্যের তুলনায় শ্রীলঙ্কা ভারতীয়দের জন্য অনেক বেশি বাজেট-বান্ধব। থাকা-খাওয়া, স্থানীয় যাতায়াত এবং পর্যটন খরচ তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায় কম খরচে একটি আন্তর্জাতিক ছুটি কাটাতে ইচ্ছুক ভারতীয়দের কাছে এটি একটি আদর্শ বিকল্প।
* খাদ্য: শ্রীলঙ্কার খাবার দক্ষিণ ভারতীয় খাবারের সাথে বেশ মিল রাখে, বিশেষ করে নারকেল এবং মশলার ব্যবহার। এটি ভারতীয় পর্যটকদের জন্য খাবারের বিষয়ে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতে সহায়তা করে। সামুদ্রিক খাবারের প্রাচুর্যও একটি বাড়তি আকর্ষণ।
আতিথেয়তা: শ্রীলঙ্কার মানুষ তাদের উষ্ণ আতিথেয়তা এবং বন্ধুত্বপূর্ণ স্বভাবের জন্য পরিচিত, যা ভারতীয় পর্যটকদের জন্য একটি স্বস্তিদায়ক এবং আনন্দময় ভ্রমণ অভিজ্ঞতা প্রদান করে।

8) মালয়েশিয়া:
মালয়েশিয়া ভারতীয়দের কাছে একটি জনপ্রিয় ভ্রমণ গন্তব্য হওয়ার বেশ কিছু কারণ রয়েছে। ভৌগোলিক নৈকট্য, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য, আধুনিক অবকাঠামো এবং পর্যটকদের জন্য বিভিন্ন আকর্ষণীয় স্থান এটিকে ভারতীয়দের কাছে পছন্দের করে তুলেছে। নিচে এর প্রধান কারণগুলো আলোচনা করা হলো:
ভৌগোলিক নৈকট্য ও সহজ যোগাযোগ : মালয়েশিয়া দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় অবস্থিত, যা ভারত থেকে তুলনামূলকভাবে কাছে। ভারতের প্রধান শহরগুলো থেকে মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে নিয়মিত সরাসরি ফ্লাইট রয়েছে। ভ্রমণের সময় কম এবং ফ্লাইটের সহজলভ্যতা ভারতীয় পর্যটকদের জন্য মালয়েশিয়াকে একটি সুবিধাজনক আন্তর্জাতিক গন্তব্য করে তুলেছে।
সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ও ভারতীয় প্রভাব : মালয়েশিয়া একটি বহু-সাংস্কৃতিক দেশ যেখানে মালয়, চীনা, ভারতীয় এবং স্থানীয় জাতিগোষ্ঠীর সহাবস্থান রয়েছে। বিশেষ করে ভারতীয় সংস্কৃতির একটি শক্তিশালী উপস্থিতি এখানে দেখা যায়, যা ভারতীয় পর্যটকদের কাছে পরিচিতি অনুভব করায়। তামিল ভাষার প্রচলন, ভারতীয় মন্দির এবং বিভিন্ন ভারতীয় উৎসবের উদযাপন এখানকার সংস্কৃতির অংশ। খাবারের ক্ষেত্রেও ভারতীয় রেস্তোরাঁ এবং স্ট্রিট ফুডের ব্যাপকতা ভারতীয়দের কাছে আকর্ষণীয়।
বৈচিত্র্যময় আকর্ষণ, মালয়েশিয়ায় সব ধরনের পর্যটকদের জন্য কিছু না কিছু আছে:
* শহুরে আকর্ষণ: কুয়ালালামপুর তার আধুনিক আকাশচুম্বী অট্টালিকা, যেমন আইকনিক পেট্রোনাস টুইন টাওয়ার্স, বুটিক শপিং মল এবং প্রাণবন্ত নাইটলাইফের জন্য বিখ্যাত। বাটু গুহা (Batu Caves)-এর মতো ধর্মীয় স্থানগুলোও এই শহরেই অবস্থিত।
* প্রাকৃতিক সৌন্দর্য: লাঙ্কাউইয়ের মতো দ্বীপগুলো তাদের সুন্দর সৈকত, ম্যানগ্রোভ বন এবং জলক্রীড়ার জন্য পরিচিত। ক্যামেরন হাইল্যান্ডস-এর সবুজ চা বাগান এবং মনোরম আবহাওয়া পর্যটকদের মন মুগ্ধ করে।
* বন্যপ্রাণী ও অ্যাডভেঞ্চার: মালয়েশিয়ার রেইনফরেস্টে রয়েছে সমৃদ্ধ বন্যপ্রাণী, যার মধ্যে ওরাং ওটাং অন্যতম। এছাড়াও রয়েছে বিভিন্ন অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টস যেমন ট্রেকিং, স্কুবা ডাইভিং এবং কায়াকিং।
* ঐতিহাসিক স্থান: পেনাং এবং মালাক্কার মতো শহরগুলো তাদের সমৃদ্ধ ঔপনিবেশিক ইতিহাস এবং ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে পরিচিত। এখানকার ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্য এবং স্ট্রিট আর্ট পর্যটকদের মুগ্ধ করে।
বাজেট-বান্ধব বিকল্প : অন্যান্য কিছু আন্তর্জাতিক গন্তব্যের তুলনায় মালয়েশিয়া ভারতীয় পর্যটকদের জন্য বেশ বাজেট-বান্ধব। থাকা-খাওয়া, স্থানীয় যাতায়াত এবং পর্যটন আকর্ষণগুলোর খরচ তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায় মাঝারি বাজেটের ভ্রমণকারীদের জন্য এটি একটি আকর্ষণীয় বিকল্প। শপিংয়ের জন্যও মালয়েশিয়া পরিচিত, যেখানে বিভিন্ন ব্র্যান্ড এবং স্থানীয় পণ্য সাশ্রয়ী মূল্যে পাওয়া যায়।
উষ্ণ আতিথেয়তা ও নিরাপত্তা : মালয়েশিয়ার মানুষ তাদের উষ্ণ আতিথেয়তা এবং বন্ধুত্বপূর্ণ স্বভাবের জন্য পরিচিত। পর্যটকদের জন্য এটি একটি নিরাপদ দেশ, যা ভারতীয় পর্যটকদের জন্য একটি স্বস্তিদায়ক এবং আনন্দময় ভ্রমণ অভিজ্ঞতা প্রদান করে। ইংরেজি ভাষা এখানে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়, যা যোগাযোগের ক্ষেত্রে সুবিধা করে।

9) ভিয়েতনাম:
ভিয়েতনাম ভারতীয়দের কাছে ক্রমবর্ধমান পছন্দের একটি ভ্রমণ গন্তব্য হয়ে উঠছে। এর বেশ কিছু সুস্পষ্ট কারণ রয়েছে, যা ভিয়েতনামকে একটি আকর্ষণীয় বিকল্পে পরিণত করেছে:
ভিসা সহজলভ্যতা এবং বাজেট-বান্ধব ভ্রমণ : ভিয়েতনাম ভ্রমণের জন্য ভারতীয়দের ভিসা পেতে হয়। তবে, অনলাইন ই-ভিসার সুবিধা থাকায় প্রক্রিয়াটি বেশ সহজ হয়ে গেছে। এটি ভ্রমণের পরিকল্পনাকে অনেক সরল করে। সবচেয়ে বড় কারণগুলির মধ্যে একটি হলো ভিয়েতনাম একটি অত্যন্ত বাজেট-বান্ধব দেশ। বিমান ভাড়া, হোটেল, খাবার এবং স্থানীয় পরিবহনের খরচ তুলনামূলকভাবে কম, যা ভারতীয় পর্যটকদের জন্য একটি আন্তর্জাতিক ভ্রমণকে আরও সাশ্রয়ী করে তোলে।
বৈচিত্র্যময় প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ভিয়েতনাম তার মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক দৃশ্যের জন্য বিখ্যাত। এখানে রয়েছে:
* হ্যালং বে: ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে পরিচিত এই স্থানে চুনাপাথরের হাজার হাজার দ্বীপ, গুহা এবং স্বচ্ছ জল রয়েছে, যা একটি অনন্য ক্রুজ অভিজ্ঞতার সুযোগ দেয়।
* সুন্দর সৈকত: দানাং, ফু কক এবং নহা ট্রাং-এর মতো শহরগুলিতে মনোরম বালুকাময় সৈকত এবং ফিরোজা জল রয়েছে, যা সমুদ্রপ্রেমীদের আকর্ষণ করে।
* সবুজ ধানক্ষেত ও পার্বত্য অঞ্চল: সাপা এবং মু ক্যান চাই-এর মতো উত্তর ভিয়েতনামের পার্বত্য অঞ্চলগুলিতে ধাপযুক্ত ধানক্ষেত এবং আদিবাসী সংস্কৃতি পর্যটকদের মুগ্ধ করে।
ভিয়েতনাম একটি সমৃদ্ধ ইতিহাস এবং স্বতন্ত্র সংস্কৃতি নিয়ে গর্ব করে। এখানে রয়েছে:
* ঐতিহাসিক স্থান: হো চি মিন সিটি-এর যুদ্ধ জাদুঘর, কু চি টানেল এবং হোয়েন (Hoi An)-এর প্রাচীন শহর, যা ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট, পর্যটকদের ভিয়েতনামের জটিল ইতিহাস সম্পর্কে জানতে সাহায্য করে।
* প্রাচীন মন্দির ও প্যাগোডা: দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বৌদ্ধ মন্দির এবং প্যাগোডাগুলি ভিয়েতনামের গভীর ধর্মীয় ঐতিহ্যের পরিচয় দেয়।
* ঐতিহ্যবাহী জীবনযাপন: গ্রামীণ এলাকায় এখনো ঐতিহ্যবাহী ভিয়েতনামের জীবনযাপন দেখা যায়, যা পর্যটকদের একটি ভিন্ন অভিজ্ঞতা দেয়।
সুস্বাদু খাবার : ভিয়েতনামের খাবার বিশ্বজুড়ে বিখ্যাত এবং ভারতীয় পর্যটকদের কাছে এটি একটি বড় আকর্ষণ। এখানকার তাজা উপাদান, ভেষজ এবং মশলার ব্যবহার খাবারকে অনন্য স্বাদ দেয়। ফো (নুডল স্যুপ), বান মি (স্যান্ডউইচ), স্প্রিং রোলস এবং ভিয়েতনামী কফি খুবই জনপ্রিয়। অনেক শহরেই এখন ভারতীয় রেস্তোরাঁও পাওয়া যায়।
অ্যাডভেঞ্চার প্রেমীদের জন্য ভিয়েতনাম বিভিন্ন সুযোগ দেয়:
* ট্রেকিং ও হাইকিং: উত্তর ভিয়েতনামের পার্বত্য অঞ্চলে ট্রেকিংয়ের চমৎকার সুযোগ রয়েছে।
* কায়াকিং ও ক্রুজিং: হ্যালং বে-তে কায়াকিং এবং নৌকা ভ্রমণ খুবই জনপ্রিয়।
* সাইক্লিং: গ্রাম এবং ছোট শহরগুলিতে সাইক্লিংয়ের মাধ্যমে স্থানীয় জীবনযাপন উপভোগ করা যায়।
নিরাপত্তা ও আতিথেয়তা : ভিয়েতনাম একটি অপেক্ষাকৃত নিরাপদ দেশ, এবং এখানকার মানুষ পর্যটকদের প্রতি বন্ধুত্বপূর্ণ ও স্বাগত জানায়। এটি ভারতীয় পর্যটকদের জন্য একটি স্বস্তিদায়ক ভ্রমণের পরিবেশ তৈরি করে।

10) ইউরোপীয় দেশসমূহ (যেমন ফ্রান্স, সুইজারল্যান্ড, ইতালি):
* কেন জনপ্রিয়: যদিও একক দেশ নয়, এই দেশগুলো ভারতীয়দের কাছে স্বপ্নময় গন্তব্য। ঐতিহাসিক স্থাপত্য, শিল্পকলা, রোমান্টিক পরিবেশ, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য (সুইজারল্যান্ডের আল্পস), ফ্যাশন (প্যারিস), এবং রন্ধনপ্রণালী (ইতালীয় খাবার) এর জন্য জনপ্রিয়। যদিও খরচ বেশি, বিশেষ প্যাকেজ বা হানিমুনের জন্য অনেকেই ইউরোপ বেছে নেন।
এই দেশগুলো ভারতীয় পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয়তার কারণগুলো মূলত ভৌগোলিক নৈকট্য, ভিসা সহজলভ্যতা, বাজেটের সামর্থ্য, বিভিন্ন ধরনের পর্যটন অভিজ্ঞতা (যেমন অ্যাডভেঞ্চার, রিল্যাক্সেশন, শপিং, সংস্কৃতি) এবং সামাজিক মাধ্যমে ক্রমবর্ধমান প্রচারের উপর নির্ভর করে।



