
সিন্ধু থেকে হিন্দুশ—একটি শব্দের আড়াই হাজার বছরের যাত্রা
✍️ অনিরুদ্ধ পাল | সংবাদ প্রভাকর টাইমস
এসপিটি বিশেষ প্রতিবেদন : “হিন্দু” শব্দটি কোথা থেকে এসেছে?
এটি কি প্রাচীন ভারতীয়দের নিজেদের দেওয়া নাম?
নাকি বিদেশিরা ভারতীয়দের এই নামে ডাকতে শুরু করেছিল?
“হিন্দু” কি শুরু থেকেই একটি ধর্মের নাম ছিল?
নাকি প্রথমে ছিল একটি নদী, একটি ভূখণ্ড এবং সেই ভূখণ্ডের মানুষের পরিচয়?
আর যদি “হিন্দু” শব্দটি এত প্রাচীন হয়, তাহলে “হিন্দুধর্ম” কি একইভাবে প্রাচীন?
এই প্রশ্নগুলির উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের ফিরতে হয় প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে—ইসলামের জন্মেরও বহু শতাব্দী আগে, এমন এক সময়ে যখন ভারতীয় উপমহাদেশের ধর্মীয় জীবন আজকের মতো একটি মাত্র সুসংজ্ঞায়িত ধর্মীয় পরিচয়ের মধ্যে আবদ্ধ ছিল না।
এই অনুসন্ধানের শুরু তাই “হিন্দুধর্ম” দিয়ে নয়। শুরু করতে হবে “সিন্ধু” দিয়ে।
সিন্ধু—একটি নদীর নাম
প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শব্দ “সিন্ধু”।
ঋগ্বেদে “সিন্ধু” শব্দের ব্যবহার পাওয়া যায়। সেখানে শব্দটি নদী, বিশেষত প্রবাহমান জলধারা বা বৃহৎ নদীর অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। পরবর্তী কালে “সিন্ধু” বলতে বিশেষভাবে উত্তর-পশ্চিম ভারতীয় উপমহাদেশের সেই বিশাল নদীকে বোঝানো হয়, যাকে আমরা আজও সিন্ধু নদ নামে চিনি। কিন্তু এই “সিন্ধু” শব্দই কীভাবে “হিন্দু” হয়ে গেল? এখানেই শুরু ভাষার এক দীর্ঘ যাত্রা।
ইতিহাসবিদ অড্রে ট্রুশকের গবেষণা অনুসারে, “হিন্দু” শব্দের প্রাচীনতম নির্দিষ্টভাবে তারিখ নির্ধারণযোগ্য ব্যবহার পাওয়া যায় আকেমেনীয় পারস্য সাম্রাজ্যের ষষ্ঠ শতক খ্রিস্টপূর্বের শিলালিপিতে। সেখানে উত্তর-পশ্চিম ভারতীয় ভূখণ্ডের একটি অঞ্চলকে প্রাচীন পারসিক ভাষায় “হিন্দুশ” নামে উল্লেখ করা হয়েছিল। গবেষণায় এই শব্দটির সঙ্গে প্রাচীন ভারতীয় “সিন্ধু” শব্দের সম্পর্ক দেখানো হয়েছে।
অর্থাৎ, প্রথম প্রশ্নের উত্তরটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ— “হিন্দু” শব্দের ইতিহাস শুরু হয় ধর্মের নাম হিসেবে নয়; ভূগোলের নাম হিসেবে।
সিন্ধু থেকে হিন্দু—‘স’ থেকে ‘হ’
প্রাচীন ভারতীয় ও প্রাচীন ইরানীয় ভাষাগোষ্ঠীর মধ্যে ঘনিষ্ঠ ভাষাগত সম্পর্ক ছিল। একই উৎসের শব্দ দুই ভাষার ভিন্ন ধ্বনিগত নিয়মে পরিবর্তিত হয়েছে।
“সিন্ধু” শব্দটি যখন প্রাচীন ইরানীয় ভাষার পরিসরে প্রবেশ করে, তার প্রথম ধ্বনির পরিবর্তনের ফলে তা “হিন্দু” বা “হিন্দুশ”-এর কাছাকাছি রূপ নেয়। এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। “হিন্দু” শব্দটি যেন হঠাৎ করে কোনও নতুন শব্দ হিসেবে সৃষ্টি হয়নি। বরং এটি একটি পুরনো শব্দের ভাষান্তরিত রূপের ঐতিহাসিক যাত্রার ফল।
অর্থাৎ— সিন্ধু → হিন্দু/হিন্দুশ
এই পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে ভাষাগত রূপান্তর, কোনও ধর্মীয় মতবাদ নয়। অড্রে ট্রুশকের গবেষণা দেখিয়েছে, আকেমেনীয় সাম্রাজ্যের বিভিন্ন ভাষায় একই ভূখণ্ডের জন্য “হিন্দুশ”, “হিন্দু” প্রভৃতি রূপ ব্যবহৃত হয়েছিল। পরবর্তীকালে গ্রিক লেখকরাও এই শব্দের সঙ্গে সম্পর্কিত রূপ ব্যবহার করেন।
আকেমেনীয় শিলালিপিতে ‘হিন্দুশ’
এখানে আমাদের থামতে হবে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক প্রমাণের সামনে। খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে প্রতিষ্ঠিত আকেমেনীয় পারস্য সাম্রাজ্য পশ্চিম এশিয়া থেকে বিস্তৃত হয়ে উত্তর-পশ্চিম ভারতীয় উপমহাদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে পৌঁছেছিল। এই সাম্রাজ্যের রাজাদের বিভিন্ন শিলালিপিতে তাঁদের অধীনস্থ অঞ্চলগুলির তালিকা পাওয়া যায়।
সেখানেই উত্তর-পশ্চিম ভারতীয় একটি ভূখণ্ডের নাম হিসেবে পাওয়া যায় “হিন্দুশ”। অর্থাৎ, “হিন্দু” শব্দের লিখিত ইতিহাসকে ইসলাম-পরবর্তী সময় থেকে শুরু করা যায় না।
এমনকি ইসলাম ধর্মের আবির্ভাবেরও বহু শতাব্দী আগে “হিন্দু” শব্দের পূর্বসূরি রূপ রাজনৈতিক-ভৌগোলিক নথিতে ব্যবহৃত হচ্ছিল। এটি আমাদের প্রথম বড় ভুল ধারণা সংশোধন করে।
প্রচলিত ধারণা– “মুসলমানরা ভারতীয়দের হিন্দু নাম দিয়েছিল।”
ঐতিহাসিক প্রমাণ কী বলে?
“হিন্দু” শব্দের প্রাচীনতম নির্দিষ্ট লিখিত ব্যবহার ইসলামের বহু আগে, আকেমেনীয় পারস্যের নথিতে পাওয়া যায়। তবে এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন প্রয়োজন। এর অর্থ এই নয় যে আকেমেনীয়রা তখন “হিন্দুধর্ম” নামে একটি ধর্মের নাম ব্যবহার করছিল। তারা একটি ভূখণ্ডের নাম ব্যবহার করছিল।
এই পার্থক্যটিই পুরো সিরিজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
তাহলে ‘হিন্দু’ কি ধর্মের নাম ছিল না?
প্রাথমিক পর্যায়ে—না। অন্তত প্রাচীনতম প্রমাণগুলিতে “হিন্দু”কে একটি ধর্মের নাম হিসেবে দেখা যায় না। শব্দটির প্রাথমিক অর্থ ছিল মূলত সিন্ধু নদীর ওপারের বা সিন্ধু-অঞ্চলের ভূখণ্ড ও মানুষের সঙ্গে সম্পর্কিত পরিচয়। অর্থাৎ, এটি ছিল একটি ভৌগোলিক পরিচয়।
আজ আমরা যেমন কোনও অঞ্চলের মানুষকে সেই অঞ্চলের নাম দিয়ে চিহ্নিত করতে পারি, প্রাচীন বিশ্বের ক্ষেত্রেও তেমন ঘটনা ঘটেছে। এখানে আর একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ।
ঐতিহাসিক অড্রে ট্রুশকে দেখিয়েছেন যে “হিন্দু” শব্দটির অর্থ পরবর্তী আড়াই হাজার বছরে একরকম থাকেনি। বিভিন্ন সময়, বিভিন্ন ভাষা এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক-সামাজিক প্রেক্ষাপটে এর অর্থ বদলেছে। আধুনিক যুগে এটি একটি ধর্মীয় পরিচয় হিসেবে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হলেও সেই ধর্মীয় অর্থটি শব্দটির প্রাচীনতম অর্থ নয়।
গ্রিকদের কাছে ‘হিন্দু’ কীভাবে পৌঁছল?
পারস্যের সঙ্গে গ্রিক বিশ্বের যোগাযোগ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভারতীয় উপমহাদেশ সম্পর্কে গ্রিক লেখকদের জ্ঞানও বৃদ্ধি পায়। পারসিক “হিন্দুশ”-এর সঙ্গে সম্পর্কিত শব্দরূপ গ্রিক ভাষায় প্রবেশ করে। পরবর্তীকালে “ইন্দোস” এবং “ইন্ডিয়া”-র মতো রূপের জন্ম হয়। আজকের “ইন্ডিয়া” নামটির ইতিহাসও তাই এই বৃহত্তর শব্দযাত্রার সঙ্গে যুক্ত।
একদিকে— সিন্ধু
অন্যদিকে— হিন্দু
আর গ্রিক ভাষার পথে— ইন্দোস
এবং পরবর্তীকালে— ইন্ডিয়া।
একটি নদীর নাম কীভাবে একটি ভূখণ্ডের আন্তর্জাতিক পরিচয়ে পরিণত হল—এটি তারই দীর্ঘ ভাষাগত ইতিহাস।
কিন্তু একটি প্রশ্ন থেকেই যায়—ঋগ্বেদে ‘হিন্দু’ কোথায়?
এই প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি “হিন্দু” এত প্রাচীন হয়, তাহলে ঋগ্বেদে কেন আমরা “হিন্দু” শব্দটি খুঁজে পাই না? কারণটি খুব সরল। ঋগ্বেদের ভাষা প্রাচীন বৈদিক সংস্কৃত। সেখানে আমরা “সিন্ধু” শব্দের ব্যবহার পাই। কিন্তু “হিন্দু” শব্দটি যে রূপে পরবর্তী সময়ে পারসিক ভাষায় দেখা যায়, তা ঋগ্বেদের ভাষার অংশ নয়।
অর্থাৎ— ঋগ্বেদে “সিন্ধু” আছে। আকেমেনীয় পারস্যের নথিতে “হিন্দুশ” আছে। এই দুটি তথ্য একসঙ্গে রাখলেই শব্দটির ভাষাগত যাত্রাটি স্পষ্ট হয়।
তাহলে কি ‘হিন্দু’ শব্দটি বিদেশিদের দেওয়া?
এখানে উত্তরটি “হ্যাঁ” বা “না”—কোনও এক শব্দে দেওয়া ঠিক হবে না। কারণ প্রশ্নটির মধ্যেই দুটি আলাদা বিষয় মিশে যায়।
যদি প্রশ্ন হয়— “প্রাচীন ভারতীয়রা নিজেদের ধর্মের নাম হিসেবে ‘হিন্দু’ বলতেন কি?” তাহলে প্রাচীনতম বৈদিক যুগের জন্য এমন প্রমাণ আমাদের হাতে নেই।
কিন্তু যদি প্রশ্ন হয়— “‘হিন্দু’ শব্দটি কি ভারতের বাইরের ভাষায় প্রথম লিখিতভাবে ব্যবহৃত হয়েছিল?”
তাহলে উত্তরটি অনেক বেশি স্পষ্ট। আকেমেনীয় পারস্যের প্রাচীন নথিই তার প্রাচীনতম নির্দিষ্ট প্রমাণগুলির মধ্যে অন্যতম। তাই “হিন্দু” শব্দটিকে শুধু “বিদেশিদের বানানো অপমানজনক নাম” বলা যেমন ইতিহাসকে সরল করে ফেলে, তেমনই এটিকে “বৈদিক যুগ থেকেই সমগ্র ভারতীয় ধর্মের নিজস্ব নাম” বলাও প্রমাণের সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না। সত্যটি তার চেয়ে অনেক বেশি জটিল।
‘হিন্দু’ তখনও ‘হিন্দুধর্ম’ নয়
এই পার্থক্যটি মনে রাখা জরুরি। একটি শব্দের প্রাচীনতা প্রমাণ করলেই সেই শব্দের বর্তমান অর্থের প্রাচীনতা প্রমাণ হয় না।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়— “হিন্দু” শব্দের ইতিহাস আড়াই হাজার বছরেরও বেশি পুরনো হতে পারে। কিন্তু তার অর্থ যদি সেই দীর্ঘ সময়ে পরিবর্তিত হয়ে থাকে, তাহলে খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকের “হিন্দু” এবং একবিংশ শতকের “হিন্দু”—দুটিকে একই অর্থে ব্যবহার করা ঐতিহাসিকভাবে ভুল হতে পারে।
অড্রে ট্রুশকের গবেষণার মূল বক্তব্যগুলির একটি হল, “হিন্দু” শব্দটি দুই হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে বিভিন্ন অর্থ ও পরিচয়ের মধ্যে চলাচল করেছে। এর আধুনিক ধর্মীয় অর্থ তুলনামূলকভাবে নতুন।
ধর্মের নাম কোথায় এল?
এখানেই আমাদের অনুসন্ধান আরও গভীরে প্রবেশ করে। কারণ প্রাচীন ভারতীয় সমাজে ধর্মীয় জীবন ছিল অত্যন্ত বহুমাত্রিক। বৈদিক যজ্ঞপরম্পরা ছিল। ব্রাহ্মণ্য আচার ছিল।
পরবর্তীকালে বৈষ্ণব, শৈব, শাক্ত, স্মার্ত এবং অসংখ্য স্থানীয় ও আঞ্চলিক ধর্মীয় পরম্পরা বিকশিত হয়েছে। এই সমস্ত ধারাকে আজ আমরা একটি বৃহত্তর পরিচয়ের অধীনে “হিন্দুধর্ম” বলে অভিহিত করি।
কিন্তু প্রশ্ন হল— প্রাচীন ভারতীয়রাও কি তাঁদের এই সমস্ত ধর্মীয় পরম্পরাকে একসঙ্গে একটি মাত্র ধর্মের নামে ডাকতেন?
এখানেই “হিন্দু” এবং “হিন্দুধর্ম”-এর ইতিহাস আলাদা হয়ে যায়। এই প্রশ্নের উত্তর আমরা এই প্রথম পর্বে সম্পূর্ণভাবে দিতে পারব না। কারণ তার জন্য আমাদের যেতে হবে বেদ, উপনিষদ, মহাভারত, পুরাণ, মধ্যযুগীয় সংস্কৃত ও পারসিক সাহিত্য এবং ঔপনিবেশিক যুগের নথির দিকে। সেটিই হবে পরবর্তী পর্বগুলির অনুসন্ধান।
আর ‘সনাতন ধর্ম’?
এই প্রথম পর্বের শেষে আরও একটি প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই উঠে আসে।
যদি “হিন্দু” মূলত একটি ভূগোলভিত্তিক পরিচয় হয়ে থাকে, তাহলে ভারতীয় ধর্মের আসল নাম কি “সনাতন ধর্ম” ছিল?
এই দাবিও অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পরীক্ষা করতে হবে। কারণ “সনাতন” এবং “ধর্ম”—দুটি শব্দই অত্যন্ত প্রাচীন সংস্কৃত শব্দ। প্রাচীন সংস্কৃত সাহিত্যে “সনাতন ধর্ম” বা “ধর্মঃ সনাতনঃ” ধরনের বাক্যাংশও পাওয়া যায়। কিন্তু কোনও গ্রন্থে “সনাতন ধর্ম” শব্দ দুটি পাওয়া গেলেই কি প্রমাণ হয় যে সেখানে সমগ্র হিন্দুধর্মের আনুষ্ঠানিক নাম বোঝানো হয়েছে? সেটিই পরবর্তী পর্বগুলির অন্যতম প্রধান প্রশ্ন।
আধুনিক গবেষক পিটার হীস ২০২৪ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখিয়েছেন যে “সনাতন ধর্ম” শব্দযুগল প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় সংস্কৃত সাহিত্যে যথেষ্ট পুরনো হলেও, প্রাচীন ভারতীয় ধর্মীয় বিশ্বাস ও অনুশীলনের সামগ্রিক নাম হিসেবে এর ব্যবহার পাওয়া যায় না; সমগ্র হিন্দুধর্মের সমার্থক পরিচয় হিসেবে এর ব্যবহার মূলত ঔপনিবেশিক যুগের শেষভাগে জোরালো হয়ে ওঠে।
অর্থাৎ— “সনাতন” প্রাচীন। “ধর্ম” প্রাচীন। “সনাতন ধর্ম” শব্দযুগলের প্রাচীন ব্যবহারও আছে। কিন্তু “সনাতন ধর্ম” = সমগ্র হিন্দুধর্মের প্রাচীনতম আনুষ্ঠানিক নাম—এই দাবিটি আলাদা করে প্রমাণ করতে হবে। এই পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই পর্বের প্রথম সিদ্ধান্ত
এখন পর্যন্ত পাওয়া ঐতিহাসিক প্রমাণ থেকে অন্তত কয়েকটি বিষয় যথেষ্ট স্পষ্ট।
প্রথমত- “হিন্দু” শব্দের ইতিহাস অত্যন্ত প্রাচীন এবং এর শিকড় “সিন্ধু” শব্দের সঙ্গে যুক্ত।
দ্বিতীয়ত- “হিন্দু” শব্দের প্রাচীনতম নির্দিষ্ট লিখিত ব্যবহারগুলির একটি আকেমেনীয় পারস্যের ষষ্ঠ শতক খ্রিস্টপূর্বের নথিতে পাওয়া যায়।
তৃতীয়ত- সেই প্রাচীন ব্যবহারে “হিন্দু” মূলত একটি ভূগোলভিত্তিক পরিচয়—আধুনিক অর্থে একটি ধর্মের নাম নয়।
চতুর্থত- পরবর্তী দুই হাজারেরও বেশি বছরে “হিন্দু” শব্দটির অর্থ ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হয়েছে এবং বিভিন্ন ভাষা ও রাজনৈতিক-সামাজিক প্রেক্ষাপটে নতুন অর্থ গ্রহণ করেছে।
পঞ্চমত- “হিন্দু” শব্দটি প্রাচীন হলেও “হিন্দুধর্ম” নামে একটি সুসংহত ও সর্বজনীন ধর্মীয় শ্রেণি হিসেবে এর আধুনিক ব্যবহার অনেক পরের বিষয়।
ষষ্ঠত- “সনাতন ধর্ম” শব্দযুগল প্রাচীন হলেও, সেটিকে প্রাচীনকাল থেকেই সমগ্র হিন্দুধর্মের একমাত্র বা আনুষ্ঠানিক নাম হিসেবে দেখানোর পক্ষে সরল প্রমাণ নেই।
কিন্তু সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি এখনও বাকি
যদি “হিন্দু” প্রথমে ধর্মের নাম না হয়ে থাকে— তাহলে প্রাচীন ভারতীয়রা তাঁদের ধর্মীয় জীবনকে কী নামে চিনতেন?
বেদে “ধর্ম” বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
“সনাতন” শব্দটি কোথায় কোথায় ব্যবহৃত হয়েছে?
ঋগ্বেদের “ধর্মাণি সনতা”-র অর্থ কি সত্যিই “সনাতন ধর্ম”?
মহাভারতের “এষ ধর্মঃ সনাতনঃ” কি একটি ধর্মের নাম, নাকি কোনও চিরন্তন নৈতিক বিধানের ঘোষণা?
মনুস্মৃতির একই বাক্যাংশের অর্থ কী?
আর ভগবদ্গীতার “শাশ্বতধর্মগোপ্তা” এবং “সনাতন পুরুষ”—এই শব্দগুলির প্রকৃত তাৎপর্য কী?
এই প্রশ্নগুলির উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের আর পারস্যের রাজদরবারে থেমে থাকা চলবে না। এবার প্রবেশ করতে হবে বৈদিক ভারতের ভিতরে। (Picture: AI GENERATE)
পরবর্তী পর্ব
পর্ব ২ | সিন্ধু থেকে হিন্দু
একটি নদীর নাম কীভাবে মানুষের পরিচয়ে পরিণত হল?
সিন্ধু থেকে হিন্দু—শুধু ধ্বনির পরিবর্তন নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পারস্য, গ্রিক, মধ্যযুগীয় ভারত, ভাষার পরিবর্তন এবং একটি ভূখণ্ডকে বাইরের পৃথিবী কীভাবে চিনত তার ইতিহাস।
এই যাত্রাতেই ধীরে ধীরে বদলেছে একটি শব্দের অর্থ। হিন্দু—প্রথমে নদী ও ভূগোলের সঙ্গে যুক্ত একটি নাম; পরে মানুষ; আরও পরে ধর্মীয় পরিচয়।
কিন্তু সেই পরিবর্তন কখন, কীভাবে এবং কেন ঘটল?
সেটিই হবে পরবর্তী অনুসন্ধান।
প্রধান সূত্র:
- Audrey Truschke, Hindu: A History, Cambridge University Press, 2023.
- Encyclopaedia Iranica, “India i. Introduction”.
- Encyclopaedia Iranica, “India iii. Political and Cultural Relations: Achaemenid Period”.
- Rigveda, Mandala 10, Sukta 75 — নদীসূক্ত।
- Darius I, DNa — Naqsh-e Rostam Inscription, line 25 — Hinduš.
- Darius I, DPh — Apadana Foundation Inscription — Hindu/Hidauv




