পর্ব ৩ | নদীর গায়ে গড়ে ওঠা জনপদ

Main দেশ বিদেশ ভ্রমণ রাজ্য
শেয়ার করুন

নদী শুধু জল বহন করেনিবহন করেছে মানুষের জীবন, বাণিজ্য, পর্যটন উন্নয়নের ইতিহাস। কিন্তু ২৬ আগস্টের ভয়াবহ বন্যা প্রশ্ন তুলেছে, যে নদীর স্বাভাবিক পথের এত কাছে আমরা জনপদ গড়ে তুলেছি, সেই নদী যদি একদিন নিজের শক্তি ফিরে পায়, তখন মানুষ কোথায় দাঁড়াবে?

Published on: সেপ্টে ২, ২০২৬ at ২৩:৩২

অনিরুদ্ধ পাল
সংবাদ প্রভাকর টাইমস

এসপিটি বিশেষ প্রতিবেদন:  নদীর পাশে মানুষ কেন?

হিমালয়ের নদীর তীরে বসতি গড়ে ওঠা কোনও সাম্প্রতিক ঘটনা নয়।

হাজার হাজার বছর ধরে মানুষ নদীর কাছেই বসবাস করেছে। কারণ নদী মানে জল। নদী মানে উর্বর মাটি। নদী মানে যাতায়াতের পথ। নদী মানে বাণিজ্য। নদী মানে খাদ্য।

আর পাহাড়ি অঞ্চলে নদী মানে অনেক সময় একমাত্র অপেক্ষাকৃত সহজ চলাচলের পথ।

ভোটেকোশী ও ত্রিশূলীর ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। বরং এখানে নদীকে ঘিরে তৈরি হয়েছে এমন এক বিস্তৃত মানবিক করিডর, যার সঙ্গে আজ জড়িয়ে রয়েছে বসতি, বাজার, সীমান্ত বাণিজ্য, সড়ক, জলবিদ্যুৎ, তীর্থযাত্রা, পদযাত্রা এবং পর্যটন।

২৬ আগস্টের বন্যা সেই দীর্ঘ ইতিহাসের উপরেই আঘাত করেছে।

আর সেই আঘাতের পরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি দাঁড়িয়েছে— যে জায়গায় নদী মানুষের জীবন তৈরি করেছে, সেই জায়গাই কি এখন মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হয়ে উঠেছে?

প্রথম জনপদ: রসুয়াগঢ়ীর দিকে

উচ্চ হিমালয় থেকে নেমে আসা ভোটেকোশীর উজান অঞ্চলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানব বসতিগুলির মধ্যে রয়েছে তিমুরে এবং রসুয়াগঢ়ী।

এখানে নদী শুধু প্রাকৃতিক জলধারা নয়। এটি ছিল প্রাচীন যাতায়াত ও বাণিজ্যের পথ। নেপাল পর্যটন দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, তিমুরে তিব্বতের সঙ্গে পুরনো বাণিজ্যপথের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান। রসুয়াগঢ়ীর দুর্গ নেপাল ও তিব্বতের বহু শতাব্দীর সম্পর্কের ঐতিহাসিক স্মারক হিসেবে বিবেচিত। তিমুরে ও রসুয়াগঢ়ীকে ঘিরে আজও পুরনো সীমান্ত-বাণিজ্যের ইতিহাস, তামাং সংস্কৃতি এবং পাহাড়ি জীবনযাত্রার চিহ্ন রয়েছে।  অর্থাৎ এখানে বসতি তৈরি হওয়ার পেছনে আধুনিক রাস্তার চেয়ে পুরনো ইতিহাস অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

মানুষ নদীর পাশে এসেছিল কারণ— নদীর উপত্যকা ছিল চলার পথ। সেই পথ পরে বাণিজ্যের পথ হয়েছে। বাণিজ্যের পথ পরে সীমান্তপথ হয়েছে। আর আধুনিক সময়ে সেই পথের পাশে গড়ে উঠেছে বাজার, পরিবহণ ব্যবস্থা এবং পর্যটন-পরিকাঠামো।

তিমুরে: সীমান্তের ছোট জনপদ, কিন্তু ইতিহাসে বড়

তিমুরে আজ শুধু একটি পাহাড়ি গ্রাম নয়।

এটি তিব্বতের দিকে যাওয়ার পুরনো পথের সঙ্গে যুক্ত একটি ঐতিহাসিক জনপদ। তামাং ঐতিহ্যপথের পর্যটন মানচিত্রেও তিমুরের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। নেপাল পর্যটন দপ্তরের পর্যটন নির্দেশিকায় তিমুরে থেকে রসুয়াগঢ়ী হয়ে আবার তিমুরে ফেরার পথকে ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক ভ্রমণপথ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এই পথে তামাং সংস্কৃতি, পাহাড়ি গ্রামজীবন এবং পুরনো সীমান্ত দুর্গ দেখার সুযোগ ছিল।

কিন্তু ২৬ আগস্টের বন্যায় এই অঞ্চলই প্রথম ভয়াবহ আঘাতের মুখে পড়ে।

সমসাময়িক প্রতিবেদনে তিমুরে ও স্যাফ্রুবেসীর বাজার, বসতি এবং জলবিদ্যুৎ পরিকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতির কথা উঠে এসেছে।  অর্থাৎ যে নদী একসময় মানুষকে সীমান্তের দিকে নিয়ে যেত— সেই নদীই এবার মানুষকে পালানোর জন্য সময় দেয়নি।

স্যাফ্রুবেসী: পর্যটনের দরজা

ভোটেকোশীর তীরবর্তী জনপদগুলির মধ্যে স্যাফ্রুবেসী বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ এটি শুধু স্থানীয় মানুষের বসতি নয়— এটি লাংটাং ও তামাং ঐতিহ্যপথের অন্যতম প্রবেশদ্বার।

নেপাল পর্যটন দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, কাঠমান্ডু থেকে স্যাফ্রুবেসী হয়ে লাংটাং অঞ্চলে যাওয়া যায়। স্যাফ্রুবেসী থেকেই তামাং ঐতিহ্যপথের পদযাত্রা শুরু হয়; এই পথ গলজুং, গাতলাং, চিলিমে, তাতোপানি, তিমুরে, রসুয়াগঢ়ী এবং ব্রিদ্দিমের মতো জনপদকে যুক্ত করে।

অর্থাৎ নদীর তীরের একটি ছোট পাহাড়ি জনপদ ধীরে ধীরে হয়ে উঠেছিল— পর্যটনের প্রবেশদ্বার। এখানে গড়ে উঠেছিল—

  • আবাসন,
  • খাবারের দোকান,
  • স্থানীয় বাজার,
  • পথপ্রদর্শক পরিষেবা,
  • যাত্রাবিরতির ব্যবস্থা,
  • স্থানীয় গৃহবাস,
  • এবং পর্যটন-নির্ভর জীবিকা।

কিন্তু ২৬ আগস্টের বন্যায় স্যাফ্রুবেসীর বহু অংশ ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উপগ্রহচিত্র ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে নদীর তীরবর্তী ভবন ও বসতির ব্যাপক ধ্বংসের চিত্র উঠে এসেছে।

এখানে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে। পর্যটন নিজে বিপদ তৈরি করেনি। কিন্তু পর্যটন যত বেড়েছে, নদীর করিডরে মানুষের উপস্থিতিও তত বেড়েছে। আর দুর্যোগের সময় সেই ঘন মানবিক উপস্থিতিই ক্ষতির মাত্রা বাড়িয়ে দিতে পারে।

লাংটাং: নদী, পর্বত পর্যটনের এক বিশাল জগৎ

ভোটেকোশী ও ত্রিশূলীর সঙ্গে পর্যটনের সম্পর্ক বুঝতে হলে লাংটাংকে বাদ দেওয়া যায় না।

লাংটাং নেপালের অন্যতম পরিচিত পর্বতভ্রমণ অঞ্চল।

নেপাল পর্যটন দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, লাংটাং অঞ্চলে হিমালয়ের দৃশ্য, বনভূমি, বন্যপ্রাণী, হিমবাহ, উচ্চভূমির তৃণভূমি এবং তামাং সংস্কৃতি পর্যটকদের আকর্ষণ করে। লাংটাং জাতীয় উদ্যানের বিস্তৃতি রসুয়া, নুয়াকোট ও সিন্ধুপালচক জেলার পাহাড়ি অঞ্চলেও রয়েছে।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল— লাংটাং নদী এসে ভোটেকোশীর সঙ্গে যুক্ত হয়।

নেপাল পর্যটন দপ্তর বলছে, লাংটাং নদী উচ্চ উপত্যকা থেকে একটি দীর্ঘ ও সরু গিরিখাত অতিক্রম করে ভোটেকোশীতে গিয়ে মিশেছে। একই সঙ্গে ত্রিশূলী বা ধুনচের উপরের অংশের ভোটেকোশী প্রাচীন পাহাড়ি বাণিজ্যপথের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল।

অর্থাৎ এখানে নদী, পর্বত ও পর্যটন—তিনটি আলাদা বিষয় নয়। তারা একই ভূগোলের তিনটি স্তর।

ধুনচে: নদীর উপত্যকা থেকে পর্বতারোহণের পথে

রসুয়া জেলার ধুনচে দীর্ঘদিন ধরে লাংটাং অঞ্চলের অন্যতম প্রবেশদ্বার।

কাঠমান্ডু থেকে সড়কপথে ধুনচে পৌঁছে সেখান থেকে লাংটাং ও গোসাইঙ্কুণ্ডের দিকে যাত্রা করা হয়। নেপাল পর্যটন দপ্তরের পুরনো পর্যটন নির্দেশিকাতেও ধুনচে ও স্যাফ্রুবেসীতে পর্যটন পরিষেবার কথা উল্লেখ রয়েছে।

এখানে নদী শুধু নদী নয়। এটি পাহাড়ের ভিতর দিয়ে তৈরি করেছে চলাচলের স্বাভাবিক পথ। সেই পথ ধরে এসেছে— মানুষ। তারপর— বাজার। তারপর— পর্যটন।

আর পর্যটনের সঙ্গে— আবাসন, খাদ্য, পরিবহণ ও স্থানীয় কর্মসংস্থান।

গোসাইঙ্কুণ্ড: নদীর জন্মের সঙ্গে ধর্মের সম্পর্ক

ত্রিশূলীর গল্প আরও গভীরে গেলে পৌঁছতে হয় গোসাইঙ্কুণ্ডে।

নেপাল পর্যটন দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৪৩৮০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত গোসাইঙ্কুণ্ড হিন্দুদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তীর্থস্থান এবং ত্রিশূলী নদীর উৎস হিসেবে বিবেচিত। প্রতি বছর বিশেষ ধর্মীয় তিথিতে বহু তীর্থযাত্রী সেখানে পবিত্র স্নান করতে যান।

অর্থাৎ ত্রিশূলীর গল্প কেবল জলবিদ্যার গল্প নয়।

এর সঙ্গে যুক্ত—বিশ্বাস।তীর্থ।পুরাণ।পর্যটন।

গোসাইঙ্কুণ্ড থেকে পাহাড় বেয়ে নেমে আসা জল শেষ পর্যন্ত বৃহত্তর ত্রিশূলী নদী ব্যবস্থার অংশ হয়ে যায়।

এক অর্থে— যে জলকে মানুষ পাহাড়ের উপরে পবিত্র বলে পূজা করে, সেই জলই বহু নিচে এসে মানুষের বসতি, কৃষি, বিদ্যুৎ ও পর্যটনের জীবনরেখা হয়ে ওঠে।

ত্রিশূলী নদীর তীরে দ্বিতীয় বড় মানব করিডর

ভোটেকোশীর বিপর্যয়ের পর জল ও ধ্বংসাবশেষ যখন ত্রিশূলীর দিকে নেমে আসে, তখন সামনে পড়ে আরও ঘন জনবসতিপূর্ণ অঞ্চল।

এর মধ্যে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ— বেত্রাবতী। বিদুর। ত্রিশূলী বাজার। দেবীঘাট।

এরপর আরও দক্ষিণে ত্রিশূলী নদীর বৃহত্তর প্রবাহপথ। ২৬ আগস্টের বিপর্যয়ে এই করিডরের বহু বসতি মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সরকারি সতর্কবার্তায় রসুয়া, নুয়াকোট, ধাদিং ও চিতওয়ানের নদীতীরবর্তী মানুষকে সরিয়ে যেতে বলা হয়েছিল।

বেত্রাবতী: যেখানে পাহাড়ি নদী জনপদ পাশাপাশি

বেত্রাবতী ত্রিশূলী নদী ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ জনপদ। এই অঞ্চলে নদীর পাশে দীর্ঘদিন ধরে বসতি, বাজার এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে।

২৬ আগস্টের পরে বেত্রাবতী জলস্তর পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রও যোগাযোগ হারায়। তার আগে নদীর জলস্তর দ্রুত বাড়ছিল।

বন্যার পরে বেত্রাবতী ও আশপাশের বহু বসতিতে কাদা, ধ্বংসাবশেষ ও জল জমে যায়। পরবর্তী উদ্ধার অভিযানে বেত্রাবতী অঞ্চলের বহু বাড়ি ও ভবনের ভিতর থেকে মৃতদেহ উদ্ধারের ঘটনাও সামনে এসেছে। এই ঘটনাগুলি দেখিয়ে দিয়েছে— নদীর তীরে বসতি তৈরি করা এবং নদীর বিপদকে বোঝা—দুটি আলাদা বিষয়।

মানুষ নদীর পাশে বাস করতে পারে। কিন্তু নদীর সর্বোচ্চ সম্ভাব্য প্রবাহপথ, পুরনো প্রবাহপথ এবং আকস্মিক বন্যার পথ সম্পর্কে অজ্ঞতা প্রাণঘাতী হতে পারে।

বিদুর: প্রশাসনিক শহর, নদীর খুব কাছে জীবন

নুয়াকোট জেলার বিদুর এই নদী-করিডরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নগরকেন্দ্রগুলির একটি।

স্থানীয় প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, বিদুর পৌরসভার গুরুত্বপূর্ণ বাজারকেন্দ্রগুলির মধ্যে বিদুর, বট্টার, ত্রিশূলী, গগটে, হাত্তিগৌড়া, ঢুঙ্গে, বেত্রাবতী, দেবীঘাটসহ একাধিক জনপদ রয়েছে। একই সঙ্গে ত্রিশূলী–মাইলুং–স্যাফ্রুবেসী–রসুয়াগঢ়ী সড়কপথ এই অঞ্চলকে সীমান্তের সঙ্গে যুক্ত করেছে।

অর্থাৎ এখানে নদী ও সড়ক পরস্পরের বিকল্প নয়। বরং তারা পরস্পরের পরিপূরক। নদীর উপত্যকার পাশ দিয়েই তৈরি হয়েছে সড়ক। সড়কের পাশে তৈরি হয়েছে বাজার। বাজারের পাশে তৈরি হয়েছে বসতি। আর এই পুরো ব্যবস্থার উপর দাঁড়িয়ে তৈরি হয়েছে স্থানীয় অর্থনীতি।

বিদুরের সেই বিদ্যালয়: ১৪ মিনিটের সতর্কবার্তা

২৬ আগস্টের বিপর্যয়ের সবচেয়ে শক্তিশালী মানবিক গল্পগুলির একটি বিদুরেই।

ত্রিভুবন ত্রিশূলী মাধ্যমিক বিদ্যালয় ছিল ত্রিশূলী নদী ও একটি জলবিদ্যুৎ নালার মাঝামাঝি এলাকায়। বন্যার খবর পৌঁছানোর পর প্রধান শিক্ষক মাত্র ১৪ মিনিটের মধ্যে প্রায় ৯০০ ছাত্রছাত্রী ও কর্মীকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেন। তারপর নদীর স্রোত বিদ্যালয়টিকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয়।  এই ঘটনা এই সিরিজের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এখানে দুটি ছবি পাশাপাশি দাঁড়িয়ে যায়।

একদিকে— নদীর কাছে তৈরি একটি বিদ্যালয়।

অন্যদিকে— সময়মতো সতর্কবার্তা পেয়ে বেঁচে যাওয়া প্রায় এক হাজার জীবন। অর্থাৎ বিপদ থাকলেও মৃত্যু অনিবার্য নয়।

সঠিক সতর্কবার্তা + দ্রুত সিদ্ধান্ত + নিরাপদ উচ্চভূমি = জীবন বাঁচাতে পারে।

এটি ভবিষ্যতের জন্য সবচেয়ে বড় শিক্ষা।

নুয়াকোট: নদী আর ইতিহাস পাশাপাশি

নুয়াকোট শুধু নদীর জেলা নয়। এটি নেপালের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূখণ্ড।

নেপাল পর্যটন দপ্তর নুয়াকোট দুর্গকে নেপালের একীকরণ ইতিহাসের সূচনাপর্বের সঙ্গে যুক্ত করেছে। অষ্টাদশ শতকের প্রাসাদ-সমষ্টি প্রাচীন কাঠমান্ডু উপত্যকা–তিব্বত বাণিজ্যপথের উপর অবস্থিত ছিল।  নুয়াকোটের এই ইতিহাসও নদী-ভূগোলের সঙ্গে সম্পর্কিত। কারণ পাহাড়ের ভিতর দিয়ে যে পথগুলি প্রাচীন বাণিজ্যকে এগিয়ে নিয়ে যেত, সেগুলির একটি বড় অংশ নদী উপত্যকার সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল।

আজ সেই পুরনো বাণিজ্যপথের জায়গায় এসেছে আধুনিক সড়ক। মকিন্তু ভূগোল বদলায়নি। পাহাড় একই। গিরিখাত একই। নদীর প্রবাহপথের মূল চরিত্রও অনেকাংশে একই। বদলেছে শুধু মানুষের তৈরি পৃথিবী।

ত্রিশূলী বাজার: নদী যখন বাজারের পাশ দিয়ে যায়

ত্রিশূলী বাজারের নামই নদীর সঙ্গে তার সম্পর্কের কথা বলে।

নদীর পাশের এই জনপদ দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় বাণিজ্য ও যোগাযোগের কেন্দ্র। কিন্তু ২৬ আগস্টের বন্যার পরে ত্রিশূলী নদীর জল ও ধ্বংসাবশেষের শক্তি এই বাজার ও আশপাশের যোগাযোগব্যবস্থাকে বিপর্যস্ত করে।

সরকার পরে নদীর দুই তীরের বিচ্ছিন্ন অঞ্চলকে আবার যুক্ত করতে অস্থায়ী সেতু তৈরির উদ্যোগ নেয়। ত্রিশূলী বাজার, বেত্রাবতী বাজার এবং দেবীঘাটের কাছাকাছি সেতু নির্মাণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।  এটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ একটি সেতু ভেঙে গেলে শুধু যানবাহন থামে না।

থেমে যায়— খাদ্য। ওষুধ। উদ্ধার। ব্যবসা। পর্যটন। শিক্ষা। অর্থাৎ নদী-তীরের একটি সেতু আসলে একটি সম্পূর্ণ জনপদের জীবনরেখা।

দেবীঘাট: নদীর সঙ্গে ধর্মের আরেক গভীর সম্পর্ক

ত্রিশূলী নদীর যাত্রাপথে দেবীঘাট একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক স্থান। আর নদীর আরও দক্ষিণে রয়েছে বৃহত্তর দেবঘাট—যেখানে ত্রিশূলী ও কালী গণ্ডকী মিলিত হয়ে নারায়ণী নদী গঠন করে।

নেপাল পর্যটন দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেবঘাট একটি গুরুত্বপূর্ণ তীর্থস্থান। সেখানে বহু মন্দির, আশ্রম ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান রয়েছে। মকর সংক্রান্তির সময়ে বিপুল সংখ্যক তীর্থযাত্রী নদীর সঙ্গমস্থলে সমবেত হন।  এখানে ত্রিশূলীর সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক আরও এক নতুন রূপ নেয়। নদী হয়ে ওঠে পবিত্রতা। সঙ্গম হয়ে ওঠে তীর্থ। তীর্থ হয়ে ওঠে পর্যটন। আর পর্যটন হয়ে ওঠে স্থানীয় অর্থনীতির অংশ।

ত্রিশূলী শুধু তীর্থ নয়, দুঃসাহসিক পর্যটনেরও নদী

এই নদীর সঙ্গে পর্যটনের সম্পর্কের আরেকটি বড় অধ্যায় হল নদীভিত্তিক দুঃসাহসিক ভ্রমণ।

নেপাল পর্যটন দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ত্রিশূলী নেপালের অন্যতম জনপ্রিয় নদীভিত্তিক দুঃসাহসিক ভ্রমণপথ। এর প্রবাহে বিভিন্ন মাত্রার তীব্র স্রোত ও খরস্রোতা অংশ রয়েছে। কাঠমান্ডুর তুলনামূলক কাছাকাছি হওয়ায় দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে নদীটি জনপ্রিয়।

অর্থাৎ নদী এখানে আবার অর্থনীতির উৎস। পর্যটক আসে। স্থানীয় পথপ্রদর্শক কাজ পায়। নৌযান চালক কাজ পায়। খাবারের দোকান চলে। আবাসন চলে। পরিবহণ চলে। একটি নদীর স্রোত থেকে তৈরি হয় একটি সম্পূর্ণ পর্যটন-অর্থনীতি।

ধাদিং: নদী যখন পর্যটনের খেলাঘর

ত্রিশূলীর নিম্নপ্রবাহে ধাদিং জেলার গুরুত্বও বড়।

নেপাল পর্যটন দপ্তর জানিয়েছে, ধাদিংয়ের ত্রিশূলী তীরবর্তী অঞ্চলে নদীভিত্তিক দুঃসাহসিক পর্যটনের পাশাপাশি জলধারাকে ঘিরে গিরিখাতভিত্তিক অভিযানও জনপ্রিয়।

এখানে নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে— দুঃসাহসিক ভ্রমণ। নদীভ্রমণ। পাহাড়ি পথচলা। স্থানীয় খাবার। গ্রামীণ জীবন দেখার সুযোগ। কিন্তু এখানেও একই প্রশ্ন।

পর্যটন কি নদীর প্রকৃত চরিত্রকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে পরিকল্পিত হয়েছে?

কারণ পর্যটকের জন্য যে নদী রোমাঞ্চ— স্থানীয় মানুষের জন্য সেটিই জীবন ও জীবিকার নদী। আর ভয়াবহ বন্যার সময়ে সেটিই হয়ে উঠতে পারে মৃত্যুর স্রোত।

নদীর পাশে জলবিদ্যুৎ: উন্নয়নের আরেক মুখ

ভোটেকোশী–ত্রিশূলী করিডরের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক ব্যবহারগুলির একটি হল জলবিদ্যুৎ। কারণ নদীর খাড়া ঢাল এবং দ্রুত প্রবাহ জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। এই কারণেই রসুয়া ও নুয়াকোটে একাধিক জলবিদ্যুৎ প্রকল্প গড়ে উঠেছে। ২৬ আগস্টের বিপর্যয়ে এই প্রকল্পগুলির বহু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে রসুয়া ও ত্রিশূলী অঞ্চলের একাধিক জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে শ্রমিক নিখোঁজ এবং উদ্ধার অভিযানের কথা উঠে এসেছে।  এখানে প্রকৃতির সঙ্গে উন্নয়নের সংঘাত আরও স্পষ্ট।

নদীর শক্তি থেকে বিদ্যুৎ। কিন্তু নদীর শক্তিই আবার বিদ্যুৎ প্রকল্পের বিপদ। এই দ্বৈত সম্পর্ক আগামী দিনের পরিকল্পনার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বাণিজ্যপথের বিপর্যয়: ৪২ কিলোমিটার রাস্তা

বন্যার পরে একটি তথ্য বিশেষভাবে চোখে পড়ে। বেত্রাবতী থেকে রসুয়াগঢ়ী সীমান্ত পর্যন্ত প্রায় ৪২ কিলোমিটার সড়ক বহু জায়গায় ধ্বংস হয়ে যায়। বহু সেতুও ভেসে যায়।  অর্থাৎ একটি নদীর আকস্মিক স্রোত শুধু কয়েকটি বাড়ি ধ্বংস করেনি।

এটি একটি আন্তর্জাতিক সীমান্ত বাণিজ্যপথের যোগাযোগও ভেঙে দিয়েছে। এখানেই বোঝা যায়— নদীর পাশে গড়ে ওঠা জনপদ আসলে বিচ্ছিন্ন গ্রাম নয়। তারা একটি বিশাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থার অংশ

আরও একটি বিপজ্জনক সত্য

এই নদীর পাশে যে সব জনপদ গড়ে উঠেছে, তাদের অনেকগুলিই নদীর কাছাকাছি থাকার কারণে অর্থনৈতিক সুবিধা পেয়েছে। কিন্তু একই কারণে তাদের ঝুঁকিও বেড়েছে।

নদীর কাছে থাকলে— রাস্তা সহজ। জলবিদ্যুৎ সম্ভব। পর্যটন সহজ। বাণিজ্য সহজ।

কিন্তু—বন্যার সময় পালানোর জায়গা কম। এটাই পাহাড়ি জনপদের মূল দ্বন্দ্ব।

এই বিপর্যয় কি মানুষকে নদীর তীর ছেড়ে যেতে বাধ্য করবে?

এখনই এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনো ঠিক হবে না। কারণ নদীর পাশের সব জায়গা সমান বিপজ্জনক নয়। কোথাও নদী গভীর খাদ দিয়ে গেছে। কোথাও পুরনো বন্যার স্তর অনেক নিচে। কোথাও উচ্চভূমি কাছেই। আবার কোথাও বসতি সরাসরি নদীর সম্ভাব্য বিস্তৃত প্রবাহপথে।

তাই ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার জন্য প্রয়োজন— বৈজ্ঞানিক ঝুঁকি মানচিত্র।

কোন জায়গায়—

  • বসতি চলবে,
  • কোথায় বাজার চলবে,
  • কোথায় বিদ্যালয় হবে,
  • কোথায় জলবিদ্যুৎ প্রকল্প হবে,
  • কোথায় পর্যটনকেন্দ্র থাকবে,
  • আর কোন জায়গা সম্পূর্ণ নির্মাণমুক্ত থাকবে—

তা নদীর পুরনো প্রবাহপথ, সর্বোচ্চ সম্ভাব্য বন্যার উচ্চতা, ভূমিধসের ঝুঁকি, পাহাড়ের স্থিতিশীলতা এবং ভবিষ্যৎ জলবায়ুগত পরিবর্তন বিবেচনা করেই ঠিক করা প্রয়োজন।

একটি ভয়াবহ শিক্ষা: নদী তার পুরনো জায়গা মনে রাখে

২৬ আগস্টের ঘটনাকে শুধু একটি ভয়াবহ বন্যা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি দেখিয়েছে— নদীর জায়গা দখল করে মানুষ যত বেশি স্থাপনা তৈরি করবে, বিপদের সময় ক্ষতিও তত বেশি হতে পারে।

বিদুরের বিদ্যালয়টি যেখানে ছিল, সেখান দিয়ে বন্যার জল ও ধ্বংসাবশেষ চলে গেছে। বেত্রাবতীতে বাড়িঘর কাদার নিচে চাপা পড়েছে। স্যাফ্রুবেসীতে পর্যটন ও বাজারকেন্দ্রিক স্থাপনা ধ্বংস হয়েছে। তিমুরে ও রসুয়াগঢ়ীতে সীমান্ত অবকাঠামো আক্রান্ত হয়েছে। জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে শ্রমিকরা আটকা পড়েছেন। আর বহু সেতু নদীর স্রোতে হারিয়ে গেছে।

প্রশ্ন তাই— আমরা কি নদীর স্বাভাবিক আচরণের সীমা ভুলে গিয়েছিলাম?

পর্যটনের ভবিষ্যৎ কোথায়?

এই প্রশ্নটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ভোটেকোশী–ত্রিশূলী অঞ্চলকে পর্যটন থেকে বিচ্ছিন্ন করা সম্ভব নয়।

এখানে রয়েছে—

  • লাংটাং,
  • গোসাইঙ্কুণ্ড,
  • তামাং ঐতিহ্যপথ,
  • রসুয়াগঢ়ীর ঐতিহাসিক দুর্গ,
  • তিব্বত সীমান্তের পুরনো বাণিজ্যপথ,
  • ত্রিশূলীর নদীভিত্তিক দুঃসাহসিক ভ্রমণ,
  • ধাদিংয়ের গিরিখাত,
  • দেবঘাটের তীর্থ,
  • এবং অসংখ্য পাহাড়ি গ্রাম।

নেপাল পর্যটন দপ্তর নিজেই এই অঞ্চলকে দেশের গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনভূমি হিসেবে চিহ্নিত করেছে।  সুতরাং সমাধান পর্যটন বন্ধ করা নয়। সমাধান হল বিপদ বুঝে পর্যটনকে নতুনভাবে সাজানো।

ভবিষ্যতের পর্যটন কি নদীর তীর থেকে কিছুটা দূরে যাবে?

সম্ভবত যেতে হবে। বিশেষ করে— আবাসন। শিবির। বিদ্যালয়। বাজার। গাড়ি রাখার জায়গা।পর্যটনকেন্দ্রের স্থায়ী নির্মাণ। এসবের ক্ষেত্রে নদীর সম্ভাব্য সর্বোচ্চ বন্যার সীমানা নির্ধারণ করা জরুরি।

নদীর একেবারে গা ঘেঁষে পর্যটন স্থাপনা তৈরি করার বদলে কিছুটা উঁচু ও নিরাপদ জায়গায় সেগুলি তৈরি করা যেতে পারে। নদী থাকবে। পর্যটনও থাকবে। কিন্তু মানুষের জীবনকে নদীর সরাসরি আঘাতের সামনে দাঁড় করিয়ে নয়।

এই পর্বের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন

২৬ আগস্টের বিপর্যয় আমাদের সামনে একটি কঠিন সত্য তুলে ধরেছে। মানুষ নদীর কাছে যায় কারণ নদী জীবন দেয়। কিন্তু একই নদী কখনও কখনও জীবন কেড়ে নেয়। ভোটেকোশী ও ত্রিশূলীর তীরে তাই শুধু জনপদ তৈরি হয়নি।

তৈরি হয়েছে— একটি সভ্যতা। একটি অর্থনীতি। একটি পর্যটনপথ। একটি সীমান্ত-বাণিজ্যপথ।একটি বিদ্যুৎ করিডর। আর সেই কারণেই নদীর বিপর্যয় এত বড় হয়েছে।

২৬ আগস্ট পাহাড় ভেঙে পড়েছিল। কিন্তু ধ্বংস হয়েছিল শুধু পাহাড় নয়। ধ্বংস হয়েছিল মানুষের তৈরি সেই দীর্ঘ করিডর, যা কয়েক শতাব্দী ধরে নদীর সঙ্গে সহাবস্থান করে গড়ে উঠেছিল।

শেষ কথা

নদীকে থামানো যাবে না। পাহাড়কে সরানো যাবে না। হিমবাহকে আদেশ দেওয়া যাবে না। কিন্তু মানুষ কোথায় বসতি গড়বে, কোথায় বিদ্যালয় বানাবে, কোথায় জলবিদ্যুৎ প্রকল্প করবে, কোথায় পর্যটনকেন্দ্র তৈরি করবে—সেই সিদ্ধান্ত মানুষ নিতে পারে। সেখানেই ভবিষ্যতের পথ।

প্রশ্ন নদীকে সরানো নয়।

প্রশ্ন হল—নদীর জায়গা বুঝে মানুষ নিজেকে কতটা সরিয়ে নিতে পারে।

কারণ ২৬ আগস্টের ভয়াবহতা হয়তো শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু নদী ও পাহাড়ের সেই সতর্কবার্তা এখনও শেষ হয়নি।

Published on: সেপ্টে ২, ২০২৬ at ২৩:৩২

পরবর্তী পর্ব

পর্ব | নদীর পাশে উন্নয়ন, নাকি বিপদের ভিত?

ভোটেকোশী ত্রিশূলীর তীরে কেন একের পর এক জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, সড়ক, সেতু, বাজার পর্যটনকেন্দ্র তৈরি হল? উন্নয়নের এই মডেল কতটা নিরাপদ? ২৬ আগস্টের ধ্বংসের পরে কোন প্রকল্পগুলিকে নতুন করে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন?

হিমালয়ের হুঁশিয়ারি
ভোটেকোশী থেকে ত্রিশূলীএক বিপর্যয়ের অন্তরালে

নয় পর্বের অনুসন্ধানী ধারাবাহিক
লিখছেন অনিরুদ্ধ পাল


শেয়ার করুন