নতুন গৃহ-আবাসন নীতি ২০২৬: গ্রামের বাড়িই কি এবার বাংলার পর্যটনের নতুন ঠিকানা?

Main দেশ ভ্রমণ রাজ্য
শেয়ার করুন

,৩২২ থেকে ৪৩ হাজারের বেশি কর্মসংস্থানগৃহআবাসন ঘিরে গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা, আটটি ঘর পর্যন্ত ব্যবস্থার প্রস্তাব

Published on: সেপ্টে ৩, ২০২৬ at ২১:১২

অনিরুদ্ধ পাল | সংবাদ প্রভাকর টাইমস

এসপিটি নিউজ, কলকাতা: পর্যটনের ভবিষ্যৎ কি এবার বড় শহরের হোটেল ছাড়িয়ে পৌঁছে যাবে বাংলার প্রত্যন্ত গ্রামের বাড়িতে? পশ্চিমবঙ্গ সরকারের প্রস্তাবিত গৃহ-আবাসন নীতি ২০২৬ সেই সম্ভাবনাই সামনে এনেছে। তবে শুরুতেই একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি—এই নীতি এখনও খসড়া পর্যায়ে রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন দফতরের সরকারি ওয়েবসাইটে ২০২৬ সালের গৃহ-আবাসন নীতিকে বর্তমানে ‘খসড়া’ হিসেবেই প্রকাশ করা হয়েছে। ফলে খসড়ায় থাকা সুবিধা ও বিধানগুলিকে এখনও চূড়ান্ত সরকারি অধিকার হিসেবে ধরে নেওয়া যাবে না।

তবু এই খসড়া গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পশ্চিমবঙ্গে গৃহ-আবাসন ইতিমধ্যেই একটি বড় পর্যটন অর্থনীতি তৈরি করেছে। সরকারি ২০২৫ সালের বাজেট নথি অনুযায়ী, রাজ্যে ৫,৩২২টি গৃহ-আবাসন নথিভুক্ত ছিল এবং তার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মিলিয়ে ৪১,৩২০টি কর্মসংস্থান যুক্ত হয়েছিল। এর মধ্যে প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থান ২৫,৮২৫ এবং পরোক্ষ কর্মসংস্থান ১৫,৪৯৫। সরকারি নথিতে এই ক্ষেত্রের বার্ষিক চক্রবৃদ্ধি বৃদ্ধির হার প্রায় ২০ শতাংশ বলেও উল্লেখ করা হয়েছিল।

আর ২০২৬-২৭ সালের বাজেট নথিতে গৃহ-আবাসন ক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত মোট কর্মসংস্থান ৪৩,২৭২-এ পৌঁছেছে বলে জানানো হয়েছে। অর্থাৎ সরকারি হিসাব অনুযায়ী কর্মসংস্থানের সংখ্যা এক বছরের ব্যবধানে প্রায় ১,৯৫২ বেড়েছে।

২০১৭ থেকে ২০২৬গৃহআবাসনের এক দশকের পথচলা

পশ্চিমবঙ্গে গৃহ-আবাসন পর্যটনের ভিত্তি তৈরি হয়েছিল ২০১৭ সালের গৃহ-আবাসন পর্যটন নীতি দিয়ে। পরে ২০১৯ ও ২০২২ সালে তা সংশোধিত হয়।

২০২২ সালের নীতির অধীনে গৃহ-আবাসনের মালিককে এক লক্ষ টাকা পর্যন্ত আর্থিক সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থা ছিল, যা দুই সমান কিস্তিতে দেওয়ার কথা সরকারি বাজেট নথিতে উল্লেখ করা হয়েছিল।

২০২৩ সালের শেষে রাজ্যে মোট ৫,১৩২টি গৃহ-আবাসন চালু থাকার সরকারি হিসাব পাওয়া যায়। তখন প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মিলিয়ে কর্মসংস্থান ছিল ৪০ হাজারের কাছাকাছি।

২০২৪ সালের সরকারি হিসাবেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৫,৩২২-এ এবং কর্মসংস্থান ৪১,৩২০-তে।  অর্থাৎ কয়েক বছরের মধ্যে গৃহ-আবাসন আর বিচ্ছিন্ন কিছু বাড়ির উদ্যোগ না থেকে রাজ্যের পর্যটন অর্থনীতির একটি আলাদা স্তম্ভে পরিণত হয়েছে।

নতুন খসড়ায় বড় পরিবর্তনছয় নয়, আট ঘর

২০২৬ সালের প্রস্তাবিত নীতির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনগুলির একটি হল গৃহ-আবাসনের আকার বাড়ানোর প্রস্তাব। আগের ব্যবস্থায় সর্বোচ্চ ছয়টি অতিথিকক্ষ রাখার সুযোগ ছিল। নতুন খসড়ায় তা বাড়িয়ে আটটি অতিথিকক্ষ, অর্থাৎ সর্বোচ্চ ১৬টি শয্যা করার প্রস্তাব রয়েছে। এর ফলে একটি সাধারণ পরিবারের বাড়ি ভবিষ্যতে আরও বেশি পর্যটককে থাকার সুযোগ দিতে পারবে।

তবে আটটির বেশি অতিথিকক্ষ হলে সেটিকে আর গৃহ-আবাসন হিসেবে গণ্য না করে অন্য পর্যটন আবাসনের শ্রেণিতে নেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।

শহর নয়, গ্রামই নতুন নীতির মূল লক্ষ্য

২০২৬ সালের খসড়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হল—নতুন গৃহ-আবাসন মূলত গ্রামীণ এলাকার জন্য। অর্থাৎ শহরাঞ্চলে নতুন করে এই শ্রেণির গৃহ-আবাসন তৈরির সুযোগ সীমিত করার প্রস্তাব রয়েছে। এর ফলে পর্যটন শিল্পের কেন্দ্র ধীরে ধীরে বড় শহর থেকে গ্রামাঞ্চলের দিকে সরে যেতে পারে।

বাংলার ক্ষেত্রে যার অর্থ হতে পারে— পাহাড়ের গ্রাম → চা-বাগান সংলগ্ন গ্রাম → জঙ্গলঘেরা গ্রাম → নদীতীরবর্তী গ্রাম → ঐতিহাসিক গ্রাম → আদিবাসী গ্রাম।

এই পরিবর্তনই ২০২৬ সালের খসড়াকে আগের নীতির তুলনায় আলাদা গুরুত্ব দিচ্ছে।

কেন গ্রামকে পর্যটনের কেন্দ্র করতে চাইছে সরকার?

কারণ পশ্চিমবঙ্গের পর্যটনের আসল বৈচিত্র্য শহরের বাইরে। দার্জিলিংয়ের পাহাড়, কালিম্পংয়ের গ্রাম, ডুয়ার্সের বনাঞ্চল, পুরুলিয়ার লালমাটি, বাঁকুড়ার মন্দির, বীরভূমের লোকসংস্কৃতি, মুর্শিদাবাদের ইতিহাস, সুন্দরবনের নদী ও ম্যানগ্রোভ—সবকিছুর কেন্দ্রেই রয়েছে স্থানীয় মানুষের জীবন।

একটি বড় হোটেল পর্যটককে একটি ঘর দিতে পারে। কিন্তু একটি গ্রামের পরিবার দিতে পারে— ঘর + খাবার + স্থানীয় সংস্কৃতি + কৃষি + লোকসংগীত + কারুশিল্প + গ্রামের জীবনযাত্রার অভিজ্ঞতা।

এই ‘অভিজ্ঞতা-ভিত্তিক পর্যটন’ই আগামী দিনের বড় বাজার হতে পারে।

এক লক্ষ থেকে এক লক্ষ পঞ্চাশ হাজার টাকাকাদের জন্য?

২০২৬ সালের খসড়ায় গৃহ-আবাসনের মালিকদের জন্য আর্থিক সহায়তার প্রস্তাব রয়েছে। সাধারণ ক্ষেত্রে মোট এক লক্ষ টাকা সহায়তার কাঠামো প্রস্তাব করা হয়েছে।

এর মধ্যে—

  • প্রথম কিস্তি: ৫০ হাজার টাকা
  • দ্বিতীয় কিস্তি: ৫০ হাজার টাকা

অতিরিক্তভাবে নির্দিষ্ট শ্রেণির মালিকদের জন্য আরও ৫০ হাজার টাকা দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। ফলে যোগ্য ক্ষেত্রে মোট সহায়তা দাঁড়াতে পারে এক লক্ষ ৫০ হাজার টাকা। বিশেষ সুবিধার আওতায় রাখার প্রস্তাব রয়েছে—

  • মহিলা-মালিকানাধীন গৃহ-আবাসন
  • আদিবাসী সম্প্রদায়ের গৃহ-আবাসন
  • নির্দিষ্ট বিশেষ গ্রামের গৃহ-আবাসন।

তবে আবারও মনে রাখতে হবে—এগুলি বর্তমানে ২০২৬ সালের খসড়ায় প্রস্তাবিত ব্যবস্থা, চূড়ান্ত কার্যকর সুবিধা নয়।

নিজের বাড়ি হতে হবেভাড়া করা বাড়ি নয়

খসড়া নীতিতে মালিকানার বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে। অন্যের বাড়ি ভাড়া নিয়ে সেটিকে গৃহ-আবাসন হিসেবে পরিচালনা করার পরিবর্তে নিজস্ব বাড়িকে গৃহ-আবাসনে রূপান্তর করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

এর ফলে প্রকৃত গ্রামীণ পরিবার পর্যটন ব্যবসায় যুক্ত হবে এবং কেবল ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে বাড়ি ভাড়া নিয়ে গৃহ-আবাসন পরিচালনার প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হতে পারে।

ঘরের মাপও নির্দিষ্ট

গৃহ-আবাসনের মান বজায় রাখতে খসড়ায় ঘরের ন্যূনতম আয়তনের কথাও রয়েছে। দুই শয্যার ঘরের জন্য ন্যূনতম ১২০ বর্গফুট, এক শয্যার ঘরের জন্য ১০০ বর্গফুট এবং স্নানঘরের জন্য ৩০ বর্গফুট আয়তনের প্রস্তাব রয়েছে।

অতিথিকক্ষের সঙ্গে স্নানঘর, পর্যাপ্ত আলো-বাতাস, বিছানা, আসবাব, পানীয় জল, আবর্জনা রাখার ব্যবস্থা এবং অন্যান্য মৌলিক সুবিধার কথাও বলা হয়েছে।

সোনালিরুপালি’—দুই মান

গৃহ-আবাসনের মান যাচাইয়ের জন্য দুটি শ্রেণির প্রস্তাব রয়েছে।

শ্রেণি প্রস্তাবিত নম্বর
সোনালি ৭৫ বা তার বেশি
রুপালি ৫০–৭৪
যোগ্য নয় ৫০-এর কম

পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, স্বাস্থ্যবিধি, অবস্থান, ঘরের মান, নিরাপত্তা, খাবার এবং পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থার ভিত্তিতে মূল্যায়নের প্রস্তাব রয়েছে। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যবিধিকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

গ্রামের রান্নাঘরও হবে পর্যটনের সম্পদ

নতুন নীতির দর্শন শুধু ‘থাকার ঘর’ তৈরি করা নয়। স্থানীয় খাবারকে পর্যটনের অংশ করার ওপরও জোর রয়েছে।

ধরা যাক পুরুলিয়ার কোনও গ্রামে পর্যটক গেলেন। সেখানে তিনি শুধু রাতে থাকার জায়গা পেলেন না। বরং—

  • স্থানীয় রান্না খেলেন
  • গ্রামের কৃষিজমি দেখলেন
  • স্থানীয় শিল্পীর কাজ দেখলেন
  • লোকসংগীত শুনলেন
  • গ্রামের উৎসব দেখলেন
  • স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রা জানলেন।

তাহলে পর্যটকের খরচের একটি বড় অংশ গ্রামের অর্থনীতির মধ্যেই থেকে যাবে।

কৃষি থেকে পর্যটননতুন সম্ভাবনা

খসড়া নীতিতে স্থানীয় কৃষিকে পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করার সম্ভাবনাও রাখা হয়েছে। ভবিষ্যতে গৃহ-আবাসনের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে— কৃষিভ্রমণ, বাগান দেখা, জৈব চাষ, স্থানীয় খাদ্য উৎপাদন, গাছ লাগানো এবং গ্রামের কৃষিজীবন দেখার সুযোগ।

ফলে পর্যটক শুধু ‘গন্তব্য’ দেখতে যাবেন না; তিনি সেই এলাকার জীবনযাত্রার অংশ হওয়ার সুযোগ পাবেন।

পর্যটকের টাকা কতটা গ্রামের মানুষের হাতে পৌঁছবে?

এটাই এই নীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক প্রশ্ন। একজন পর্যটক একটি গ্রামে গেলে তাঁর খরচ হতে পারে— থাকা → খাবার → গাড়ি → পথপ্রদর্শক → স্থানীয় শিল্প → কৃষিপণ্য → নৌভ্রমণ → লোকসংস্কৃতি। অর্থাৎ একটি পর্যটক পরিবারের খরচ সরাসরি বহু পরিবারের আয় তৈরি করতে পারে।

এই কারণে গৃহ-আবাসনকে শুধু আবাসন শিল্প হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি একই সঙ্গে— কর্মসংস্থান + ক্ষুদ্র ব্যবসা + কৃষি + কারুশিল্প + পরিবহণ + খাদ্যসংস্কৃতি + স্থানীয় সংস্কৃতি

—এই সাতটি ক্ষেত্রকে যুক্ত করতে পারে।

সরকারি পরিসংখ্যানেই সাফল্যের ইঙ্গিত

২০২৪ সালের সরকারি বাজেট নথিতে দেখা যায়, ২০২৩ সালের শেষে পশ্চিমবঙ্গে ২,৩৪০টি গৃহ-আবাসন নথিভুক্ত হওয়ার তথ্যও দেওয়া হয়েছিল, যা ১৮,৭২০টি কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত ছিল। একই নথিতে আরও বৃহত্তর সরকারি ব্যবস্থার অধীনে মোট ৫,১৩২টি গৃহ-আবাসন চালু থাকার কথা বলা হয়েছিল।

২০২৫ সালের সরকারি বাজেটে নথিভুক্ত গৃহ-আবাসনের সংখ্যা বেড়ে ৫,৩২২ হয় এবং কর্মসংস্থান পৌঁছয় ৪১,৩২০-তে।

২০২৬-২৭ সালের বাজেট নথিতে কর্মসংস্থান বেড়ে ৪৩,২৭২ হয়েছে।  অর্থাৎ সংখ্যাগুলি একটি বিষয় স্পষ্ট করে— গৃহ-আবাসন এখন বাংলার পর্যটন অর্থনীতির প্রান্তিক ক্ষেত্র নয়।

জেলা অনুযায়ী কোথায় সবচেয়ে বেশি গৃহআবাসন?

পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন দফতরের বর্তমান সরকারি তালিকায় রাজ্যের একাধিক জেলায় গৃহ-আবাসন নথিভুক্ত রয়েছে। সরকারি তালিকায় ২৩টি জেলার জন্য আলাদা গৃহ-আবাসন তালিকা রয়েছে।

এর মধ্যে কালিম্পং বিশেষভাবে এগিয়ে।

সরকারি পর্যটন দফতরের বর্তমান তালিকায় কালিম্পংয়ে ১,১৩৫টি গৃহ-আবাসন দেখানো হয়েছে।  এখানে লাভা, পেডং, গরুবাথান-সহ একাধিক পাহাড়ি ও গ্রামীণ এলাকার গৃহ-আবাসন তালিকাভুক্ত রয়েছে।

এর অর্থ হল উত্তরবঙ্গের পাহাড় ইতিমধ্যেই গৃহ-আবাসন পর্যটনের পরীক্ষাগার হয়ে উঠেছে।

শুধু পাহাড় নয়দক্ষিণবঙ্গেও সম্ভাবনা

গৃহ-আবাসন তালিকায় মুর্শিদাবাদ, বীরভূম, ঝাড়গ্রাম, মালদহ, পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, দুই মেদিনীপুর, নদিয়া, সুন্দরবন-সংলগ্ন দক্ষিণ ২৪ পরগনা-সহ বিভিন্ন জেলার নাম রয়েছে।  এখানে বিশেষ সম্ভাবনাময় পর্যটন ধারাগুলি হতে পারে—

ঐতিহ্য পর্যটন মুর্শিদাবাদ, মালদহ, নদিয়া

লোকসংস্কৃতি–  বীরভূম, পুরুলিয়া, বাঁকুড়া

জঙ্গল পর্যটন-  ঝাড়গ্রাম, ডুয়ার্স

সমুদ্র পর্যটন-  পূর্ব মেদিনীপুর

প্রকৃতি নদী পর্যটন-  দক্ষিণ ২৪ পরগনা ও সুন্দরবন

বাংলার পর্যটক সংখ্যা যখন দ্রুত বাড়ছে

২০২৬-২৭ সালের রাজ্য বাজেটের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ থেকে ২০২৪-এর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গে দেশীয় পর্যটকের সংখ্যা ৮.৮ কোটি থেকে ১৮.৪৪ কোটি হয়েছে।

বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা একই সময়ে প্রায় ১০ লক্ষ থেকে ৩১ লক্ষে পৌঁছেছে।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী ২০২২ থেকে ২০২৪-এর মধ্যে মোট পর্যটক আগমনের গড় বার্ষিক বৃদ্ধির হার ছিল ৪৫.২ শতাংশ।

২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত রাজ্যে মোট ২৪.২৪ কোটি পর্যটক এসেছিলেন বলে বাজেট নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে; এর মধ্যে দেশীয় পর্যটক ২৩.৯৪ কোটি এবং বিদেশি পর্যটক প্রায় ৩০ লক্ষ।

এই বিপুল পর্যটক বাজারের সামান্য অংশও যদি গ্রামীণ গৃহ-আবাসনের দিকে যায়, তাহলে তার প্রভাব বাংলার গ্রামীণ অর্থনীতিতে বড় হতে পারে।

তবে চ্যালেঞ্জও কম নয়

গৃহ-আবাসনের সংখ্যা বাড়লেই পর্যটন সফল হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলি হল—

. যোগাযোগ ব্যবস্থাগ্রামের বাড়ি সুন্দর হলেও সেখানে যাওয়ার রাস্তা খারাপ হলে পর্যটক দ্বিতীয়বার যাবেন না।

. পরিচ্ছন্নতাগ্রামীণ পর্যটনের ক্ষেত্রে পরিষ্কার জল, স্নানঘর ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

. নিরাপত্তাবিশেষত মহিলা, শিশু ও বিদেশি পর্যটকদের জন্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা অপরিহার্য।

. প্রশিক্ষণঅতিথি আপ্যায়ন, রান্না, পরিচ্ছন্নতা ও জরুরি পরিস্থিতি সামলানোর প্রশিক্ষণ প্রয়োজন।

. প্রচারগ্রামের অনেক গৃহ-আবাসন ভালো হলেও পর্যটকের কাছে তাদের তথ্য পৌঁছয় না।

. মানের সামঞ্জস্যএকটি গৃহ-আবাসন অত্যন্ত ভালো আর অন্যটি নিম্নমানের হলে পুরো অঞ্চলের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

সরকারি নজরদারি কেন গুরুত্বপূর্ণ?

আগের ব্যবস্থার বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে সরকারি নিরীক্ষাতেও কিছু দুর্বলতা ধরা পড়েছে। তাই নতুন খসড়ায় নিবন্ধন, পরিদর্শন, প্রশিক্ষণ, অতিথির তথ্য সংরক্ষণ এবং নিয়মিত নজরদারির ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়ার প্রস্তাব অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ পর্যটনের ক্ষেত্রে একটি খারাপ অভিজ্ঞতাই কোনও গ্রামের দীর্ঘদিনের সুনাম নষ্ট করতে পারে।

নতুন নীতির সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা—‘গ্রামকে গন্তব্যে পরিণত করা

এতদিন বাংলার পর্যটনে অনেক সময় গ্রাম ছিল কোনও বড় গন্তব্যের পথে একটি স্থান। নতুন গৃহ-আবাসন ব্যবস্থা সেই ধারণা বদলে দিতে পারে।

আগে পর্যটক বলতেন— “দার্জিলিং যাব।” আগামী দিনে তিনি বলতে পারেন— “দার্জিলিংয়ের কাছে ওই গ্রামের বাড়িতে থাকব।”

আগে বলতেন—“পুরুলিয়া ঘুরব।” এখন বলতে পারেন— “পুরুলিয়ার আদিবাসী গ্রামের গৃহ-আবাসনে দু’দিন থাকব।”

আগে সুন্দরবন ছিল নৌভ্রমণের জায়গা। আগামী দিনে হতে পারে— সুন্দরবনের গ্রামীণ জীবন অনুভব করার গন্তব্য।

২০২২ বনাম ২০২৬: কী বদলাতে পারে?
বিষয় ২০২২এর ব্যবস্থা ২০২৬এর খসড়া
সর্বোচ্চ অতিথিকক্ষ
সর্বোচ্চ শয্যা ১২ ১৬
নতুন গৃহ-আবাসনের মূল লক্ষ্য বিস্তৃত গ্রামীণ এলাকা
সাধারণ আর্থিক সহায়তা ১ লক্ষ টাকা লক্ষ টাকা প্রস্তাবিত
বিশেষ ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সহায়তা ৫০ হাজার টাকা প্রস্তাবিত
মানের শ্রেণিবিন্যাস পূর্ববর্তী ব্যবস্থা সোনালি রুপালি প্রস্তাব
প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা ছিল আরও গুরুত্বের প্রস্তাব
স্থানীয় সংস্কৃতি ও খাবার গুরুত্ব আরও জোর

তবে ২০২৬এর কলামটি খসড়াভিত্তিক; চূড়ান্ত সরকারি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত এগুলিকে প্রস্তাব হিসেবেই দেখতে হবে।

একটি বড় প্রশ্ন: হোটেলের বিকল্প, না সম্পূরক?

গৃহ-আবাসনকে বড় হোটেলের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখলে বিষয়টি পুরোপুরি বোঝা যাবে না। হোটেলের নিজস্ব বাজার রয়েছে। গৃহ-আবাসনের শক্তি অন্য জায়গায়। হোটেল দেয় সুবিধা। গৃহ-আবাসন দিতে পারে স্থানীয় অভিজ্ঞতা। ফলে ভবিষ্যতে বাংলার পর্যটনে দুই ব্যবস্থাই পাশাপাশি থাকতে পারে।

বড় শহর ও জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্রে হোটেল। আর প্রত্যন্ত পর্যটনকেন্দ্রে স্থানীয় পরিবারের গৃহ-আবাসন।

শেষ কথা: গ্রামের বাড়িই কি বাংলার পর্যটনের পরবর্তী বড় ঠিকানা?

পরিসংখ্যান বলছে, গৃহ-আবাসন ইতিমধ্যেই দ্রুত বেড়েছে। ৫,৩২২টি নথিভুক্ত গৃহ-আবাসন থেকে ৪৩,২৭২টি কর্মসংস্থান—এই সংখ্যাকে আর ছোট উদ্যোগ বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।  অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গে পর্যটকের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে।

এই দুই প্রবণতা যদি একসঙ্গে এগোয়, তাহলে বাংলার পর্যটনের পরবর্তী বড় পরিবর্তন হতে পারে ‘গন্তব্যের বিকেন্দ্রীকরণ—অর্থাৎ কয়েকটি জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্রের বদলে বহু ছোট গ্রাম পর্যটনের মানচিত্রে উঠে আসা।

তবে সাফল্য নির্ভর করবে একটি বিষয়ের ওপর— গ্রামের বাড়িকে শুধু থাকার জায়গা বানানো হবে, নাকি গ্রামের জীবনকেই পর্যটনের অভিজ্ঞতা বানানো হবে?

২০২৬ সালের প্রস্তাবিত নীতি দ্বিতীয় পথটির দিকে এগোতে চাইছে। আর যদি তা বাস্তবে সফল হয়, তাহলে আগামী দিনের পর্যটকের প্রশ্ন হয়তো আর শুধু— “বাংলায় কোথায় যাব?”

নয়।

বরং প্রশ্ন হবে— “বাংলার কোন গ্রামের বাড়িতে এবার থাকব?”
(Picture: AI Generate) 

Published on: সেপ্টে ৩, ২০২৬ at ২১:১২

সূত্র: পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন দফতর, পশ্চিমবঙ্গ অর্থ দফতরের ২০২৪, ২০২৫ ও ২০২৬-২৭ সালের বাজেট নথি।

শেয়ার করুন