
উপনিষদে ‘ধর্ম’, ‘সনাতন’, আত্মা, ব্রহ্ম, মোক্ষ—কীভাবে এসেছে?
Published on: সেপ্টে ২৪, ২০২৬ at ২৩:১৫
✍️ লিখছেন অনিরুদ্ধ পাল। সংবাদ প্রভাকর টাইমস
এসপিটি বিশেষ প্রতিবেদন: ‘সনাতন ধর্ম’—এই শব্দবন্ধকে ঘিরে একটি অত্যন্ত প্রচলিত ধারণা হল, উপনিষদ থেকেই ‘সনাতন ধর্ম’ নামে একটি চিরন্তন ধর্মের ধারণা স্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
কিন্তু এই দাবিকে যাচাই করতে গেলে প্রথমেই একটি প্রশ্ন করতে হয়— উপনিষদের মূল সংস্কৃত পাঠে কি সত্যিই ‘সনাতন ধর্ম’ নামে কোনও ধর্মপরিচয় পাওয়া যায়?
নাকি উপনিষদে ‘ধর্ম’ এবং ‘সনাতন’—দুটি শব্দই আলাদা আলাদা প্রসঙ্গে ব্যবহৃত হয়েছে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে অনুমান নয়, ফিরে যেতে হবে মূল পাঠে। আর এখানেই এই পর্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা— ‘উপনিষদ’ কোনও একক গ্রন্থ নয়। বিভিন্ন সময়, বিভিন্ন বৈদিক শাখা ও বিভিন্ন দার্শনিক পরম্পরায় বহু উপনিষদ রচিত হয়েছে। তাই একটি উপনিষদের বক্তব্যকে সমস্ত উপনিষদের বক্তব্য বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
এই পর্বে মূলত প্রাচীন ও প্রধান উপনিষদগুলির প্রাসঙ্গিক পাঠের দিকে নজর দেওয়া হবে। ভারত সরকারের বৈদিক ঐতিহ্যভিত্তিক সংগ্রহেও প্রধান উপনিষদগুলির আলোচনায় আত্মা, ব্রহ্ম ও ব্রহ্মবিদ্যার গুরুত্ব বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
প্রথম প্রশ্ন—উপনিষদে ‘ধর্ম’ আছে কি?
হ্যাঁ। উপনিষদে ‘ধর্ম’ শব্দের ব্যবহার পাওয়া যায়। কিন্তু সেই ‘ধর্ম’কে আজকের অর্থে একটি নির্দিষ্ট ধর্মসম্প্রদায়ের নাম হিসেবে পড়া যাবে না। এর সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ পাওয়া যায় তৈত্তিরীয় উপনিষদের শিক্ষাবল্লীতে। শিক্ষা শেষ করে গৃহে ফিরে যাওয়ার আগে আচার্য শিষ্যকে যে নির্দেশ দিচ্ছেন, সেখানে বলা হয়েছে—
“সত্যং বদ। ধর্মং চর।
স্বাধ্যায়ান্মা প্রমদঃ।”
অর্থাৎ— “সত্য বলো। ধর্মের আচরণ করো। স্বাধ্যায়ে অবহেলা করো না।” এর পরেই আরও বলা হয়েছে—
“সত্যান্ন প্রমদিতব্যম্।
ধর্মান্ন প্রমদিতব্যম্।”
অর্থাৎ— সত্য থেকে বিচ্যুত হয়ো না; ধর্ম থেকে বিচ্যুত হয়ো না। এই সম্পূর্ণ অংশটি তৈত্তিরীয় উপনিষদের শিক্ষাবল্লী, একাদশ অনুবাকে রয়েছে। এখানে ‘ধর্ম’ বলতে কোনও ধর্মের নাম বোঝানো হচ্ছে না। এটি শিষ্যের আচরণ, কর্তব্য, নৈতিক জীবন ও সঠিক জীবনপদ্ধতির সঙ্গে সম্পর্কিত। অর্থাৎ উপনিষদে ‘ধর্ম’ শব্দটি আছে—কিন্তু সেটিকে আধুনিক অর্থে কোনও ধর্মের নাম হিসেবে পড়া ঐতিহাসিকভাবে নিরাপদ নয়।
ছান্দোগ্য উপনিষদেও ‘ধর্ম’
ছান্দোগ্য উপনিষদের দ্বিতীয় অধ্যায়ের তেইশতম খণ্ডে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহার পাওয়া যায়—
“ত্রয়ো ধর্মস্কন্ধাঃ
যজ্ঞোহধ্যয়নং দানমিতি প্রথমঃ।
তপ এব দ্বিতীয়ঃ।
ব্রহ্মচার্যাচার্যকুলবাসী তৃতীয়ঃ…”
অর্থাৎ সেখানে ধর্মের তিনটি ভিত্তি বা স্তম্ভের কথা বলা হয়েছে—যজ্ঞ, অধ্যয়ন ও দান; তপস্যা এবং ব্রহ্মচর্য ও আচার্যের আশ্রমে শিক্ষাজীবনও তার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। শেষে বলা হয়েছে— “ব্রহ্মসংস্থোহমৃতত্বমেতি।” অর্থাৎ ব্রহ্মে প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তি অমৃতত্ব লাভ করেন। এখানেও ‘ধর্ম’ কোনও ধর্মের নাম নয়। বরং ধর্ম বলতে বোঝানো হচ্ছে আচরণ, কর্তব্য, সাধনা ও জীবনপদ্ধতির নির্দিষ্ট ভিত্তি।
তাহলে ‘সনাতন’ শব্দটি কি উপনিষদে আছে?
এবার আসি আরও গুরুত্বপূর্ণ জায়গায়। হ্যাঁ, ‘সনাতন’ শব্দটি উপনিষদে পাওয়া যায়। কিন্তু এখানেও প্রসঙ্গটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উদাহরণ হিসেবে কঠ উপনিষদ দেখা যাক। এর দ্বিতীয় অধ্যায়ের তৃতীয় বল্লীর প্রথম মন্ত্রে বলা হয়েছে—
“ঊর্ধ্বমূলোহ্বাক্শাখ
এষোহশ্বত্থঃ সনাতনঃ।
তদেব শুক্রং তদ্ ব্রহ্ম
তদেবামৃতমুচ্যতে।”
এখানে ‘সনাতন’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে অশ্বত্থ বৃক্ষের বিশেষণ হিসেবে। অর্থাৎ— “এই অশ্বত্থ বৃক্ষটি সনাতন।” এর পরেই বলা হচ্ছে— “সেই ব্রহ্মই তার মূল; সেই-ই অমৃত।” অর্থাৎ এখানে ‘সনাতন’ একটি চিরন্তন বা অনাদিকাল থেকে বিদ্যমান সত্তার ধারণা প্রকাশ করছে। এটি ‘সনাতন ধর্ম’ নামের কোনও ধর্মীয় পরিচয় নয়।
কঠ উপনিষদেই আরও একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহার
আরও একটি মন্ত্র এই আলোচনাকে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। কঠ উপনিষদের দ্বিতীয় অধ্যায়ের দ্বিতীয় বল্লীর ষষ্ঠ মন্ত্রে বলা হয়েছে—
“হন্ত ত ইদং প্রবক্ষ্যামি
গুহ্যং ব্রহ্ম সনাতনম্।
যথা চ মরণং প্রাপ্য
আত্মা ভবতি গৌতম॥”
অর্থাৎ— “হে গৌতম, এখন আমি তোমাকে সেই গুপ্ত ও সনাতন ব্রহ্মের কথা বলব; মৃত্যুর পরে আত্মার কী অবস্থা হয়, তাও বলব।”
এখানে বিষয়টি আরও পরিষ্কার। ‘সনাতন’ শব্দটি সরাসরি ‘ব্রহ্ম’-এর বিশেষণ। অর্থাৎ— সনাতন ব্রহ্ম। এখানে বলা হচ্ছে না— সনাতন ধর্ম। এটি আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভাষাগত শিক্ষা দেয়— উপনিষদে ‘সনাতন’ শব্দ পাওয়া গেলেই তার সঙ্গে ‘ধর্ম’ যোগ করে আধুনিক ‘সনাতন ধর্ম’ অর্থ তৈরি করা যাবে না।
শব্দটি যে বিশেষ্যের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে, তার ভিত্তিতেই তার অর্থ বুঝতে হবে।
‘সনাতন’ মানে তখন কী?
কঠ উপনিষদের এই ব্যবহারগুলিতে ‘সনাতন’ মূলত বোঝাচ্ছে— অনাদি, চিরন্তন, প্রাচীনকাল থেকে বিদ্যমান, অব্যাহত বা কালাতীত। অর্থাৎ ‘সনাতন’ একটি গুণবাচক ধারণা। এটি নিজে কোনও ধর্মের নাম হয়ে যায়নি। যেমন— সনাতন ব্রহ্ম অথবা সনাতন অশ্বত্থ।
এখানে ‘সনাতন’ কোনও সম্প্রদায়ের নাম নয়; বরং সংশ্লিষ্ট সত্তার চিরন্তনতা বা অনাদিত্ব নির্দেশ করছে।
উপনিষদের মূল আলোচনার কেন্দ্রে তাহলে কী?
এখানেই এই পর্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি সামনে আসে। উপনিষদগুলির প্রধান আলোচ্য হয়ে ওঠে— আত্মা কী? ব্রহ্ম কী? জগতের মূল সত্য কী? মানুষের প্রকৃত সত্তা কী? জন্ম-মৃত্যুর বন্ধন থেকে মুক্তি কীভাবে সম্ভব?
এই অনুসন্ধানই উপনিষদীয় চিন্তার একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য। ভারত সরকারের বৈদিক ঐতিহ্যভিত্তিক উপস্থাপনাতেও প্রধান উপনিষদগুলির ক্ষেত্রে ব্রহ্মবিদ্যা, আত্মা ও পরম সত্যের জ্ঞানকে কেন্দ্রীয় বিষয় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
আত্মা—উপনিষদের এক কেন্দ্রীয় অনুসন্ধান
কঠ উপনিষদের বিখ্যাত মন্ত্রে বলা হয়েছে—
“ন জায়তে ম্রিয়তে বা বিপশ্চিত্
নায়ং কুতশ্চিন্ন বভূব কশ্চিত্।
অজো নিত্যঃ শাশ্বতোহয়ং পুরাণো
ন হন্যতে হন্যমানে শরীরে॥”
এখানে আত্মার সম্পর্কে বলা হচ্ছে— আত্মা জন্ম নেয় না, মৃত্যুও হয় না। শরীর ধ্বংস হলেও আত্মার ধ্বংস হয় না। এখানে ‘নিত্য’, ‘শাশ্বত’, ‘পুরাণ’—এই ধরনের শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে আত্মার চিরন্তনতার ধারণা প্রকাশ করতে।
লক্ষ করার বিষয় হল— এখানেও ‘সনাতন’ একটি ধর্মের নাম হিসেবে আসেনি। বরং আত্মার প্রকৃতি বোঝাতে চিরন্তনতার ধারণা ব্যবহৃত হয়েছে।
আত্মা ও ব্রহ্ম—একই সত্যের দিকে যাত্রা
ছান্দোগ্য উপনিষদের ষষ্ঠ অধ্যায়ে উদ্দালক ও শ্বেতকেতুর সংলাপ ভারতীয় দর্শনের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে বলা হয়েছে— “সদেব সোম্যেদমগ্র আসীদেকমেবাদ্বিতীয়ম্।”
অর্থাৎ— এই জগতের আদিতে একমাত্র সেই সৎ ছিল, দ্বিতীয় কিছু ছিল না। এই আলোচনার ধারাবাহিকতায় আসে বিখ্যাত বাক্য— “তত্ত্বমসি, শ্বেতকেতো।” অর্থাৎ— “শ্বেতকেতু, তুমিই সেই।”
এই বক্তব্যের মাধ্যমে আত্মা ও পরম সত্যের সম্পর্ক নিয়ে গভীর অনুসন্ধান করা হয়েছে।
বৃহদারণ্যক উপনিষদে ‘অহং ব্রহ্মাস্মি’
বৃহদারণ্যক উপনিষদের একটি বিখ্যাত বাক্য— “অহং ব্রহ্মাস্মি।” অর্থাৎ— “আমি ব্রহ্ম।”
এখানে ‘আমি’ বলতে সাধারণ দেহগত পরিচয়কে বোঝানো হচ্ছে না; আলোচনার কেন্দ্র আত্মস্বরূপ ও পরম সত্যের সম্পর্ক। এই উপনিষদীয় অনুসন্ধান দেখায় যে প্রাচীন ভারতীয় চিন্তায় আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন কত গভীরভাবে ব্রহ্মতত্ত্বের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল।
মাণ্ডুক্য উপনিষদ—আত্মাই ব্রহ্ম
মাণ্ডুক্য উপনিষদের দ্বিতীয় মন্ত্রে বলা হয়েছে—
“সর্বং হ্যেতদ্ ব্রহ্ম।
অয়মাত্মা ব্রহ্ম।”
অর্থাৎ— “এই সমস্তই ব্রহ্ম; এই আত্মাই ব্রহ্ম।” এখানে আবারও দেখা যাচ্ছে, উপনিষদীয় অনুসন্ধানের কেন্দ্র হচ্ছে আত্মা ও ব্রহ্মের সম্পর্ক।
ব্রহ্ম—কী?
উপনিষদে ব্রহ্মকে কোনও একক মানবসদৃশ দেবতার সীমিত পরিচয়ে আবদ্ধ করা হয়নি। বিভিন্ন উপনিষদে ব্রহ্মকে সত্য, জ্ঞান, অনন্ত, অক্ষর, সর্বব্যাপী, পরম বাস্তবতা ইত্যাদি ধারণার মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
তৈত্তিরীয় উপনিষদের ব্রহ্মানন্দবল্লীতে বলা হয়েছে— “সত্যং জ্ঞানমনন্তং ব্রহ্ম।” অর্থাৎ— “ব্রহ্ম সত্য, জ্ঞান এবং অনন্ত।” সেই একই উপনিষদে বলা হয়েছে— “ব্রহ্মবিদাপ্নোতি পরম্।” অর্থাৎ— “যে ব্রহ্মকে জানে, সে পরমকে লাভ করে।”
এখানেও মূল বিষয় কোনও ধর্মের নাম নয়।
বিষয় হল— ব্রহ্মের জ্ঞান।
তাহলে মোক্ষ কোথায়?
এখানে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা দরকার। আজকের ভাষায় আমরা ‘মোক্ষ’ শব্দটি ব্যবহার করি। কিন্তু প্রাচীন প্রধান উপনিষদগুলির মূল আলোচনায় মুক্তির ধারণা অনেক সময় ‘অমৃতত্ব’, ‘বিমুক্তি’, ‘শোক অতিক্রম’, ‘বন্ধনমুক্তি’ ইত্যাদি শব্দের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
অর্থাৎ ‘মোক্ষ’ ধারণাটি উপনিষদীয় চিন্তার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলেও প্রতিটি উপনিষদে একই শব্দে তা প্রকাশ করা হয়নি। কঠ উপনিষদে বলা হয়েছে—
“অনুষ্ঠায় ন শোচতি
বিমুক্তশ্চ বিমুচ্যতে।”
অর্থাৎ আত্মস্বরূপ উপলব্ধির সঙ্গে শোকমুক্তি ও মুক্তির সম্পর্ক স্থাপন করা হয়েছে।
মুণ্ডক উপনিষদে মুক্তির ধারণা আরও স্পষ্ট
মুণ্ডক উপনিষদের তৃতীয় মুণ্ডকের দ্বিতীয় খণ্ডে বলা হয়েছে—
“যথা নদ্যঃ স্যন্দমানাঃ সমুদ্রেহস্তং গচ্ছন্তি নামরূপে বিহায়।
তথা বিদ্বান্ নামরূপাদ্ বিমুক্তঃ পরাৎ পরং পুরুষমুপৈতি দিব্যম্।”
অর্থাৎ নদীগুলি যেমন নাম ও রূপ ত্যাগ করে সমুদ্রে মিলিত হয়, তেমন জ্ঞানী ব্যক্তি নাম ও রূপের বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে পরম পুরুষকে লাভ করেন।
এর পরেই বলা হয়েছে—
“স যো হ বৈ তৎ পরমং ব্রহ্ম বেদ
ব্রহ্মৈব ভবতি নাস্যাব্রহ্মবিৎ কুলে ভবতি।
তরতি শোকং তরতি পাপ্নানং
গুহাগ্রন্থিভ্যো বিমুক্তোহমৃতো ভবতি।”
অর্থাৎ যে পরম ব্রহ্মকে জানে, সে ব্রহ্মস্বরূপ হয়ে ওঠে; তার কুলে কেউ অব্রহ্মবিদ হয় না। তিনি মানস সন্তাপ অতিক্রম করেন এবং ধর্মাধর্ম অতিক্রম করেন। তিনি হৃদয়ের বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে অমৃতত্ব লাভ করেন।
এখানে ‘মোক্ষ’ শব্দটির চেয়ে মুক্তি ও অমৃতত্বের অভিজ্ঞতা বেশি প্রত্যক্ষভাবে প্রকাশিত হয়েছে।
তাহলে উপনিষদে ‘সনাতন ধর্ম’ কোথায়?
এখন আমাদের মূল প্রশ্নে ফিরে আসা যাক।
আমরা দেখলাম— উপনিষদে ‘ধর্ম’ আছে। তৈত্তিরীয় উপনিষদে— “ধর্মং চর”
অর্থাৎ ধর্মাচরণ বা কর্তব্য পালনের নির্দেশ রয়েছে। উপনিষদে ‘সনাতন’ আছে। কঠ উপনিষদে— “অশ্বত্থঃ সনাতনঃ” এবং— “গুহ্যং ব্রহ্ম সনাতনম্।” অর্থাৎ সনাতন অশ্বত্থ এবং সনাতন ব্রহ্মের কথা রয়েছে। উপনিষদে আত্মা আছে। আত্মার জন্ম-মৃত্যুহীনতার কথা বলা হয়েছে। উপনিষদে ব্রহ্ম আছে।
‘সত্যং জ্ঞানমনন্তং ব্রহ্ম’, ‘অয়মাত্মা ব্রহ্ম’, ‘ব্রহ্মবিদাপ্নোতি পরম্’—এই ধরনের বক্তব্যে ব্রহ্মতত্ত্বের গভীর আলোচনা রয়েছে। উপনিষদে মুক্তির ধারণা আছে।
‘বিমুক্ত’, ‘অমৃত’, ‘অমৃতত্ব’, ‘শোক অতিক্রম’ ইত্যাদি ধারণার মাধ্যমে মুক্তির কথা বলা হয়েছে।
কিন্তু একটি বিষয় এখনও পাওয়া গেল না
এই সমস্ত পাঠের মধ্যে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য চোখে পড়ে। ‘ধর্ম’ আছে। ‘সনাতন’ আছে। আত্মা আছে। ব্রহ্ম আছে। মুক্তির ধারণা আছে। কিন্তু এগুলিকে পাশাপাশি রেখে— “সনাতন ধর্ম” নামে একটি নির্দিষ্ট, একক ধর্মপরিচয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে—এমন সরাসরি বক্তব্য প্রধান উপনিষদগুলির আমরা যে প্রাসঙ্গিক মূলপাঠ যাচাই করেছি, সেখানে পাওয়া যায় না।
বিশেষ করে কঠ উপনিষদের “গুহ্যং ব্রহ্ম সনাতনম্”-কে ‘সনাতন ধর্ম’ বলা যায় না। সেখানে ‘সনাতন’ শব্দটি ব্রহ্মের বিশেষণ। তৈত্তিরীয় উপনিষদের “ধর্মং চর”-কে ‘সনাতন ধর্ম’ বলা যায় না। সেখানে ‘ধর্ম’ হল আচরণ ও কর্তব্যের নির্দেশ।
এই পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তাহলে কি উপনিষদ ‘সনাতন ধর্ম’-এর ভিত্তি নয়?
এমন কথাও বলা যাবে না। বরং আরও সতর্কভাবে বলা উচিত— উপনিষদীয় দর্শনের মধ্যে এমন বহু ধারণা রয়েছে, যেগুলি পরবর্তী কালে ‘সনাতন ধর্ম’ নামে পরিচিত বৃহত্তর ধর্মীয় ও দার্শনিক পরম্পরার অন্যতম ভিত্তি হয়ে উঠেছে। আত্মা, ব্রহ্ম, কর্ম, পুনর্জন্ম, জ্ঞান, ত্যাগ, ধ্যান, মুক্তি, অমৃতত্ব, সত্য, ধর্ম— এসব ধারণার গভীর বিকাশ ভারতীয় ধর্মদর্শনের পরবর্তী ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
কিন্তু একটি পরবর্তী ধর্মীয় পরিচয়ের সঙ্গে প্রাচীন উপনিষদীয় ধারণাকে সরাসরি এক করে ফেলা এবং বলা যে “উপনিষদেই ‘সনাতন ধর্ম’ নামে ধর্মটির নামকরণ হয়েছিল”—এই দুটি বক্তব্য এক নয়।
শব্দের ইতিহাস আর পরিচয়ের ইতিহাস এক নয়
এই সিরিজের শুরু থেকেই আমরা যে প্রশ্নটি করছি, সপ্তম পর্বে এসে তার উত্তর আরও স্পষ্ট হচ্ছে। ‘সনাতন’ শব্দটি প্রাচীন। ‘ধর্ম’ শব্দটিও প্রাচীন। সনাতনতার ধারণা প্রাচীন। ধর্মাচরণের ধারণাও প্রাচীন। আত্মা, ব্রহ্ম ও মুক্তির অনুসন্ধানও প্রাচীন। কিন্তু— এই সমস্ত প্রাচীন ধারণা একত্রে মিলেই যে প্রাচীন যুগে ‘সনাতন ধর্ম’ নামে একটি একক ধর্মীয় পরিচয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল—এমন সরাসরি প্রমাণ উপনিষদের মূলপাঠ থেকে পাওয়া যায় না।
এখানেই ইতিহাস এবং পরবর্তী ধর্মীয় পরিচয়ের মধ্যে পার্থক্য করতে হয়।
উপনিষদের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—‘আমি কে?’
উপনিষদীয় অনুসন্ধানকে যদি এক বাক্যে ধরতে হয়, তবে বলা যায়— মানুষের বাহ্যিক পরিচয়ের চেয়ে তার অন্তর্নিহিত সত্য কী—এই প্রশ্নই এখানে ক্রমশ বড় হয়ে ওঠে। আমি কি শুধু এই শরীর? আমি কি শুধু নাম ও পরিচয়? মৃত্যুর পর কী থাকে? আত্মা কি নশ্বর? ব্রহ্ম কী? জগতের মূল সত্য কী? জ্ঞান কীভাবে মুক্তি দিতে পারে?
এই প্রশ্নগুলির উত্তর খুঁজতে গিয়েই উপনিষদীয় দর্শনের বিস্তার। তাই উপনিষদকে শুধু একটি ধর্মীয় নামের উৎস হিসেবে দেখলে তার বৃহত্তর দার্শনিক প্রকৃতি আড়াল হয়ে যায়।
এই পর্বের সিদ্ধান্ত
সপ্তম পর্বের অনুসন্ধান থেকে সবচেয়ে সতর্ক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত হল—উপনিষদে ‘ধর্ম’ শব্দ আছে, কিন্তু তা আধুনিক অর্থে কোনও নির্দিষ্ট ধর্মের নাম নয়। উপনিষদে ‘সনাতন’ শব্দ আছে, কিন্তু তা বিভিন্ন প্রসঙ্গে চিরন্তন, অনাদি বা অব্যাহত সত্তার বিশেষণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
কঠ উপনিষদে ‘সনাতন ব্রহ্ম’ এবং ‘সনাতন অশ্বত্থ’-এর উল্লেখ আছে। তৈত্তিরীয় উপনিষদে ‘ধর্মং চর’ বলা হয়েছে। ছান্দোগ্য উপনিষদে ‘ত্রয়ো ধর্মস্কন্ধাঃ’ বলা হয়েছে।
কিন্তু এই পাঠগুলিকে একত্র করে ‘সনাতন ধর্ম’ নামে একটি নির্দিষ্ট ধর্মপরিচয় উপনিষদেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল—এমন সরাসরি প্রমাণ পাওয়া যায় না। বরং উপনিষদ আমাদের সামনে যে জগৎটি খুলে দেয়, সেখানে ধর্ম হল কর্তব্য ও আচরণের একটি ধারণা, সনাতন হল চিরন্তনতার একটি বিশেষণ, আর আত্মা ও ব্রহ্ম হল গভীর দার্শনিক অনুসন্ধানের কেন্দ্র।
পরবর্তী সময়ে এইসব ধারণা বিভিন্ন শাস্ত্র, দর্শন ও ধর্মীয় পরম্পরার মধ্যে নতুন অর্থ ও নতুন পরিচয় লাভ করে।
সুতরাং— উপনিষদে ‘সনাতন’ আছে। উপনিষদে ‘ধর্ম’ আছে। উপনিষদে আত্মা আছে।
উপনিষদে ব্রহ্ম আছে। উপনিষদে মুক্তির অনুসন্ধান আছে।
কিন্তু— উপনিষদের এই শব্দগুলিকে সরাসরি আধুনিক ‘সনাতন ধর্ম’ নামের সঙ্গে এক করে দেওয়া ইতিহাসের দিক থেকে অতিরিক্ত সরলীকরণ। এবং এই পার্থক্যটিই আমাদের পরবর্তী পর্বের দরজা খুলে দেয়।
এই সপ্তম পর্বের সূত্রসমূহ
১. তৈত্তিরীয় উপনিষদ — শিক্ষাবল্লী, একাদশ অনুবাক
‘সত্যং বদ, ধর্মং চর’ এবং ‘ধর্মান্ন প্রমদিতব্যম্’—ধর্মের ব্যবহার।
২. ছান্দোগ্য উপনিষদ — ২.২৩.১
‘ত্রয়ো ধর্মস্কন্ধাঃ’—ধর্মের তিনটি ভিত্তি এবং ‘ব্রহ্মসংস্থোऽমৃতত্বমেতি’।
৩. কঠ উপনিষদ — ২.৩.১
‘এষোऽশ্বত্থঃ সনাতনঃ’—সনাতন শব্দের ব্যবহার।
৪. কঠ উপনিষদ — ২.২.৬
‘গুহ্যং ব্রহ্ম সনাতনম্’—সনাতন ব্রহ্মের উল্লেখ।
৫. মুণ্ডক উপনিষদ — ৩.২.৯
ব্রহ্মজ্ঞান, বন্ধনমুক্তি ও অমৃতত্বের সম্পর্ক।
৬. মাণ্ডুক্য উপনিষদ — ২
‘অয়মাত্মা ব্রহ্ম’—আত্মা ও ব্রহ্মের সম্পর্ক।
৭. বৈদিক ঐতিহ্যভিত্তিক সরকারি সংগ্রহ
প্রধান উপনিষদগুলির বিষয়, পাঠ ও বৈদিক পরম্পরা সম্পর্কে তথ্য।
পর্ব ৮ | মহাভারতে ‘এষ ধর্মঃ সনাতনঃ’
‘সনাতন ধর্ম’ কি তখন একটি ধর্মের নাম, নাকি চিরন্তন কর্তব্যের ধারণা?
মহাভারতের একাধিক স্থানের মূল পাঠ পাশাপাশি রেখে বিশ্লেষণ।
— লিখছেন অনিরুদ্ধ পাল
“বিশ্বাসের প্রতি শ্রদ্ধা, ইতিহাসের প্রতি দায়বদ্ধতা।”
Published on: সেপ্টে ২৪, ২০২৬ at ২৩:১৫




