পর্ব ১৫ — ‘হিন্দু’ ও ‘মুসলমান’: দুই পরিচয়ের নির্মাণ

Main দেশ ধর্ম ভ্রমণ রাজ্য
শেয়ার করুন

Published on: অক্টো ২২, ২০২৬ at ২০:০১

✍️ লিখছেন অনিরুদ্ধ পাল। সংবাদ প্রভাকর টাইমস

এসপিটি বিশেষ প্রতিবেদন: মধ্যযুগের ভারতীয় ইতিহাসে ‘হিন্দু’ ও ‘মুসলমান’—এই দুই পরিচয় কীভাবে একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়ে উঠল? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে শুধু যুদ্ধ, রাজবংশের উত্থান-পতন কিংবা ধর্মীয় সংঘাতের দিকে তাকালে চলবে না। দেখতে হবে ভাষা, সাহিত্য, শাসনব্যবস্থা, সামাজিক সম্পর্ক এবং মানুষের নিজেদের পরিচয় প্রকাশের ধরনও।

আজ ‘হিন্দু’ ও ‘মুসলমান’ শব্দ দুটি শুনলে আমরা সাধারণত দুটি পৃথক ধর্মীয় সম্প্রদায়ের কথা বুঝি। কিন্তু মধ্যযুগের ইতিহাসে এই পরিচয়গুলির ব্যবহার সব সময় আজকের মতো সুস্পষ্ট, সর্বজনীন কিংবা একই অর্থবাহী ছিল না। বিভিন্ন সময়, অঞ্চল ও লেখকের কাছে শব্দগুলির অর্থ বদলেছে। কোনও ক্ষেত্রে পরিচয়টি ছিল ভৌগোলিক বা সামাজিক, কোনও ক্ষেত্রে রাজনৈতিক, আবার কোনও ক্ষেত্রে স্পষ্টতই ধর্মীয়।

এই পার্থক্য বোঝা জরুরি। কারণ, বর্তমানের পরিচয়ের ধারণা সরাসরি অতীতের মানুষের ওপর আরোপ করলে ইতিহাসের জটিলতা হারিয়ে যায়।

‘হিন্দু’ ও ‘মুসলমান’: পরিচয়ের ইতিহাস কি একই সময়ে শুরু?

‘হিন্দু’ শব্দের ইতিহাসের আগের পর্বগুলিতে আমরা দেখেছি, প্রাচীন পারসিক শিলালিপিতে ‘হিন্দুশ’ নামে একটি ভূখণ্ডের উল্লেখ পাওয়া যায়। এই ব্যবহার ইসলামের আবির্ভাবের বহু শতাব্দী আগের। পরবর্তী সময়ে পারসিক ও আরবি ভাষায় ভারতীয় ভূখণ্ড এবং তার অধিবাসীদের বোঝাতে শব্দটির নানা রূপ ব্যবহৃত হয়েছে।

অন্যদিকে, ‘মুসলমান’ পরিচয় ইসলামের ধর্মীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত। ইসলাম সপ্তম শতকে আরব উপদ্বীপে আত্মপ্রকাশ করে এবং পরবর্তী শতাব্দীগুলিতে বাণিজ্য, ধর্মপ্রচার, অভিবাসন, রাজনৈতিক সম্প্রসারণ ও নানা সামাজিক যোগাযোগের মধ্য দিয়ে ভারতীয় উপমহাদেশেও তার বিস্তার ঘটে।

কিন্তু এই দুই পরিচয়ের ইতিহাসকে পাশাপাশি রাখলেই বোঝা যায়, তাদের উৎপত্তি একই ধরনের ছিল না। ‘হিন্দু’ শব্দের প্রাচীন ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ভূগোলের সঙ্গে যুক্ত; ‘মুসলমান’ পরিচয়ের ভিত্তি ধর্মীয় বিশ্বাস ও সম্প্রদায়। পরবর্তী সময়ে ভারতীয় উপমহাদেশে এই দুই পরিচয় বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়ে ওঠে।

ইতিহাসবিদ অড্রে ট্রুশকে তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন, চতুর্দশ শতক থেকে ‘হিন্দু’ শব্দটি পারসিক, সংস্কৃত ও প্রাকৃত-সহ একাধিক ভাষার রচনায় নতুনভাবে দৃশ্যমান হতে থাকে। পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতকের কিছু লেখায় শব্দটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের পরিচয় হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। তবে এই ব্যবহার তখনও সর্বত্র প্রচলিত ছিল না, আর ‘হিন্দু’ বলতে কাদের বোঝানো হচ্ছে, সে বিষয়েও সব লেখকের মত এক ছিল না।

অতএব, দুই পরিচয়ের সম্পর্ক বুঝতে হলে তাদের নিজস্ব ইতিহাসের পাশাপাশি তাদের পারস্পরিক সম্পর্কের ইতিহাসও অনুসন্ধান করতে হবে।

আল-বিরুনির বিবরণ: পার্থক্য চিহ্নিত করার একটি প্রাথমিক দৃষ্টান্ত

একাদশ শতকে মধ্য এশিয়ার পণ্ডিত আল-বিরুনি ভারতীয় সমাজ, জ্ঞানচর্চা, ধর্মীয় ধারণা ও দর্শন নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ আরবি গ্রন্থ রচনা করেন। তাঁর রচনা থেকে বোঝা যায়, ভারতীয়দের বিশ্বাস ও সামাজিক রীতিকে তিনি নিজের পরিচিত জগৎ থেকে পৃথক করে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছিলেন।

আল-বিরুনির বিবরণে ‘হিন্দ’ অঞ্চলের মানুষ এবং মুসলমানদের মধ্যে পার্থক্য তুলে ধরা হয়েছে। তবে এখানে একটি সূক্ষ্ম বিষয় রয়েছে। তিনি ভারতীয়দের বিশ্বাস নিয়ে আলোচনা করলেও, তাঁর রচনার ভাষা ও ধারণাকে আজকের ধর্মীয় পরিচয়ের সঙ্গে সম্পূর্ণ এক করে দেখা যায় না। তাঁর বিবরণে ভৌগোলিক, সাংস্কৃতিক, দার্শনিক ও ধর্মীয় পার্থক্য পরস্পরের সঙ্গে মিশে আছে।

এই ধরনের রচনা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এগুলি দেখায় যে মধ্যযুগের পণ্ডিতেরা নিজেদের পরিচিত সমাজের সঙ্গে অন্য সমাজের পার্থক্য নির্ধারণের চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু কোনও একজন লেখকের বক্তব্যকে সমগ্র যুগের মানুষের অভিন্ন ধারণা বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়।

আল-বিরুনির বিবরণ তাই একদিকে পারস্পরিক পার্থক্য নির্ধারণের প্রাথমিক উদাহরণ, অন্যদিকে ইতিহাসের উৎস পড়ার ক্ষেত্রে সতর্কতারও শিক্ষা দেয়। একজন লেখক কী দেখেছেন, কীভাবে ব্যাখ্যা করেছেন এবং কোন দৃষ্টিকোণ থেকে লিখেছেন—এই তিনটি প্রশ্ন আলাদা করে বিচার করতে হয়।

সংস্কৃত সাহিত্যে ‘মুসলমান’ পরিচয়ের বদলে অন্য শব্দ

মধ্যযুগের ভারতীয় সংস্কৃত সাহিত্য পড়লে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় চোখে পড়ে। মুসলিম শাসক ও পশ্চিম এশিয়া থেকে আগত জনগোষ্ঠীকে বোঝাতে লেখকেরা সব সময় ‘মুসলমান’ বা ‘হিন্দু’—এই দুই পরিচয় ব্যবহার করেননি। অনেক ক্ষেত্রে তাঁরা ‘যবন’, ‘তুরুষ্ক’ কিংবা ‘ম্লেচ্ছ’-এর মতো শব্দ ব্যবহার করেছেন। তবে শব্দগুলির অর্থ এক ছিল না, এবং সময়ের সঙ্গে তাদের প্রয়োগও বদলেছে।

‘যবন’ শব্দটির ব্যবহার প্রাচীনকাল থেকেই পাওয়া যায়। বিভিন্ন যুগে এটি পশ্চিমের জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে গ্রিকদের বোঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে; পরবর্তী সময়ে কিছু রচনায় এর অর্থ আরও বিস্তৃত হয়েছে। ‘তুরুষ্ক’ শব্দটি সাধারণত তুর্কি জনগোষ্ঠী বা তাদের সঙ্গে সম্পর্কিত শক্তিকে বোঝাতে ব্যবহৃত হতো। ‘ম্লেচ্ছ’ শব্দটি আবার নির্দিষ্ট কোনও একটি ধর্মের নাম ছিল না; সংস্কৃত সাহিত্যের বিভিন্ন প্রসঙ্গে এটি বিদেশি, বহিরাগত কিংবা প্রচলিত ব্রাহ্মণ্য সাংস্কৃতিক রীতির বাইরে থাকা মানুষদের বোঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে।

এই শব্দগুলি থেকে বোঝা যায়, মধ্যযুগের লেখকেরা মানুষকে চিহ্নিত করার জন্য একাধিক পরিচয়-পদ্ধতি ব্যবহার করতেন। কখনও ভাষা বা উৎপত্তি, কখনও রাজনৈতিক ক্ষমতা, কখনও সামাজিক রীতি, আবার কখনও ধর্মীয় বিশ্বাসের ভিত্তিতে পার্থক্য নির্ধারিত হতো।

ইতিহাসবিদ অড্রে ট্রুশকের সংস্কৃত সাহিত্যবিষয়ক গবেষণায় এই বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর আলোচনায় দেখা যায়, সংস্কৃত লেখকেরা মুসলিম শাসকদের সব সময় একটিমাত্র ধর্মীয় পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি। কোনও কোনও ক্ষেত্রে তাঁদের ‘তুরুষ্ক’ বা ‘যবন’ বলা হয়েছে, আবার কোথাও শাসক হিসেবে তাঁদের রাজনৈতিক মর্যাদা ও ক্ষমতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

তাই মধ্যযুগের প্রতিটি লেখায় আজকের পরিচয়ের শব্দ খুঁজে পাওয়া যাবে—এমন প্রত্যাশা করা উচিত নয়। সেই যুগের শব্দগুলিকে সেই যুগের ভাষা ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে বুঝতে হবে।

পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতকে পরিচয়ের নতুন ব্যবহার

পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতকে ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন ভাষার রচনায় ‘হিন্দু’ শব্দের ধর্মীয় অর্থে ব্যবহারের কিছু উল্লেখযোগ্য উদাহরণ পাওয়া যায়। তবে এর অর্থ এই নয় যে ওই সময়েই সমস্ত অঞ্চলে একটি অভিন্ন হিন্দু পরিচয় প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিল।

বিভিন্ন লেখক তাঁদের নিজস্ব অভিজ্ঞতা ও পরিস্থিতি অনুসারে শব্দটি ব্যবহার করেছেন। কারও কাছে ‘হিন্দু’ ছিল নির্দিষ্ট সামাজিক বা ধর্মীয় গোষ্ঠীর পরিচয়, কারও কাছে মুসলমানদের বিপরীতে একটি বৃহত্তর পরিচয়, আবার কারও ব্যবহারে এর অর্থ ছিল আরও সীমিত।

এই সময়ের কিছু ভক্তিকাব্য, আঞ্চলিক সাহিত্য এবং ধর্মীয় আলোচনায় হিন্দু ও মুসলমান পরিচয়কে পাশাপাশি রেখে মানুষের বিশ্বাস ও আচরণের পার্থক্য কিংবা মিল নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। কবির, বিদ্যাপতি, গুরু নানক এবং অন্যান্য ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের রচনায় ধর্মীয় পরিচয়, আচার এবং মানুষের অন্তরের বিশ্বাস নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা পাওয়া যায়। তবে প্রত্যেকের বক্তব্য ও উদ্দেশ্য আলাদা; তাঁদের সবাইকে একই মতের প্রতিনিধি হিসেবে দেখা যায় না।

এই ধরনের রচনা দেখায় যে পরিচয় কেবল শাসকের দেওয়া নাম ছিল না। সাহিত্যিক, ধর্মীয় চিন্তাবিদ এবং সাধারণ মানুষের ভাষাতেও পরিচয় নিয়ে আলোচনা চলছিল। কখনও এই পরিচয় বিভাজনের রেখা স্পষ্ট করেছে, কখনও আবার বাহ্যিক পরিচয়ের চেয়ে নৈতিকতা, ভক্তি কিংবা মানুষের আচরণকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে।

ইতিহাসবিদ ইউজেনিয়া ভানিনার গবেষণাতেও মধ্যযুগের উত্তর ভারতে হিন্দু ও মুসলমানদের পারস্পরিক ধারণার পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা রয়েছে। তাঁর বিশ্লেষণে বিচ্ছিন্নতা থেকে পরিচিতি, সাধারণীকরণ থেকে ব্যক্তিবিশেষকে আলাদাভাবে বোঝার মতো নানা পর্যায়ের কথা উঠে আসে। একই সঙ্গে স্থানীয় সমাজে মুসলমানদের বসবাস, ধর্মান্তর এবং আঞ্চলিক সংস্কৃতির সঙ্গে তাঁদের সম্পর্কও এই ইতিহাসের অংশ হয়ে ওঠে।

সংঘাত, সহাবস্থান ও পারস্পরিক প্রভাব

মধ্যযুগের হিন্দু ও মুসলমান পরিচয়ের ইতিহাস বলতে কেবল সংঘাতের ইতিহাস বোঝায় না। আবার এই সময়কে সর্বত্র সম্প্রীতি ও সমন্বয়ের যুগ বললেও বাস্তবতা সম্পূর্ণ ধরা পড়ে না।

বিভিন্ন রাজ্য ও সাম্রাজ্যের মধ্যে যুদ্ধ হয়েছে। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও উপাসনাস্থলকে কেন্দ্র করে সংঘাতের ঘটনাও ইতিহাসে রয়েছে। কোথাও শাসকের নীতি ধর্মীয় পার্থক্যকে গুরুত্ব দিয়েছে, কোথাও রাজনৈতিক স্বার্থ ধর্মীয় পরিচয়ের সঙ্গে মিশেছে। আবার বহু ক্ষেত্রে প্রশাসন, বাণিজ্য, কৃষি, শিল্প, সাহিত্য ও দৈনন্দিন সামাজিক জীবনে বিভিন্ন ধর্মের মানুষের যোগাযোগ ও সহযোগিতাও ঘটেছে।

মুসলমান শাসক মানেই সব সময় একই ধরনের ধর্মনীতি অনুসরণ করেছেন—এমন নয়। একইভাবে হিন্দু শাসক বা সমাজের সব গোষ্ঠীর অবস্থানও এক ছিল না। রাজনীতি, অর্থনীতি, স্থানীয় ক্ষমতার সম্পর্ক এবং ব্যক্তিগত পরিস্থিতি অনুসারে সিদ্ধান্ত বদলেছে।

এই কারণেই মধ্যযুগকে কেবল ‘হিন্দু বনাম মুসলমান’ সংঘাতের সরল কাহিনি হিসেবে দেখলে বহু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বাদ পড়ে যায়। আবার সংঘাতের প্রমাণ উপেক্ষা করে কেবল সহাবস্থানের কথা বললেও ইতিহাস অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

ইতিহাসের কাজ কোনও একটি পূর্বনির্ধারিত ধারণাকে সমর্থন করা নয়। বরং বিভিন্ন ধরনের প্রাথমিক উৎস—শিলালিপি, রাজদরবারের বিবরণ, সাহিত্য, ধর্মীয় রচনা এবং সামাজিক দলিল—পরস্পরের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা। একটি উৎসে যে ছবি পাওয়া যায়, অন্য উৎসে তার ভিন্ন দিক প্রকাশিত হতে পারে।

‘হিন্দু’ ও ‘মুসলমান’: পরস্পরের বিপরীতে পরিচয়ের নির্মাণ

এই ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, একটি পরিচয় কখন অন্য একটি পরিচয়ের বিপরীতে আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

ইতিহাসবিদ ডেভিড লরেনজেনের আলোচনায় একটি তাৎপর্যপূর্ণ পর্যবেক্ষণ পাওয়া যায়—বৃহত্তর ‘হিন্দু’ পরিচয়কে বোঝার ক্ষেত্রে ‘মুসলমান’ বা অন্য কোনও বহিরাগত পরিচয়ের সঙ্গে তার সম্পর্ক অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। কারণ, শৈব, বৈষ্ণব, শাক্ত ও স্মার্তের মতো নির্দিষ্ট পরিচয় আগে থেকেই ছিল; কিন্তু এই সমস্ত ধারাকে এক বৃহত্তর পরিচয়ের মধ্যে বোঝার প্রবণতা সব যুগে সমান ছিল না। তবে এর অর্থ এই নয় যে ‘হিন্দু’ পরিচয় কেবল মুসলমানদের উপস্থিতির কারণেই সৃষ্টি হয়েছিল। শব্দটির প্রাচীন ভৌগোলিক ইতিহাস তার আগের। আবার ভারতীয় উপমহাদেশের ধর্মীয় ও দার্শনিক ঐতিহ্যও বহু শতাব্দী ধরে বিকশিত হয়েছিল। মধ্যযুগে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের পারস্পরিক যোগাযোগ ও তুলনার মধ্যে বৃহত্তর পরিচয়ের কিছু ব্যবহার আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে—কিন্তু এই প্রক্রিয়া ছিল দীর্ঘ, অসম এবং অঞ্চলভেদে ভিন্ন।

একইভাবে ‘মুসলমান’ পরিচয়ের মধ্যেও ভাষা, অঞ্চল, বংশপরিচয়, সামাজিক অবস্থান এবং ধর্মীয় অনুশীলনের বৈচিত্র্য ছিল। আরব, পারসিক, তুর্কি কিংবা ভারতীয় বংশোদ্ভূত মুসলমানদের জীবনযাপন ও রাজনৈতিক অবস্থান এক ছিল না। স্থানীয় ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে তাঁদের সম্পর্কও সময়ের সঙ্গে বদলেছে।

অতএব, দুটি বৃহৎ পরিচয়ের ইতিহাস লিখতে গেলে তাদের অভ্যন্তরীণ বৈচিত্র্য এবং পারস্পরিক সম্পর্ক—দুই দিকই দেখতে হবে।

ইতিহাসের আলোকে শেষ কথা

মধ্যযুগে ‘হিন্দু’ ও ‘মুসলমান’ পরিচয় কীভাবে একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়ে উঠেছিল, তার উত্তর কোনও একক ঘটনা বা সিদ্ধান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

‘হিন্দু’ শব্দের প্রাচীন ভৌগোলিক ব্যবহার, পারসিক ও আরবি ভাষায় তার পরিবর্তিত অর্থ, সংস্কৃত ও আঞ্চলিক সাহিত্যে তার প্রবেশ এবং পঞ্চদশ-ষোড়শ শতকে ধর্মীয় পরিচয় হিসেবে তার কিছু ব্যবহার—সব মিলিয়ে একটি দীর্ঘ ইতিহাস তৈরি হয়েছে। এই ইতিহাসের মধ্যে মুসলমানদের সঙ্গে যোগাযোগ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে, কিন্তু একে একমাত্র কারণ বলা যায় না।

একইভাবে, মধ্যযুগের সমস্ত সম্পর্ককে কেবল ধর্মীয় সংঘাত কিংবা কেবল সম্প্রীতির গল্প হিসেবে ব্যাখ্যা করাও ইতিহাসের প্রতি সুবিচার নয়। সংঘাত ও সহাবস্থান, পার্থক্য ও আদানপ্রদান, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও সামাজিক সহযোগিতা—সব কিছুরই প্রমাণ রয়েছে।

এই ধারাবাহিকের মূল অনুসন্ধানও সেখানেই। কোনও শব্দের উৎপত্তি, তার বিভিন্ন যুগের ব্যবহার এবং তার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা পরিচয়ের ইতিহাসকে আলাদা করে বিচার করতে হবে। প্রাথমিক উৎসের সাক্ষ্য যতটুকু সমর্থন করে, বক্তব্যও ততটুকুতেই সীমাবদ্ধ রাখা উচিত।

বিশ্বাসের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই ইতিহাসের জটিল প্রশ্ন করা যায়। আর সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে প্রয়োজন তথ্য, প্রমাণ, ভাষার সূক্ষ্মতা এবং ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের প্রতি দায়বদ্ধতা।

সূত্র
  1. অড্রে ট্রুশকে, ‘হিন্দু: একটি ইতিহাস’—প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় দক্ষিণ এশিয়ায় ‘হিন্দু’ শব্দের পরিবর্তনশীল অর্থ এবং বিভিন্ন ভাষায় তার ব্যবহার নিয়ে গবেষণা।
  2. ইউজেনিয়া ভানিনা, ‘মধ্যযুগের উত্তর ভারতে হিন্দু ও মুসলমান: পারস্পরিক ধারণার বিভিন্ন পর্যায়’—মধ্যযুগের সাহিত্যিক উৎসে দুই সম্প্রদায়ের পারস্পরিক ধারণার পরিবর্তন নিয়ে গবেষণা।
  3. মুজাফ্‌ফর আলম, ‘প্রতিযোগিতা ও সহাবস্থান: মধ্যযুগের উত্তর ভারতে ভারতীয় ও ইসলামী ঐতিহ্যের মিথস্ক্রিয়া’—রাজনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতির পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা।
  4. আল-বিরুনি, ‘ভারত’—একাদশ শতকের ভারতীয় জ্ঞান, দর্শন, ধর্মীয় বিশ্বাস ও সামাজিক রীতির বিষয়ে আরবি ভাষায় রচিত বিবরণ।
  5. মধ্যযুগের সংস্কৃত, পারসিক, আরবি ও আঞ্চলিক ভাষার সাহিত্য, শিলালিপি এবং রাজদরবারের ঐতিহাসিক বিবরণ।
পরবর্তী পর্ব

পর্ব ১৬ — ‘হিন্দুইজম’ শব্দটি কোথা থেকে এল?

‘হিন্দু’ আর ‘হিন্দুইজম’ এক জিনিস নয়।

কখন ‘হিন্দুইজম’ একটি ইংরেজি বৃহত্তর শ্রেণিনাম হিসেবে বিভিন্ন ভারতীয় ধর্মীয় পরম্পরাকে একত্রে বোঝাতে শুরু করল? ঊনবিংশ শতকে ঔপনিবেশিক শাসন, ইউরোপীয় লেখালেখি এবং ভারতীয় পণ্ডিতদের সঙ্গে কথোপকথনের মধ্যে এই শব্দের ব্যবহার কীভাবে ছড়িয়ে পড়ল?

এই পর্বে অনুসন্ধান করা হবে—একটি পুরোনো শব্দের ইতিহাস এবং তার থেকে গড়ে ওঠা একটি আধুনিক ধর্মীয় শ্রেণিনামের ইতিহাস কেন এক নয়।

— লিখছেন অনিরুদ্ধ পাল

“বিশ্বাসের প্রতি শ্রদ্ধা, ইতিহাসের প্রতি দায়বদ্ধতা।”

Published on: অক্টো ২২, ২০২৬ at ২০:০১


শেয়ার করুন