
– মণিপাল হাসপাতাল, ঢাকুরিয়া–তে দুই বিপরীত চিকিৎসা পদ্ধতির দ্বন্দ্বে সফল লড়াই চিকিৎসকদের

Published on: মে ২১, ২০২৫ at ১১:০৬
এসপিটি নিউজ, কলকাতা, ২১ মে : টাইপ ২ ডায়াবেটিস এবং এন্ড-স্টেজ রেনাল ডিজিজ (ESRD)-এ ভোগা, নিয়মিত ডায়ালিসিসে থাকা ৩৯ বছরের এক মহিলার জীবনে আচমকাই নেমে এল বড় বিপর্যয়। মণিপাল হাসপাতাল, ঢাকুরিয়া-র ইমারজেন্সি বিভাগে তিনি ভর্তি হন অচেতন অবস্থায়, রক্তচাপ কমে যাওয়া এবং হৃদ্স্পন্দন ধীর হয়ে যাওয়ার লক্ষণ নিয়ে। তখন কেউই ভাবেননি, এই সংকট খুব শীঘ্রই এক জটিল মেডিক্যাল কেসে পরিণত হবে, যেখানে একদিকে জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন, আর অন্যদিকে দুই বিপরীতধর্মী চিকিৎসা-পদ্ধতির সমান্তরাল প্রয়োগ।
হাসপাতালে পৌঁছেই রোগীর হার্ট অ্যাটাক হয়। ইমারজেন্সি মেডিসিন বিভাগের কনসালট্যান্ট ডঃ অশোক মিশ্র এবং তাঁর টিম দ্রুত CPR দিয়ে রোগীকে বাঁচিয়ে তোলেন। এরপর তাঁকে ভর্তি করা হয় ডঃ অর্ঘ্য মজুমদার (ডিরেক্টর ও হেড, নেফ্রোলজি)-এর তত্ত্বাবধানে, এবং স্থানান্তরিত করা হয় ICU-২-এ, যেখানে ডঃ সাস্বতী সিনহা (কনসালট্যান্ট, ক্রিটিকাল কেয়ার) ও তাঁর টিম রোগীকে ভেন্টিলেটর ও ওষুধের সাহায্যে স্থিতিশীল করেন এবং চিকিৎসার কাজ শুরু করেন।
রোগীর দীর্ঘদিনের ভাসকুলার অ্যাক্সেসের সমস্যা আগে থেকে থাকলেও, আর্থিক সমস্যার কারণে সেটি সঠিকভাবে সমাধান করা যায়নি। আগের নেকলাইন ব্লক হয়ে যাওয়ায় সরিয়ে ফেলা হয়েছিল, ফলে বর্তমানে তাকে গ্রোইন থেকে ডায়ালিসিস দিতে হচ্ছিল – যা চিকিৎসাকে আরও জটিল করে তোলে।
CT অ্যাঞ্জিওগ্রাফিতে দেখা যায়, তাঁর সুপিরিয়র ভেনা কেভাতে (SVC) থ্রম্বোসিস হয়েছে, যা সম্ভবত ফুসফুসে গিয়ে পালমোনারি আর্টারি ব্লক করেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে তাঁকে ইনট্রাভেনাস হেপারিন দেওয়া শুরু হয়। ধীরে ধীরে তাঁর অবস্থার উন্নতি হয় – ভেন্টিলেটর থেকে সরানো হয় এবং রক্তচাপ স্বাভাবিক হয়। তাঁকে স্থানান্তর করা হয় স্টেপ-ডাউন ইউনিটে।
এই কেসের সবচেয়ে জটিল দিক ছিল – একদিকে পালমোনারি থ্রম্বোসিস, যার জন্য শক্তিশালী ব্লাড থিনার দরকার, আর অন্যদিকে ESRD-এর জন্য নিয়মিত ডায়ালিসিস চলতে হবে। হঠাৎ তাঁর মুখ ফুলে যায়, রক্তচাপ হঠাৎ করে আবার কমে যায়। আবার ICU-তে ফিরিয়ে নিয়ে ভেন্টিলেটর সাপোর্টে রাখা হয়। এরপর ইকোকার্ডিওগ্রাফি ও CT স্ক্যানে ধরা পড়ে হৃদপিন্ডের চারপাশে তরল জমছে – কার্ডিয়াক ট্যাম্পোনেড-এর আশঙ্কা তৈরি হয়। এখন ব্লাড থিনার দিলে ফুসফুসের ক্লট ঠিক থাকবে, কিন্তু হৃদয়জল জমে গেলে জীবনহানির সম্ভাবনা বেড়ে যাবে – ঠিক উলটো চিকিৎসা দরকার।
এই মুহূর্তে জরুরি ভিত্তিতে ডঃ সুমন্ত চট্টোপাধ্যায় (কনসালট্যান্ট, কার্ডিওলজি) ডাক পড়ে। তিনি নিজে প্রতিদিন ইকো করে রোগীর হৃদয় পর্যবেক্ষণ করেন। কার্ডিয়াক ইফিউশন ছিল রক্তমিশ্রিত, যার জন্য ড্রেন করাও বিপজ্জনক ছিল। ভাগ্যক্রমে, দ্বিতীয় CT রিপোর্টে দেখা যায় ফুসফুসের ক্লট গুলি সেরে গেছে – ফলে ব্লাড থিনার বন্ধ করা যায়। কিন্তু ESRD রোগীর ডায়ালিসিস চলতে থাকায়, অ্যাক্সেস লাইন ব্লকের ঝুঁকি আবার বেড়ে যায়।
ডঃ অর্ঘ্য মজুমদার বলেন, “আমার ৩০ বছরের অভিজ্ঞতায়, এত কঠিন দ্বন্দ্বপূর্ণ চিকিৎসা আমি খুব কমই দেখেছি। একদিকে ESRD রোগী, অন্যদিকে অ্যাকটিভ পালমোনারি থ্রম্বোসিস, কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট – সঙ্গে রক্তচাপ ও অক্সিজেন স্যাচুরেশনে মারাত্মক ওঠানামা – চিকিৎসার প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল বিপদের সীমানায় হাঁটা।”
ডঃ উত্তয়ন চক্রবর্তী (কনসালট্যান্ট, নেফ্রোলজি) বলেন, “একটা ছোট ভুল সিদ্ধান্তই মারাত্মক হতে পারত। ব্লাড থিনার দিলে রক্তক্ষরণ, না দিলে আবার নতুন ক্লট! প্রতিটি মুহূর্তে চিকিৎসা চালানো ছিল একটা সময়-বোমার ওপর দাঁড়িয়ে কাজ করার মতো। একমাত্র দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া আর টিমওয়ার্কই এই রোগীকে ফিরিয়ে আনে মৃত্যুর মুখ থেকে।”
এমন ক্রিটিকাল অবস্থাতেও রোগীর ডায়ালিসিস বন্ধ রাখা যায়নি। সেই অবস্থায় ডঃ সুভ্রব্রত ব্যানার্জী (সিনিয়র কনসালট্যান্ট, ভাসকুলার ও এন্ডোভাসকুলার সার্জারি)-র নেতৃত্বে সফলভাবে পার্মাক্যাথ ইন্সার্ট করা হয় – নিখুঁত সমন্বয় ও দক্ষতায়।
ধীরে ধীরে রোগী সুস্থ হয়ে ওঠেন এবং শেষপর্যন্ত ঘরে ফেরেন, এক অলৌকিক বাঁচার কাহিনি নিয়ে। এই ঘটনা একটি বড় প্রশ্ন তোলে – দেরিতে চিকিৎসা শুরু হলে কী কী বিপদ হতে পারে। তাঁর আগের অ্যাক্সেসের সমস্যাগুলোর দ্রুত সমাধান হলে হয়ত এত বড় জটিলতা এড়ানো যেত।
মণিপাল হাসপাতাল ক্রমাগত চেষ্টা করে চলেছে যাতে আর্থিক প্রতিবন্ধকতা চিকিৎসার পথে না আসে – তাদের ইনক্লুসিভ কেয়ার মডেল ও পেশেন্ট অ্যাসিস্ট্যান্স প্রোগ্রাম সেই লক্ষ্যেই তৈরি। তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য – সবার জন্য সুলভ, নৈতিক ও উন্নত মানের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা।
Published on: মে ২১, ২০২৫ at ১১:০৬



