দীর্ঘ ১৬ বছরের জট কাটল, বরানগর থেকে বারাকপুর মেট্রোর পথে বড় অগ্রগতি

Main দেশ ভ্রমণ রাজ্য রেল
শেয়ার করুন

কলকাতা পুরসভার অনাপত্তি শংসাপত্র মিলল; ,৫৮৭ কোটি টাকার দরপত্রের পর এবার বাস্তব নির্মাণের পথ আরও পরিষ্কার

Published on: আগ ২৫, ২০২৬ at ২১:১৬

সংবাদ প্রভাকর টাইমস প্রতিবেদন: দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসানের পথে বরানগর-বারাকপুর মেট্রো প্রকল্প। প্রায় দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে নানা প্রশাসনিক ও পরিকাঠামোগত জটে আটকে থাকা কলকাতা মেট্রোর প্রস্তাবিত পিঙ্ক লাইন প্রকল্পে এবার এল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। কলকাতা পুরসভা রেল বিকাশ নিগমকে প্রয়োজনীয় অনাপত্তি শংসাপত্র দিয়েছে। এর ফলে বিটি রোড বরাবর বরানগর থেকে বারাকপুর পর্যন্ত প্রায় ১২.৫ কিলোমিটার দীর্ঘ মেট্রো করিডরের নির্মাণ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে অন্যতম বড় বাধা দূর হল।

সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, এই ছাড়পত্রের খবরটি এসেছে এমন এক সময়ে, যখন রেল বিকাশ নিগম ইতিমধ্যেই এই করিডরে ১০টি উড়াল মেট্রো স্টেশন এবং প্রায় ১২.৩ কিলোমিটার ভায়াডাক্ট নির্মাণের জন্য প্রায় ১,৫৮৭.৩৯ কোটি টাকার দরপত্র আহ্বান করেছে। অর্থাৎ, বহু বছর ধরে কাগজে-কলমে আটকে থাকা প্রকল্পটি এবার বাস্তব নির্মাণপর্বের দিকে এগোতে শুরু করেছে।

কী ছিল এত দিনের প্রধান জট?

বরানগর-বারাকপুর মেট্রো প্রকল্পটি নতুন নয়। কেন্দ্রীয় রেল মন্ত্রকের নথি অনুযায়ী, বিটি রোড বরাবর এই মেট্রো করিডরের মূল সংযোগপথ নিয়ে ২০১১ সালে মেট্রো রেল, রেল বিকাশ নিগম এবং কলকাতা পুরসভার মধ্যে সমঝোতা হয়েছিল। কিন্তু বিটি রোডের নীচ দিয়ে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ জল সরবরাহ পরিকাঠামো প্রকল্পের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত সংসদে দেওয়া রেল মন্ত্রকের একাধিক উত্তরে স্পষ্ট বলা হয়েছিল, বরানগর থেকে বারাকপুর পর্যন্ত ১২.৫ কিলোমিটার অংশের কাজ মূলত পরিষেবা-পরিকাঠামো স্থানান্তর সংক্রান্ত জটের কারণে আটকে রয়েছে। রেল মন্ত্রকের নথিতে আরও বলা হয়, প্রয়োজনীয় অনাপত্তি শংসাপত্র তখনও মেলেনি।

এবার সেই দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ছাড়পত্র মেলায় প্রকল্পের প্রশাসনিক অচলাবস্থায় বড় পরিবর্তন এল।

পুরসভার ছাড়পত্রে কী বলা হয়েছে?

আপনার পাঠানো কলকাতা পুরসভার সরকারি নথি অনুযায়ী, রেল বিকাশ নিগমকে বিটি রোড বরাবর মেট্রো প্রকল্পের জন্য বিদ্যমান জল পরিবহণ পাইপলাইনের একটি অংশ বিচ্ছিন্ন ও বন্ধ করার বিষয়ে অনাপত্তি দেওয়া হয়েছে।

তবে এর সঙ্গে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শর্তও রয়েছে—বিদ্যমান জল সরবরাহ ব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে নতুন বৃহৎ ব্যাসের জল পরিবহণ পাইপলাইন নির্মাণ করতে হবে এবং তা কার্যকর করার পরই পুরনো ব্যবস্থার সংশ্লিষ্ট অংশ বিচ্ছিন্ন করা যাবে। অর্থাৎ, মেট্রোর কাজ এগোলেও কলকাতার পানীয় জল সরবরাহ যাতে ব্যাহত না হয়, সেই বিষয়টি নিশ্চিত করেই প্রকল্পের জন্য ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে।

এই সিদ্ধান্তকে তাই শুধু একটি মেট্রো প্রকল্পের অনুমোদন হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি আসলে নগর পরিকাঠামো ও গণপরিবহণের মধ্যে সমন্বয় ঘটানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদক্ষেপ।

,৫৮৭ কোটি টাকার দরপত্র: কী তৈরি হবে?

রেল বিকাশ নিগমের আহ্বান করা দরপত্র অনুযায়ী, বরানগর মেট্রো স্টেশনকে বাদ দিয়ে সেখান থেকে বারাকপুরের প্রস্তাবিত মঙ্গল পাণ্ডে মেট্রো স্টেশন পর্যন্ত অংশে ১০টি উড়াল স্টেশন এবং উড়ালপথ নির্মাণ করা হবে।

প্রকল্পটির আনুমানিক ব্যয় ধরা হয়েছে ১,৫৮৭.৩৯ কোটি টাকা। দরপত্রের শর্ত অনুযায়ী নির্বাচিত সংস্থাকে প্রায় ৪২ মাসের মধ্যে কাজ সম্পন্ন করার লক্ষ্য দেওয়া হয়েছে। দরপত্র জমা দেওয়ার নির্ধারিত শেষ তারিখ ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬।

তবে এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করে বলা জরুরি—দরপত্র ডাকা এবং পুরসভার অনাপত্তি শংসাপত্র পাওয়া মানেই আগামী কয়েক মাসের মধ্যে মেট্রো পরিষেবা চালু হয়ে যাবে না। প্রথমে দরপত্র প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে, তারপর ঠিকাদার নির্বাচন, প্রকৌশলগত প্রস্তুতি এবং পূর্ণমাত্রার নির্মাণকাজ শুরু হবে।

কোন কোন এলাকায় পৌঁছবে মেট্রো?

বর্তমান পরিকল্পনা অনুযায়ী বরানগর থেকে বারাকপুর পর্যন্ত এই করিডরে ১০টি নতুন স্টেশন নির্মাণের কথা রয়েছে। বিভিন্ন প্রকল্প নথি ও সাম্প্রতিক দরপত্র-সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী সম্ভাব্য স্টেশনগুলি হল—

  1. কৃষ্ণকলিকামারহাটি
  2. আচার্য প্রফুল্লচন্দ্রআগরপাড়া
  3. গান্ধী আশ্রমপানিহাটি
  4. শরৎচন্দ্রসোদপুর
  5. সুভাষনগরসুখচর
  6. ঋষি বঙ্কিমখড়দহ
  7. . রাজেন্দ্র প্রসাদটাটাগেট এলাকা
  8. শাহনওয়াজ খানটিটাগড়
  9. অনুকূল ঠাকুরতালপুকুর
  10. মঙ্গল পাণ্ডেবারাকপুর

এর সঙ্গে বিদ্যমান বরানগর মেট্রো স্টেশনের মাধ্যমে এই নতুন করিডর কলকাতার বর্তমান মেট্রো নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হবে।

উত্তর শহরতলির যাতায়াতে কতটা পরিবর্তন আসতে পারে?

বরানগর-বারাকপুর করিডরটি চালু হলে সবচেয়ে বেশি সুবিধা পাবেন বিটি রোড সংলগ্ন ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার মানুষ। বর্তমানে কামারহাটি, আগরপাড়া, সোদপুর, পানিহাটি, খড়দহ, টিটাগড় ও বারাকপুর থেকে কলকাতামুখী যাত্রার ক্ষেত্রে সড়কপথ ও উপনগরীয় রেলের উপর বিপুল চাপ রয়েছে।

মেট্রো চালু হলে—

  • বিটি রোডের উপর যানবাহনের চাপ কমার সম্ভাবনা তৈরি হবে।
  • উত্তর শহরতলি থেকে কলকাতার বিভিন্ন অংশে দ্রুত যোগাযোগ সম্ভব হবে।
  • বাস, অটো ও ব্যক্তিগত গাড়িনির্ভর যাত্রার বিকল্প তৈরি হবে।
  • বারাকপুর শিল্পাঞ্চল ও আশপাশের আবাসিক এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থা শক্তিশালী হতে পারে।
  • বরানগরে বিদ্যমান মেট্রো নেটওয়ার্কের সঙ্গে সংযোগের ফলে যাত্রীরা দক্ষিণ ও মধ্য কলকাতার দিকে তুলনামূলক দ্রুত পৌঁছতে পারবেন।

এই করিডরটি কার্যকর হলে উত্তর ২৪ পরগনার একটি বড় অংশের গণপরিবহণ ব্যবস্থার চিত্র বদলে যেতে পারে বলেই মনে করছেন পরিকাঠামো বিশেষজ্ঞরা।

প্রকল্পটি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

বরানগর-বারাকপুর মেট্রোকে শুধু একটি নতুন রেলপথ হিসেবে দেখলে এর গুরুত্ব পুরোপুরি বোঝা যাবে না। এটি এমন একটি অঞ্চলের জন্য পরিকল্পিত, যেখানে জনঘনত্ব অত্যন্ত বেশি এবং প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক মানুষ কলকাতার সঙ্গে যাতায়াত করেন।

বারাকপুর মহকুমা দীর্ঘদিন ধরে রেল ও সড়ক—এই দুই প্রধান পরিবহণ ব্যবস্থার উপর নির্ভরশীল। নতুন মেট্রো করিডর সেই ব্যবস্থায় তৃতীয় একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন গণপরিবহণের স্তর যোগ করতে পারে।

বিশেষ করে বরানগরে মেট্রো নেটওয়ার্কের সঙ্গে সংযোগ থাকায় ভবিষ্যতে এই করিডরটি ত্তর শহরতলি থেকে কলকাতার কেন্দ্রভাগে দ্রুত যাতায়াতের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার হয়ে উঠতে পারে।

কবে শুরু হতে পারে পরিষেবা?

এই মুহূর্তে সবচেয়ে সৎ উত্তর হল—পরিষেবা চালুর নির্দিষ্ট সরকারি তারিখ এখনও ঘোষণা হয়নি।

বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রকল্পটি তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ অতিক্রম করেছে বা করছে—

  • দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক জট কাটিয়ে প্রয়োজনীয় পুরসভার অনাপত্তি পাওয়া গিয়েছে।
  • ১০টি উড়াল স্টেশন ও ভায়াডাক্ট নির্মাণের জন্য ১,৫৮৭.৩৯ কোটি টাকার দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে।
  • দরপত্র প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর নির্মাণকারী সংস্থা নির্বাচিত হলে পূর্ণমাত্রার কাজ শুরু হওয়ার পথ খুলবে।

দরপত্র-সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী নির্মাণের লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ৪২ মাস। কিন্তু বাস্তব প্রকল্পের ক্ষেত্রে জমি, যানবাহন নিয়ন্ত্রণ, ভূগর্ভস্থ পরিষেবা, পাইপলাইন স্থানান্তর এবং অন্যান্য প্রকৌশলগত জটিলতার কারণে সময়সূচিতে পরিবর্তন ঘটতে পারে। তাই এখনই কোনও নির্দিষ্ট উদ্বোধনের বছর ঘোষণা করা সমীচীন নয়।

নতুন বাস্তবতায়পিঙ্ক লাইন’-এর ভবিষ্যৎ

দীর্ঘ প্রায় ১৬ বছর ধরে নানা কারণে পিছিয়ে থাকা বরানগর-বারাকপুর মেট্রো প্রকল্পের ক্ষেত্রে ২০২৬ সালের জুলাই-আগস্ট মাস দুটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল। জুলাইয়ের শেষ দিকে বড় অঙ্কের নির্মাণ দরপত্র আহ্বান এবং ২৪ আগস্ট কলকাতা পুরসভার অনাপত্তি শংসাপত্র—এই দুই ঘটনাকে একসঙ্গে দেখলে স্পষ্ট, প্রকল্পটি এখন আর শুধু পুরনো ঘোষণা বা ভবিষ্যতের পরিকল্পনার স্তরে নেই।

এখন নজর থাকবে—

দরপত্র প্রক্রিয়া কবে সম্পন্ন হয়, কোন সংস্থা নির্মাণের দায়িত্ব পায় এবং বাস্তবে কবে বিটি রোডে মেট্রো নির্মাণের কাজ শুরু হয়।

বরানগর থেকে বারাকপুর—এই ১২.৫ কিলোমিটার পথের মেট্রো প্রকল্প বহু বছর ধরে উত্তর শহরতলির মানুষের কাছে ছিল এক অসমাপ্ত স্বপ্ন। কলকাতা পুরসভার সাম্প্রতিক ছাড়পত্র সেই স্বপ্নকে বাস্তবের অনেকটা কাছাকাছি নিয়ে এল।

তবে শেষ কথা একটাই—ছাড়পত্র মিলেছে, দরপত্রও ডাকা হয়েছে; এবার আসল পরীক্ষা মাঠে নেমে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্মাণকাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।

Published on: আগ ২৫, ২০২৬ at ২১:১৬


শেয়ার করুন