
আজ শ্রী শ্রী ঠাকুর রামকৃষ্ণ পরমহংস দেব-এর ১৯১তম জন্মদিবস। বহু ধর্মের মিলনভূমি এই ভারতবর্ষে শ্রীরামকৃষ্ণের স্থান অনন্যসাধারণ। দেশ ছাড়িয়ে বিদেশে তাঁর চিন্তাধারা প্রাধান্য পেয়েছে বিদেশিদের কাছে। সেই প্রেক্ষাপটেই এই বিশেষ প্রতিবেদন।
Published on: ফেব্রু ১৯, ২০২৬ at ২২:৪৭
লেখকঃ অনিরুদ্ধ পাল

এসপিটি প্রতিবেদন: শ্রী শ্রী ঠাকুর রামকৃষ্ণ পরমহংস দেব ছিলেন এমন এক আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব, যাঁর প্রভাব ভারতের সীমানা ছাড়িয়ে ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে ইউরোপ ও আমেরিকার বৌদ্ধিক ও আত্মিক জগতে। আশ্চর্যের বিষয়, বিদেশিদের কাছে তিনি পরিচিত হন মূলত তাঁর জীবনকথা, শিষ্যদের বাণী এবং সর্বোপরি তাঁর ভাবধারার মাধ্যমে—যা পাশ্চাত্যের ধর্মবোধকে এক নতুন প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছিল।
অধিকাংশ বিদেশি চিন্তাবিদ কখনও ঠাকুরকে চোখে দেখেননি। তবু রামকৃষ্ণ লীলাপ্রসঙ্গ, কথামৃত, এবং পরবর্তীকালে পাশ্চাত্যে প্রকাশিত জীবনীগ্রন্থগুলির মাধ্যমে তাঁরা রামকৃষ্ণকে অনুভব করেছিলেন এক জীবন্ত আধ্যাত্মিক সত্য হিসেবে। এই গ্রন্থগুলি তাঁদের কাছে ছিল কেবল ধর্মীয় সাহিত্য নয়, বরং মানবমন ও ঈশ্বরানুভবের এক বিরল নথি।
ঊনবিংশ ও বিংশ শতকের পাশ্চাত্য সমাজ ছিল বিজ্ঞানমনস্ক, যুক্তিনির্ভর ও ক্রমশ ধর্মবিমুখ। সেই প্রেক্ষাপটে রামকৃষ্ণের ঈশ্বরানুভব অনেক বিদেশির কাছেই প্রথমে অবিশ্বাস্য মনে হয়। কিন্তু গভীরে গেলে তাঁরা আবিষ্কার করেন—রামকৃষ্ণ কোনও অন্ধ বিশ্বাসের প্রতীক নন, বরং এক পরীক্ষিত অভিজ্ঞতার সাধক। জার্মান পণ্ডিত ম্যাক্স মুলার মনে করতেন, রামকৃষ্ণ পাশ্চাত্যের ধর্মতত্ত্বকে নতুন প্রাণ দিতে পারেন, কারণ তাঁর সাধনা ছিল জীবনের সঙ্গে যুক্ত, গ্রন্থকেন্দ্রিক নয়।
ফরাসি মনীষী রোমাঁ রোলাঁ রামকৃষ্ণকে দেখেছিলেন এক ‘বিশ্বমানব’ হিসেবে। তাঁর মতে, রামকৃষ্ণ এমন এক আত্মা, যিনি ধর্মকে সংকীর্ণ পরিচয়ের গণ্ডি থেকে মুক্ত করেছেন। ইউরোপ যখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপে মানবিক মূল্যবোধ খুঁজে ফিরছে, তখন রোলাঁর কাছে রামকৃষ্ণ হয়ে ওঠেন শান্তি, সহিষ্ণুতা ও প্রেমের এক নীরব দূত।
ইংরেজ সাহিত্যিক ক্রিস্টোফার ইশারউড ও তাঁর সমসাময়িকরা রামকৃষ্ণকে দেখেছিলেন আধুনিক মানুষের এক বিকল্প মডেল হিসেবে। তাঁদের কাছে ঠাকুরের আকর্ষণ ছিল তাঁর আবেগময়তা, হাস্যরস এবং ঈশ্বরের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক। ইশারউড মনে করতেন, পাশ্চাত্যের শুষ্ক বুদ্ধিবাদী জীবনে রামকৃষ্ণ এক ধরনের “emotional and spiritual completeness” এনে দিতে পারেন।
বিদেশিদের চোখে রামকৃষ্ণের ভাবমূর্তি গঠনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেন তাঁর শিষ্য স্বামী বিবেকানন্দ। ১৮৯৩ সালের শিকাগো ধর্মমহাসভায় বিবেকানন্দ যখন সর্বধর্মসমন্বয়ের কথা বলেন, তখন পশ্চিম প্রথমবার উপলব্ধি করে—এই ভাবনার পেছনে রয়েছেন এক গ্রামবাংলার সাধক, রামকৃষ্ণ। ফলে বিদেশিদের কাছে ঠাকুর হয়ে ওঠেন এক অদৃশ্য কেন্দ্র, যাঁকে ঘিরেই নতুন করে ভারতীয় আধ্যাত্মিকতার পরিচয় গড়ে ওঠে।
বিদেশি লেখক ও দার্শনিকদের লেখায় স্পষ্ট—রামকৃষ্ণ তাঁদের কাছে কোনও ঐতিহাসিক চরিত্র নন, বরং এক চলমান প্রেরণা।
- তিনি প্রমাণ করেন, ধর্ম মানে বিভাজন নয়, উপলব্ধি।
- তিনি দেখান, ঈশ্বরচেতনা ভয়ের নয়, প্রেমের সম্পর্ক।
- আর তিনি শেখান, আধুনিকতার মধ্যেও আত্মিক গভীরতা সম্ভব।
বিদেশিদের চোখে শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংস এক আশ্চর্য সংযোগবিন্দু—যেখানে প্রাচ্যের অনুভব ও পাশ্চাত্যের অনুসন্ধান মিলিত হয়েছে। ভাষা, সংস্কৃতি বা ভূগোলের সীমা পেরিয়ে তাঁর জীবন আজও প্রশ্ন তোলে: মানুষ কি কেবল যুক্তি দিয়ে বাঁচবে, নাকি প্রেম ও উপলব্ধির মধ্য দিয়েও সত্যকে ছুঁতে পারে? সেই প্রশ্নই রামকৃষ্ণকে বিশ্বজনীন করে তুলেছে—কালোত্তীর্ণ, চিরপ্রাসঙ্গিক।
Published on: ফেব্রু ১৯, ২০২৬ at ২২:৪৭



