
“যাঁরা তাঁকে কাছ থেকে চিনতেন, তাঁদের অনেকেই বলতেন—’কিশোর কুমারকে বোঝা যায় না।‘ আবার কেউ বলতেন—’তাঁকে বোঝার চেষ্টা করাও ভুল।‘ কারণ তিনি ছিলেন এমন এক মানুষ, যার জীবন যেন একসঙ্গে কমেডি, ট্র্যাজেডি, রূপকথা আর রহস্যের মিশেল। পর্দায় যিনি সবাইকে হাসিয়েছেন, বাস্তব জীবনে তিনিই কখনও কখনও নিজের নিঃসঙ্গতার সঙ্গে নীরবে লড়েছেন।“
Published on: আগ ১৯, ২০২৬ at ১২:৫৫
✍️কলমে:অনিরুদ্ধ পাল
সংবাদ প্রভাকর টাইমস
এসপিটি প্রতিবেদন: ভারতীয় সঙ্গীতের ইতিহাসে কিশোর কুমারকে ঘিরে যত কিংবদন্তি রয়েছে, সম্ভবত অন্য কোনও শিল্পীকে ঘিরে তত গল্প তৈরি হয়নি।
কেউ তাঁকে বলতেন ‘পাগল’।
কেউ বলতেন ‘খেয়ালি’।
কেউ বলতেন ‘অসাধারণ প্রতিভা’।
আসলে তিনটিই সত্যি ছিল। কারণ কিশোর কুমার ছিলেন এমন একজন মানুষ, যিনি কোনও নিয়মে নিজেকে বেঁধে রাখতে পারেননি। তিনি নিজের মতো বাঁচতেন। আর সেই ‘নিজের মতো’ বাঁচার মূল্যও তাঁকে কম দিতে হয়নি।
আভাষ কখনও হারিয়ে যাননি
বিশ্ব তাঁকে চিনেছিল ‘কিশোর কুমার’ নামে। কিন্তু তাঁর ভেতরে সারাজীবন বেঁচে ছিলেন ছোট্ট আভাষ কুমার গাঙ্গুলী। খণ্ডওয়ার সেই ছেলেটি, যে গাছের সঙ্গে কথা বলত, নিজের মনে গান গাইত, অকারণে হাসত, আবার হঠাৎ গভীর চুপ হয়ে যেত।
খ্যাতি তাঁকে বদলাতে পারেনি। বরং যত বড় হয়েছেন, তত বেশি নিজের শৈশবকে আঁকড়ে ধরেছেন।
বন্ধুরা বলতেন, কিশোরদার মধ্যে একটা শিশুসুলভ সরলতা ছিল। কিন্তু সেই সরলতার আড়ালেই লুকিয়ে ছিল এক গভীর সংবেদনশীল মানুষ।
চারটি বিয়ে—চারটি ভিন্ন গল্প
কিশোর কুমারের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে যত আলোচনা হয়েছে, তার বড় অংশ জুড়ে রয়েছে তাঁর চারটি বিয়ে।
প্রথম স্ত্রী রুমা গুহ ঠাকুরতা। বাংলার অত্যন্ত প্রতিভাবান শিল্পী। তাঁদের সংসারে জন্ম নেয় পুত্র অমিত কুমার। কিন্তু শিল্পীজীবনের ব্যস্ততা, ব্যক্তিত্বের পার্থক্য এবং সম্পর্কের জটিলতায় সেই সংসার বেশিদিন টেকেনি।
এরপর আসে তাঁর জীবনের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায়।
মধুবালা—এক অসমাপ্ত প্রেমের ইতিহাস
বলিউডের ইতিহাসে যদি সবচেয়ে করুণ প্রেমের গল্পগুলোর তালিকা তৈরি হয়, সেখানে কিশোর কুমার ও মধুবালা-র নাম অবশ্যই থাকবে। অসামান্য সুন্দরী, অসাধারণ অভিনেত্রী মধুবালা তখন কঠিন হৃদরোগে আক্রান্ত।
অনেকেই দূরে সরে গিয়েছিলেন। কিন্তু কিশোর সরে যাননি। তিনি তাঁকে বিয়ে করেছিলেন, যখন জানতেন এই সম্পর্ক সুখের নিশ্চয়তা নয়, বরং দুঃখের দীর্ঘ পথও হতে পারে। মধুবালার চিকিৎসার জন্য তিনি বিদেশেও গিয়েছেন। সময় দিয়েছেন। সঙ্গ দিয়েছেন। তবু ভাগ্য বড় নিষ্ঠুর।
মধুবালা খুব অল্প বয়সেই চলে গেলেন। এই মৃত্যু কিশোর কুমারকে ভিতর থেকে ভেঙে দিয়েছিল। তিনি খুব কমই এই প্রসঙ্গে কথা বলতেন। কিন্তু তাঁর কাছের মানুষরা জানিয়েছেন, সেই শূন্যতা তিনি কোনওদিন পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেননি।
এরপরও থামেনি জীবন
পরে তিনি অভিনেত্রী যোগিতা বালিকে বিয়ে করেন। কিন্তু সেই সম্পর্কও দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। অবশেষে তাঁর জীবনে আসেন লীনা চন্দাভারকর। এই সম্পর্কেই তিনি জীবনের শেষ অধ্যায়ে কিছুটা স্থিরতা খুঁজে পান। তাঁদের সংসারে জন্ম নেয় পুত্র সুমিত কুমার। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত লীনা তাঁর পাশে ছিলেন।
‘আগে টাকা, তারপর কাজ‘—এর পেছনের সত্যি
কিশোর কুমার সম্পর্কে একটি গল্প আজও খুব জনপ্রিয়। তিনি নাকি টাকা না পেলে রেকর্ডিং করতেন না। অনেকে একে অহংকার বলে মনে করতেন। কিন্তু এর পেছনে ছিল তিক্ত অভিজ্ঞতা। ক্যারিয়ারের শুরুতে বহু প্রযোজক ও প্রযোজনা সংস্থা তাঁর পারিশ্রমিক সময়মতো দেননি। কেউ প্রতিশ্রুতি ভেঙেছেন, কেউ টাকা আটকে রেখেছেন। এই অভিজ্ঞতার পর তিনি নিজের জন্য একটি নিয়ম তৈরি করেছিলেন—
“আগে পারিশ্রমিক, তারপর কাজ।“
এটি কৃপণতা ছিল না। এটি ছিল আত্মসম্মান। শিল্পীর শ্রমের মূল্য যে দিতে হবে, সেই বার্তাই তিনি নিজের জীবন দিয়ে শিখিয়েছিলেন।
দরজার বাইরে সেই বিখ্যাত লেখা
কিশোর কুমারের বাড়ির বাইরে নাকি একটি সতর্কবার্তা ঝুলত।
“Beware of Kishore Kumar.”
অর্থাৎ— “কিশোর কুমার থেকে সাবধান!”
অনেকে এটিকে নিছক কৌতুক মনে করতেন। আবার অনেকেই জানতেন, এটি তাঁর ব্যক্তিত্বের প্রতীক। তিনি কাউকে সহজে বিশ্বাস করতেন না। যারা শুধু স্বার্থ নিয়ে আসত, তাঁদের থেকে নিজেকে দূরে রাখতেই হয়তো এই অদ্ভুত রসবোধের আশ্রয় নিয়েছিলেন।
গাছ ছিল তাঁর বন্ধু
কিশোর কুমারের সম্পর্কে আর একটি জনপ্রিয় কথা প্রচলিত ছিল— তিনি নাকি নিজের বাগানের গাছগুলোর নাম রেখেছিলেন। শুধু নামই নয়, তাঁদের সঙ্গে কথা বলতেন।
প্রথম শুনলে গল্প মনে হয়। কিন্তু তাঁর পরিচিতরা বলেছেন, প্রকৃতির সঙ্গে তাঁর এক গভীর সম্পর্ক ছিল। হয়তো মানুষের চেয়ে গাছকে তিনি বেশি নির্ভরযোগ্য মনে করতেন।
হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকা নিঃসঙ্গতা
পর্দায় যিনি মানুষকে হাসাতেন, ব্যক্তিগত জীবনে তিনি সবসময় হাসিখুশি ছিলেন না। খ্যাতি তাঁকে হাজারো মানুষের কাছে নিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু খুব কাছের মানুষ ছিলেন হাতে গোনা। তিনি সহজে নিজের দুঃখ প্রকাশ করতেন না। অনেক সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা একা বসে থাকতেন। আবার হঠাৎ হারমোনিয়াম নিয়ে গান শুরু করতেন। হয়তো সেই গানই ছিল তাঁর আত্মকথন।
‘পাগল‘—নাকি স্বাধীন মানুষ?
কিশোর কুমারকে নিয়ে যত গল্প প্রচলিত, তার অনেকগুলিই অতিরঞ্জিত। তাঁর খামখেয়ালিপনা নিয়ে অসংখ্য কাহিনি আজও ঘুরে বেড়ায়। কখনও বলা হয়, তিনি নাকি অদ্ভুত পোশাক পরে অতিথিদের সামনে আসতেন। কখনও বলা হয়, অপ্রত্যাশিত আচরণ করে সবাইকে অবাক করে দিতেন। এই গল্পগুলোর কিছু সত্য, কিছু অতিরঞ্জিত, কিছু নিছক কিংবদন্তি।
তবে একটি বিষয় নিশ্চিত—
তিনি প্রচলিত নিয়মের মানুষ ছিলেন না। তিনি নিজের স্বাধীনতাকে সবচেয়ে বেশি মূল্য দিতেন। সমাজ যেটাকে ‘অস্বাভাবিক’ বলত, তিনি সেটাকেই নিজের স্বাভাবিক জীবন বলে মেনে নিয়েছিলেন।
চার সংখ্যার অদ্ভুত মিল
কিশোর কুমারের জীবন নিয়ে আরেকটি কৌতূহলজনক বিষয় প্রায়ই আলোচনায় আসে।
- জন্ম ৪ আগস্ট ১৯২৯।
- জন্মেছিলেন পরিবারের চতুর্থ সন্তান হিসেবে।
- জীবনে করেছেন চারটি বিয়ে।
- বাংলা ভাষায় অভিনয় করেছেন চারটি চলচ্চিত্রে।
এগুলো নিছক কাকতালীয়। তবু তাঁর জীবনকে ঘিরে এই সংখ্যার পুনরাবৃত্তি আজও ভক্তদের বিস্মিত করে।
শেষ পর্যন্ত তিনি ছিলেন এক রহস্য
কিশোর কুমারকে শুধু গায়ক বললে ভুল হবে। শুধু অভিনেতা বললেও ভুল হবে। তিনি ছিলেন এক চলমান বিস্ময়। একদিকে অনিয়ন্ত্রিত হাসি। অন্যদিকে গভীর বিষণ্নতা। একদিকে হাজারো মানুষের প্রিয় শিল্পী।
অন্যদিকে নিঃসঙ্গ এক মানুষ, যিনি কখনও কখনও নিজের সঙ্গেই সবচেয়ে বেশি কথা বলতেন। সম্ভবত এই কারণেই তাঁকে আজও পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা যায় না। কারণ কিছু মানুষকে জীবনী দিয়ে নয়— অনুভব দিয়ে চিনতে হয়।
কিশোর কুমার ছিলেন তেমনই একজন। তাঁকে যত পড়া যায়, ততই নতুন মনে হয়। তাঁকে যত শোনা যায়, ততই মনে হয়—
এই মানুষটির ভেতরে এখনও কত অজানা গল্প লুকিয়ে আছে।
পরবর্তী খণ্ড–৯
“শেষ গান, শেষ ইচ্ছে, শেষ বিদায়: যে দিন থেমে গিয়েছিল ভারতীয় সঙ্গীতের এক অমর কণ্ঠ“
এই পর্বে থাকবে তাঁর জীবনের শেষ অধ্যায়—খণ্ডওয়ায় ফিরে যাওয়ার স্বপ্ন, শেষ রেকর্ডিং, শেষ দিন, ১৩ অক্টোবর ১৯৮৭-এর সেই শোকাবহ দুপুর, এবং কেন তাঁর প্রয়াণকে ভারতীয় সঙ্গীতের ইতিহাসে এক অপূরণীয় ক্ষতি হিসেবে দেখা হয়।
Photo: AI Generate




