নেসেটে মোদির বার্তা: সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ঐক্য, শান্তির পক্ষে ভারত–ইজরায়েল

Main দেশ বিদেশ ভ্রমণ
শেয়ার করুন

Published on: ফেব্রু ২৬, ২০২৬ at ০০:৩৬

এসপিটি ডিজিটাল ডেস্ক : ইজরায়েলের সংসদ নেসেটে ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি-র প্রায় আধঘণ্টার ভাষণ আন্তর্জাতিক কূটনীতির পরিসরে এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবে চিহ্নিত হয়ে রইল। এই ভাষণে তিনি শুধু দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বর্তমান চিত্রই তুলে ধরেননি, বরং ইতিহাস, সভ্যতা, মানবিকতা, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ সহযোগিতার এক বিস্তৃত রূপরেখা উপস্থাপন করেছেন।

নেসেটের স্পিকার, প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু, বিরোধীদলীয় নেতা এবং সংসদ সদস্যদের অভিবাদন জানিয়ে ভাষণের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী বলেন, একটি প্রাচীন সভ্যতার প্রতিনিধি হিসেবে এই ঐতিহাসিক সভায় দাঁড়ানো তাঁর কাছে গর্ব ও সম্মানের বিষয়। তিনি জানান, ১.৪ বিলিয়ন ভারতীয়র শুভেচ্ছা, বন্ধুত্ব ও অংশীদারিত্বের বার্তা নিয়ে তিনি ইজরায়েলে এসেছেন।

তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, নেসেটের এক স্পিকারের ভারত সফরের পর তিনিই প্রথম ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী যিনি এই সভায় ভাষণ দিচ্ছেন। একইসঙ্গে উল্লেখ করেন, ১৯৫০ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর—যেদিন ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে ইজরায়েলকে স্বীকৃতি দেয়—সেদিনই তাঁর জন্ম, যা তাঁর কাছে এই সম্পর্ককে ব্যক্তিগত মাত্রা দেয়।

সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে একক কণ্ঠ

ভাষণের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ জুড়ে ছিল সন্ত্রাসবাদ বিরোধী অবস্থান। ৭ অক্টোবর হামাসের হামলায় নিহতদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভারত ইজরায়েলের যন্ত্রণাকে অনুভব করে এবং এই সংকটময় সময়ে দৃঢ়ভাবে পাশে রয়েছে।
তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, কোনও কারণই নিরীহ নাগরিক হত্যার ন্যায্যতা দিতে পারে না এবং সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে কোনও দ্বৈত মানদণ্ড চলতে পারে না।

২৬/১১ মুম্বাই হামলার প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, ভারতও দীর্ঘদিন ধরে সন্ত্রাসবাদের যন্ত্রণা বহন করছে। তাই সন্ত্রাস মোকাবিলায় টেকসই ও সমন্বিত আন্তর্জাতিক উদ্যোগ জরুরি।

শান্তি, আব্রাহাম চুক্তি ও মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ

মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী আব্রাহাম চুক্তিকে ঐতিহাসিক সাহসী পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেন। যদিও পরিস্থিতি এখন আরও জটিল, তবুও শান্তির আশা ধরে রাখার আহ্বান জানান তিনি। রাষ্ট্রসংঘ অনুমোদিত গাজা শান্তি উদ্যোগকে তিনি ন্যায্য ও টেকসই সমাধানের পথ হিসেবে দেখান, যা ফিলিস্তিন সমস্যার সমাধানেও সহায়ক হতে পারে বলে মত প্রকাশ করেন।

হাজার বছরের আত্মীয়তা ও ইহুদি সম্প্রদায়ের ভারতবাস

ভাষণের দীর্ঘ অংশ জুড়ে উঠে আসে ভারত–ইজরায়েলের প্রাচীন ঐতিহাসিক সম্পর্ক। ইষ্টেরের পুস্তকে ভারতের উল্লেখ, তালমুদে প্রাচীন বাণিজ্য পথের কথা, এবং ইহুদি বণিকদের ভারতে আগমন—সবকিছু তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভারতে ইহুদি সম্প্রদায় কখনও নিপীড়ন বা বৈষম্যের শিকার হয়নি।

মহারাষ্ট্রের বেনে ইসরায়েল, কেরালার কোচিনি ইহুদি, কলকাতা ও মুম্বাইয়ের বাগদাদী ইহুদি এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের বেনে মেনাশে সম্প্রদায় ভারতের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

ডেভিড সাসুন, জে এফ আর জ্যাকব, ডেভিড আব্রাহাম চৌধুরী, ওয়াল্টার কাউফম্যানসহ বহু বিশিষ্ট ইহুদি ব্যক্তিত্বের অবদানের কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন- তারা ল্যাবরেটরি এবং হাসপাতালে আধুনিক ইজরায়েল নির্মাণে অবদান রাখছে। শ্রেণীকক্ষে এবং যুদ্ধক্ষেত্রেও। তারা দৃঢ়ভাবে ধরে রাখে যে ইজরায়েল তাদের পিতৃভূমি এবং ভারত তাদের মাতৃভূমি।

রক্তের বন্ধন ও যুদ্ধের ইতিহাস

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে এই অঞ্চলে শহিদ হওয়া ৪ হাজারেরও বেশি ভারতীয় সৈন্যের আত্মত্যাগ স্মরণ করেন প্রধানমন্ত্রী। ১৯১৮ সালের হাইফা অভিযানে মেজর দলপত সিং-এর বীরত্বকে তিনি ভারত–ইজরায়েল ভাগ করা ইতিহাসের প্রতীক হিসেবে বর্ণনা করেন।

হলোকস্ট স্মরণ দিবসের প্রসঙ্গ টেনে তিনি গুজরাটের নবনগরের জাম সাহেবের মানবিক ভূমিকার কথা স্মরণ করেন, যিনি ইহুদি শিশুদের আশ্রয় দিয়েছিলেন।

অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও ভবিষ্যতের অংশীদারিত্ব

ভবিষ্যৎ সহযোগিতা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী জানান, ভারত শীঘ্রই বিশ্বের শীর্ষ তিন অর্থনীতির একটি হতে চলেছে এবং ইজরায়েল প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের শক্তিধর কেন্দ্র। এই দুই শক্তির সংমিশ্রণ স্বাভাবিক অংশীদারিত্ব গড়ে তুলছে।

স্টার্ট-আপ, প্রতিরক্ষা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কোয়ান্টাম প্রযুক্তি, সেমিকন্ডাক্টর, কৃষি ও জল ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতা আরও বাড়ানোর বার্তা দেন তিনি। ভারতে ইজরায়েলের সহায়তায় গড়ে ওঠা কৃষি উৎকর্ষ কেন্দ্রগুলির সাফল্যের কথাও তুলে ধরেন।

সভ্যতাগত দর্শনের মিল

ভাষণের শেষে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ইজরায়েলের ‘টিক্কুন ওলাম’ ও ভারতের ‘বসুধৈব কুটুম্বকম’—দুটিই মানবতার বৃহত্তর কল্যাণের দর্শন বহন করে। এই নৈতিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই ভারত ও ইজরায়েল শান্তি, স্থিতিশীলতা ও মানবিকতার পথে একসঙ্গে এগিয়ে যাবে।

এই ভাষণকে কূটনৈতিক মহল দেখছে ভারত–ইজরায়েল সম্পর্কের এক পরিপূর্ণ, গভীর ও ভবিষ্যতমুখী ঘোষণাপত্র হিসেবে—যেখানে ইতিহাস, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ এক সুতোয় বাঁধা।

Published on: ফেব্রু ২৬, ২০২৬ at ০০:৩৬


শেয়ার করুন