রঙ–সংস্কৃতিতে শান্তির বার্তা: কলকাতা প্রেস ক্লাবে এটিএসপিবি-র বসন্ত উৎসব ২০২৬

Main দেশ ভ্রমণ রাজ্য
শেয়ার করুন

Published on: মার্চ ৩, ২০২৬ at ১২:৩৪

Reportere: Aniruddha Pal

এসপিটি নিউজ, কলকাতা, ৩ মার্চ: রঙ, সংস্কৃতি আর বৈশ্বিক সৌহার্দ্যের আবহে কলকাতা প্রেস ক্লাবে বসন্ত উৎসব ২০২৬ উদযাপন করল বাংলার পর্যটন ব্যবসায়ীদের অন্যতম বৃহৎ সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ট্যুরিজম সার্ভিস প্রোভাইডার্স অব বেঙ্গল (এটিএসপিবি)। বাংলার গান, নৃত্য ও লোকসংস্কৃতির সমন্বয়ে আয়োজিত এই উৎসব মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের অশান্ত প্রেক্ষাপটে বিশ্বজুড়ে শান্তির বার্তা ছড়িয়ে দেয়—যা অনুষ্ঠানের প্রাসঙ্গিকতাকে করে তোলে আরও গভীর ও অর্থবহ।

উৎসবের সূচনালগ্নে প্রদীপ প্রজ্বালনের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের উদ্বোধন হয়। উপস্থিত ছিলেন ভারতীয় পর্যটন মন্ত্রকের কলকাতায় ইন্ডিয়া ট্যুরিজমের পূর্ব ভারতের রিজিওনাল ডিরেক্টর প্রণব প্রকাশ, রাজস্থান সরকারের কলকাতার ইনফর্মেশন ব্যুরোর অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর হিংলাজ দন রতনু, হিমাচল প্রদেশ পর্যটনের আধিকারিক বৃন্দাবন মালি, জম্মু ও কাশ্মীর পর্যটনের আধিকারিক এহসন উল হক, ছত্তিশগড় পর্যটনের আধিকারিক চিন্ময় দাশগুপ্ত- ছাড়াও তিন অবসরপ্রাপ্ত ইন্ডিয়া ট্যুরিজমের কলকজাতার প্রাক্তন অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর জ্যোতির্ময় বিশ্বাস, মধ্যপ্রদেশ পর্যটনের কলকাতার প্রাক্তন আধিকারিক অভিজিৎ গুহ এবং মেঘালয় পর্যটনের কলকাতার প্রাক্তন আধিকারিক প্রসেনজিৎ বসু।

এটিএসপিবি-র যুগ্ম সম্পাদক স্বরূপ ভট্টাচার্য ও তারক সাহা বলেন, বাংলার সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রচার এবং দেশ-বিদেশে পর্যটন সম্পর্ক আরও দৃঢ় করার লক্ষ্যেই বসন্ত উৎসব ২০২৬। তাঁদের কথায়, “রঙের এই প্রাণবন্ত উৎসব বিদেশি পর্যটকদের কাছেও অত্যন্ত জনপ্রিয়। ভারতীয় ঐতিহ্য ও বাংলার সাংস্কৃতিক ঐশ্বর্যকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে তুলে ধরাই আমাদের উদ্দেশ্য।”

প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রণব প্রকাশ বলেন, “নতুন বছরের আগমনকে রঙের মধ্য দিয়ে স্বাগত জানানোর এই সময়টা সত্যিই আনন্দের। আজকের সংগীত ও নৃত্য পরিবেশনা উৎসবের বার্তা সবার কাছে পৌঁছে দিয়েছে। ভারত সরকারের পর্যটন মন্ত্রক এই উদ্যোগকে সমর্থন করেছে—এটাই আমাদের গর্ব।” তিনি ‘দেখো আপনা দেশ’ প্রকল্পের কথাও উল্লেখ করে দেশীয় পর্যটন বৃদ্ধির আহ্বান জানান।

কলকাতায় রাজস্থান সরকারের ইনফর্মেশন ব্যুরোর অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর (জনসংযোগ ও তথ্য) হিংলাজ দন রতনু তাঁর চিরাচরিত কাব্যিক ভঙ্গিতে বলেন, “সমরদার ডাকে আজ আমি আবার এখানে হাজির হয়েছি—প্রতিবারই আসি। ২০১৯ থেকে ২০২৬ পর্যন্ত জয়শলমীরের সংস্পর্শে থাকা মানুষদের আমি আমার পরিবারের সদস্য বলেই মনে করি। বিশেষ করে সমরদা এবং তাঁর পুরো টিমকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। কবিতাই আমার ধর্ম—এই বিশ্বাস থেকেই বলি,
‘ম্যায় জাহাঁ ধর দুঁ কদম, রাজপথ হ্যায়,
পাঁও মেরে দেখ কর দুনিয়া চলেগি…’
পর্যটনের এই পুরোধাকে আমি প্রণাম জানাই। ৩২ বছর ধরে রাজস্থানকে প্রতিনিধিত্ব করার পর ২০৩০ সালে অবসর নেওয়ার কথা ভাবছি। আইসিসিআর-এর মাধ্যমে বিশ্বের নানা প্রান্তে যাওয়ার সুযোগ হয়েছে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, বাংলা ভারতের সিলমোহর রাজ্য—যেখান থেকে দেশের সর্বাধিক পর্যটক ভ্রমণ করেন। কারণ, এখানে পর্যটনের প্রতি ভালোবাসা আছে, শ্রদ্ধা আছে, আর পর্যটনকে এক উৎসবের মতো করেই উদযাপন করা হয়। বন্ধুদের উদ্দেশে একটাই কথা—যতদিন শরীর সঙ্গ দেবে, ততদিন ভ্রমণ করুন।”

ছত্তিশগড় পর্যটনের কলকাতার পর্যটন আধিকারিক চিন্ময় দাশগুপ্ত বলেন, “এটিএসপিবি-র বসন্ত উৎসবে আমি প্রতি বছরই উপস্থিত থাকার চেষ্টা করি। এই অ্যাসোসিয়েশনের অভিভাবক সমরদা (সমর ঘোষ), যুগ্ম সম্পাদক তারক সাহা ও স্বরূপ ভট্টাচার্য, সভাপতি সাগর গুহ—সহ গোটা টিম যে নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে পর্যটনের প্রসারে কাজ করে চলেছেন, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। তাঁদের আয়োজনে বসন্ত উৎসব শুধু একটি অনুষ্ঠান নয়, এটি বাংলার পর্যটন সংস্কৃতির এক জীবন্ত উদযাপন হয়ে উঠেছে।”

অনুষ্ঠানের বিশেষ আকর্ষণ ছিল বালি ময়ূরী নৃত্য সংস্থা ও নৃত্যাঙ্গন ড্রিম ড্যান্স অ্যাডেমির অনবদ্য পরিবেশনা। শিশু শিল্পীদের প্রাণবন্ত নৃত্য বসন্ত উৎসবের রঙকে আরও উজ্জ্বল করে তোলে। উদ্বোধনী সঙ্গীত পরিবেশন করে সুরের জ্যোতি সঙ্গীত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। সমাপ্তিতে বাংলার মহিলা লোকসংগীত দল ‘রঙ্গিলা নাও’-এর পরিবেশনা দর্শকদের মুগ্ধ করে শান্তি ও সৌহার্দ্যের বার্তা পৌঁছে দেয়।

অনুষ্ঠানে এটিএসপিবি-র সদস্যদের পরিবারের শিশুরাও নৃত্য ও সংগীতে অংশ নেয়। তানিশা সাহার খালি গলায় গান এবং যুবা শিল্পী অন্তরীপা সাহার পরিবেশনা বিশেষভাবে নজর কাড়ে। যাদের মধ্যে অয়ন্তিকা মাঝি, কৃত্তিকা মন্ডল, শ্রীবিদ্যা দাস নৃত্য পরিবেশন করে। আর সংগীত পরিবেশন করে রুদ্রাক্ষী পাল । তবে মিউজিক ছাড়া খালি গলায় গান করে  সকলের নজর কাড়ে তানিশা সাহা। আর বিশেষভাবে সকলের মন জয় কেড়ে নেয় আর এক যুবা শিল্পী অন্তরীপা সাহা। বালি ময়ূরী নৃত্য সংস্থার কর্ণধার বিশিষ্ট নৃত্য শিল্পী শ্রাবণী দাস এবং নৃত্যাঙ্গন ড্রিম ড্যান্স অ্যাডেমির জয়শ্রী দাসের পরিচালনায় পরিচালনায় তাঁর ছাত্রীদের নৃত্য পরিবেশন ছিল অসাধারণ। তারা দোলের উৎসবকে আরও উজ্জ্বল করে তুলেছিল। একই সাথে তাঁর ছাত্রীদের নৃত্য পরিবেশোন এদিন বসন্ত উৎসবকে যেন পৌঁছে দিয়েছিল বৃন্দাবনের আঙিনায়। সবশেষে “রঙ্গিলা নাও”এর জ্যোৎস্না মন্ডলের পরচালনায় তাঁর নিজস্ব ভাবনায় গড়ে তোলা মহিলাদের নিয়ে গঠিত এই ব্যান্ড বাংলার লোকস্নগস্কৃতি ছাড়িয়ে প্রতিবেশী বাংলাদেশ থেকে আমাদের দেশের লোকশীল্পকে দারুনভাবে উপস্থাপিত করেছেন। সেই সাথে বসন্তের এই রঙের উৎসবকে নতুনভাবে পরবেশিত করে শান্তি আর সৌহার্দ্যের বার্তা দিয়েছেন।

এই উপলক্ষে পর্যটন ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের জন্য ইন্ডিয়া ট্যুরিজম কলকাতার অবসরপ্রাপ্ত অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর জ্যোতির্ময় বিশ্বাস, মধ্যপ্রদেশ পর্যটনের প্রাক্তন আধিকারিক অভিজিৎ গুহ এবং মেঘালয় পর্যটনের প্রাক্তন আধিকারিক সুরজিৎ বসুকে উত্তরীয় ও স্মারক দিয়ে সম্মানিত করা হয়।

এটিএসপিবি-র সভাপতি সাগর গুহ বলেন, “বসন্ত উৎসব আমরা বহু বছর ধরে পালন করে আসছি। আগামিদিনে আরও বৃহৎ পরিসরে এই উৎসব আয়োজনের লক্ষ্য রয়েছে।” সংগঠনের অভিভাবক সমর ঘোষও জানান, আগামী বছর বসন্ত উৎসব আরও বড় আকারে উদযাপিত হবে।

এটিএসপিবি- নামের সাথে যার নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে যিনি এই সংগঠনে অভিভাবকের মতো সকলকে সাথে নিয়ে এগিয়ে চলেছেন সেই সমর ঘোষ এদিন উপস্থিত সকল পর্যটন আধিকদের প্রতি সম্মান জ্ঞাপন করে বলেন, “আমরা সবসময় পর্যটনের প্রসারে কাজ করে চলেছি। আগামী বছরও এই অনুষ্ঠান আরও বড় আকারে হবে বলে জানাচ্ছি। “

রঙ, সুর আর সংস্কৃতির এই মিলনমেলা একদিকে যেমন বসন্তের আনন্দ উদযাপন করল, তেমনই পর্যটনের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে শান্তি ও মানবিকতার বার্তা ছড়িয়ে দিল—এই ভাবনাতেই স্মরণীয় হয়ে রইল এটিএসপিবি-র বসন্ত উৎসব ২০২৬।

Published on: মার্চ ৩, ২০২৬ at ১২:৩৪

 


শেয়ার করুন