পর্ব ৯ — মনুস্মৃতিতে ‘এষ ধর্মঃ সনাতনঃ’

Main দেশ ধর্ম ভ্রমণ রাজ্য
শেয়ার করুন

মনুস্মৃতি ৪.১৩৮–এর বিখ্যাত শ্লোক: ‘এষ ধর্মঃ সনাতনঃ’—এর প্রকৃত প্রসঙ্গ কী? এটি কি সমগ্র হিন্দু ধর্মের নাম, নাকি একটি নির্দিষ্ট নৈতিক বিধানের ক্ষেত্রে ‘এটাই চিরন্তন ধর্ম’?
✍️ লিখছেন অনিরুদ্ধ পাল। সংবাদ প্রভাকর টাইমস

এসপিটি বিশেষ প্রতিবেদন: ‘সনাতন ধর্ম’—এই শব্দবন্ধ আজ একটি পরিচিত ধর্মীয় পরিচয়। কিন্তু আমরা এই ধারাবাহিকে যে প্রশ্নটি নিয়ে এগোচ্ছি, তা হল—প্রাচীন গ্রন্থে ‘সনাতন ধর্ম’ কথাটি যখন পাওয়া যায়, তখন কি সেটি সত্যিই একটি নির্দিষ্ট ধর্মের নাম ছিল?

আগের পর্বে আমরা দেখেছি, মহাভারতের বিভিন্ন জায়গায় ‘এষ ধর্মঃ সনাতনঃ’ বলা হয়েছে। কিন্তু সেখানে অনেক ক্ষেত্রেই কোনও নির্দিষ্ট ধর্মের নাম বোঝানো হয়নি; বরং কোনও একটি কর্তব্য, নৈতিক বিধান বা আচরণকে চিরন্তন বলে চিহ্নিত করা হয়েছে।

এবার সেই একই প্রশ্ন নিয়ে আমরা পৌঁছব মনুস্মৃতির চতুর্থ অধ্যায়ের ১৩৮ নম্বর শ্লোকে।

শ্লোকটি অত্যন্ত পরিচিত। কিন্তু তার প্রকৃত অর্থ বুঝতে হলে শুধু শেষের তিনটি শব্দ—‘এষ ধর্মঃ সনাতনঃ’—দেখলে হবে না। দেখতে হবে পুরো শ্লোকে আসলে কী বলা হয়েছে।

মনুস্মৃতি ৪.১৩৮–এর মূল শ্লোক

শ্লোকটি হল—

সত্যং ব্রূয়াত্ প্রিয়ং ব্রূয়ান্ন ব্রূয়াত্ সত্যমপ্রিয়ম্।
প্রিয়ং চ নানৃতং ব্রূয়াদেষ ধর্মঃ সনাতনঃ॥

সহজ বাংলায় এর অর্থ— “সত্য কথা বলবে, প্রিয় বা মধুর কথা বলবে; কিন্তু এমন সত্য কথা বলবে না যা অপ্রিয়। আবার প্রিয় বা মধুর হলেও মিথ্যা কথা বলবে না। এটাই চিরন্তন ধর্ম।”

এখানে শেষ কথাটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ— “এষ ধর্মঃ সনাতনঃ।” অর্থাৎ— “এটাই চিরন্তন ধর্ম।” এখন প্রশ্ন হল—এখানে ‘এটাই’ বলতে কী বোঝানো হচ্ছে? উত্তরটি আসলে শ্লোকের মধ্যেই রয়েছে।

‘এটাই’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে?

শ্লোকটির প্রথম অংশে চারটি কথা বলা হয়েছে।

প্রথমত— সত্য কথা বলতে হবে।

দ্বিতীয়ত— প্রিয় বা মধুর কথা বলতে হবে।

তৃতীয়ত— অপ্রিয় সত্য কথা বলা থেকে বিরত থাকতে হবে।

চতুর্থত— মধুর হলেও মিথ্যা কথা বলা যাবে না।

এর পরেই বলা হয়েছে— “এষ ধর্মঃ সনাতনঃ।” অর্থাৎ এই চারটি কথার সমন্বয়ে যে আচরণবিধি তৈরি হয়েছে, সেটিকেই বলা হচ্ছে— “এটাই চিরন্তন ধর্ম।” এখানে ‘এষ’ বা ‘এই’ শব্দটি আগের কথাগুলির দিকে নির্দেশ করছে। অর্থাৎ এটি কোনও অজানা বা আলাদা ধর্মের নাম ঘোষণা করছে না; বরং ঠিক তার আগেই যে নৈতিক বিধান বলা হয়েছে, তাকেই চিরন্তন ধর্ম বলা হচ্ছে।

এখানে ‘ধর্ম’ বলতে কী বোঝানো হচ্ছে?

এখানেই আমাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভাষাগত প্রশ্ন। আজ আমরা ‘ধর্ম’ শব্দটি শুনলে অনেক সময় একটি নির্দিষ্ট ধর্মসম্প্রদায় বা ধর্মবিশ্বাসের কথা ভাবি।

কিন্তু সংস্কৃত ‘ধর্ম’ শব্দের অর্থ অনেক বিস্তৃত। ধর্ম বলতে বোঝাতে পারে— কর্তব্য, নীতি, আচরণ, বিধান, ন্যায়, দায়িত্ব, পালনীয় নিয়ম অথবা নৈতিক পথ। মনুস্মৃতির এই শ্লোকের ক্ষেত্রে ‘ধর্ম’ বলতে একটি নৈতিক আচরণবিধান বোঝানো হয়েছে। কারণ পুরো শ্লোকটির বিষয়ই হল—মানুষ কীভাবে কথা বলবে। কী বলা উচিত? কী বলা উচিত নয়? সত্য হলেও কোন কথা বলা থেকে বিরত থাকা উচিত? আবার মধুর হলেও কোন কথা মিথ্যা বলে বলা উচিত নয়? এই প্রশ্নগুলির উত্তরই শ্লোকটি দিচ্ছে।

‘সনাতন’ শব্দটি এখানে কী বোঝাচ্ছে?

‘সনাতন’ শব্দের অর্থ— চিরন্তন, চিরস্থায়ী, প্রাচীনকাল থেকে চলে আসা, অবিচ্ছিন্ন বা স্থায়ী।

অতএব— ধর্মঃ সনাতনঃ

বললে তার অর্থ হতে পারে— “ধর্মটি চিরন্তন।” অথবা প্রসঙ্গ অনুযায়ী— “এই নীতিটি চিরকাল পালনীয়।”

সুতরাং ‘সনাতন’ এখানে ‘ধর্ম’-এর একটি গুণ বোঝাচ্ছে। অর্থাৎ— চিরন্তন ধর্ম। এটিকে সরাসরি একটি ধর্মের নাম হিসেবে পড়লে বাক্যটির প্রকৃত ব্যাকরণগত অর্থও আড়াল হয়ে যায়।

এই শ্লোকটি কি সমগ্র হিন্দু ধর্মের নাম ঘোষণা করছে?

মনুস্মৃতি ৪.১৩৮-এর নিজের প্রসঙ্গ বিচার করলে তার উত্তর হবে— না, এই শ্লোকটি সমগ্র হিন্দু ধর্মের নাম ঘোষণা করছে না।

কারণ শ্লোকটির বিষয়বস্তু অত্যন্ত নির্দিষ্ট। এখানে আলোচনা হচ্ছে— সত্য কথা বলা, প্রিয় কথা বলা, অপ্রিয় সত্য না বলা এবং মিথ্যা প্রিয় কথা না বলা। এই নির্দিষ্ট নৈতিক বিধানের পর বলা হচ্ছে— “এষ ধর্মঃ সনাতনঃ।” অর্থাৎ— “এটাই চিরন্তন ধর্ম।” এখানে ‘ধর্ম’ একটি নৈতিক বিধান। একটি সমগ্র ধর্মসম্প্রদায়ের নাম নয়।

একটি ছোট শব্দই অনেক কিছু বুঝিয়ে দেয়—‘এষ’

এই শ্লোকের ‘এষ’ শব্দটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। ‘এষ’ অর্থ— “এই।”

কোন ‘এই’?

আগের বাক্যগুলিতে যে আচরণবিধান বলা হয়েছে, সেই ‘এই’। অর্থাৎ— সত্য বলো। প্রিয় কথা বলো। অপ্রিয় সত্য বলো না। প্রিয় হলেও মিথ্যা বলো না। এই নীতিই চিরন্তন ধর্ম।

সুতরাং ‘এষ ধর্মঃ সনাতনঃ’-কে বিচ্ছিন্ন করে শুধু ‘সনাতন ধর্ম’ হিসেবে দেখলে শ্লোকটির সম্পূর্ণ বক্তব্য থেকে আমরা দূরে সরে যেতে পারি।

একটি সূক্ষ্ম প্রশ্ন—‘অপ্রিয় সত্য’ না বলার কথা কেন?

শ্লোকটির এই অংশটি আজকের পাঠকের কাছে কিছুটা কঠিন মনে হতে পারে। কারণ এখানে বলা হয়েছে— “ন ব্রূয়াত্ সত্যমপ্রিয়ম্”

অর্থাৎ অপ্রিয় সত্য কথা বলা উচিত নয়। কিন্তু তার পরেই বলা হয়েছে— “প্রিয়ং চ নানৃতং ব্রূয়াত্”

অর্থাৎ প্রিয় বা মধুর হলেও মিথ্যা কথা বলা উচিত নয়। দুটি কথাকে পাশাপাশি রাখলে বোঝা যায়, শ্লোকটি শুধু ‘সত্য বলো’ বলছে না। এখানে সত্য বলার সঙ্গে কথার ধরন এবং তার সামাজিক প্রভাবের কথাও বিবেচনা করা হচ্ছে।

একদিকে মিথ্যা বলা যাবে না। অন্যদিকে সত্য বলার নাম করে এমন অপ্রিয় কথা বলা থেকেও বিরত থাকতে বলা হচ্ছে, যা অন্যকে অকারণে আঘাত করতে পারে। অর্থাৎ এখানে সত্য, মাধুর্য এবং সংযম—এই তিনটির মধ্যে একটি ভারসাম্য তৈরি করার চেষ্টা রয়েছে।

শ্লোকটির পরের অংশটিও গুরুত্বপূর্ণ

মনুস্মৃতির ৪.১৩৮-এর পরের শ্লোকটি ৪.১৩৯।

সেখানে বলা হয়েছে—

ভদ্রং ভদ্রমিতি ব্রূয়াদ্ ভদ্রমিত্যেব বা বদেত্।
শুষ্কবৈরং বিবাদং চ ন কুর্যাত্ কেনচিৎ সহ॥

এর ভাবার্থ— শুভকে শুভ বলতে হবে; অকারণ শত্রুতা বা বিবাদে জড়ানো উচিত নয়।

অর্থাৎ ৪.১৩৮-এর বক্তব্য কোনও বিচ্ছিন্ন ধর্মতাত্ত্বিক ঘোষণা নয়। তার আশপাশের অংশেও ব্যক্তির আচরণ, কথাবার্তা এবং সামাজিক ব্যবহারের নিয়ম নিয়ে আলোচনা চলছে। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ। কারণ এতে বোঝা যায়, ৪.১৩৮-এর ‘এষ ধর্মঃ সনাতনঃ’ মূলত আচরণবিধানের প্রসঙ্গেই এসেছে।

মনুস্মৃতির ভাষ্যকার কী বলছেন?

এই শ্লোকের প্রাচীন ভাষ্যকার মেধাতিথিও শ্লোকটির ব্যাখ্যায় মূলত কথাবলার নিয়ম নিয়েই আলোচনা করেছেন। তিনি সত্য কথা এবং প্রিয় কথার মধ্যে পার্থক্য করেছেন এবং দেখিয়েছেন যে সত্য হলেও কোনও কথা অপ্রিয় হতে পারে। তাঁর ব্যাখ্যার শেষে বলা হয়েছে—“এষ সনাতনো ধর্মঃ”—অর্থাৎ এটি চিরন্তন ধর্ম। মেধাতিথি আরও ব্যাখ্যা করেন যে বেদ চিরন্তন এবং বেদে বিধৃত ধর্মও সেই কারণে চিরন্তন বলে বিবেচিত।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য মনে রাখা দরকার। এটি মেধাতিথির ব্যাখ্যা। অর্থাৎ এটি মূল শ্লোকের পরবর্তী ব্যাখ্যা; শ্লোকটির নিজের বক্তব্যের সঙ্গে ভাষ্যকারের দার্শনিক ব্যাখ্যাকে এক করে দেখা ঠিক হবে না। মূল শ্লোকে সরাসরি যে বিষয়টি বলা হয়েছে, তা হল—কীভাবে কথা বলা উচিত।

তাহলে ‘সনাতন ধর্ম’ শব্দবন্ধটি কি প্রাচীন?

অবশ্যই। এই শ্লোক তারই একটি স্পষ্ট প্রমাণ। মনুস্মৃতির ৪.১৩৮-এ সরাসরি রয়েছে— “এষ ধর্মঃ সনাতনঃ।” অর্থাৎ ‘সনাতন ধর্ম’ শব্দবন্ধের প্রাচীন ব্যবহার নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই।

কিন্তু এখানে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। শব্দবন্ধের প্রাচীনতা এবং একটি নির্দিষ্ট ধর্মের নাম হিসেবে তার ব্যবহার—এই দুটি বিষয় এক নয়। মনুস্মৃতিতে শব্দবন্ধটি প্রাচীন। কিন্তু এই শ্লোকের প্রসঙ্গে এটি একটি নৈতিক আচরণবিধানকে চিরন্তন ধর্ম বলে চিহ্নিত করছে। এটিকে সমগ্র হিন্দু ধর্মের নাম হিসেবে ঘোষণা করছে না।

‘সনাতন ধর্ম’ কি তাহলে শুধু নৈতিকতার নাম?

এখানেও একটু সতর্ক হতে হবে। মনুস্মৃতির এই একটি শ্লোক থেকে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়াও ঠিক হবে না যে প্রাচীন ভারতে ‘সনাতন ধর্ম’ শব্দবন্ধটি কেবল নৈতিকতার ক্ষেত্রেই ব্যবহৃত হত।

বিভিন্ন প্রাচীন গ্রন্থে ‘সনাতন ধর্ম’ বিভিন্ন প্রসঙ্গে ব্যবহৃত হয়েছে। কখনও কর্তব্য বোঝাতে, কখনও নৈতিক বিধান বোঝাতে, কখনও সামাজিক আচরণ বোঝাতে, কখনও কোনও প্রাচীন ও চিরস্থায়ী নিয়ম বোঝাতে। তাই প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রসঙ্গ দেখে অর্থ নির্ধারণ করতে হবে। মনুস্মৃতি ৪.১৩৮-এর ক্ষেত্রে অবশ্য প্রসঙ্গটি বেশ পরিষ্কার— এখানে ‘সনাতন ধর্ম’ বলতে কথাবলার একটি চিরন্তন নৈতিক বিধান বোঝানো হয়েছে।

তাহলে ‘সনাতন ধর্ম’ এবং ‘হিন্দুধর্ম’—এদের সম্পর্ক কী?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই আমাদের ধারাবাহিকের মূল অনুসন্ধান আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

আজকের দিনে ‘সনাতন ধর্ম’ এবং ‘হিন্দুধর্ম’কে অনেক সময় একই অর্থে ব্যবহার করা হয়। কিন্তু প্রাচীন গ্রন্থে ব্যবহৃত ‘সনাতন ধর্ম’ শব্দবন্ধকে সরাসরি আজকের অর্থে একটি সম্পূর্ণ ধর্মের নাম ধরে নেওয়া ইতিহাসের দিক থেকে সতর্ক পদ্ধতি নয়। কারণ মনুস্মৃতির এই শ্লোকেই আমরা দেখতে পাচ্ছি— ‘সনাতন ধর্ম’ একটি নির্দিষ্ট নৈতিক বিধানের নামেও ব্যবহৃত হচ্ছে।

এখানে কোনও মন্দিরব্যবস্থা, উপাসনাপদ্ধতি, দেবতার তালিকা, ধর্মীয় সম্প্রদায় বা একটি সমগ্র ধর্মীয় পরিচয়ের সংজ্ঞা দেওয়া হচ্ছে না। শুধু বলা হচ্ছে— কীভাবে কথা বলা উচিত। আর সেই নীতিকে বলা হচ্ছে— “এষ ধর্মঃ সনাতনঃ।”

একটি গুরুত্বপূর্ণ ভাষাগত পার্থক্য

এই জায়গায় আমাদের ধারাবাহিকের একটি মূল শিক্ষা আবার সামনে আসে। ‘সনাতন ধর্ম’ শব্দবন্ধটি প্রাচীন। কিন্তু তার অর্থ সব যুগে একই ছিল—এমন নয়। একটি শব্দবন্ধের অর্থ বুঝতে হলে দেখতে হয়— কোন গ্রন্থে? কোন সময়ে? কোন প্রসঙ্গে?

কোন বক্তব্যের পরে?

মনুস্মৃতির ৪.১৩৮-এ উত্তরগুলি হল— গ্রন্থ — মনুস্মৃতি।অধ্যায় — চতুর্থ।প্রসঙ্গ — আচরণওকথাবলারবিধান।বিষয় — সত্য, প্রিয়কথা, অপ্রিয়সত্যএবংমিথ্যাকথা।উপসংহার — ‘এষধর্মঃসনাতনঃ’। অর্থাৎ— “এইনৈতিকবিধানইচিরন্তনধর্ম।”

তাহলে কি বলা যায়—‘মনুস্মৃতিতে সনাতন ধর্মের নাম আছে’?

এক অর্থে বলা যায়—‘সনাতন ধর্ম’ শব্দবন্ধটি মনুস্মৃতিতে আছে। কিন্তু যদি বলা হয়— “মনুস্মৃতিতে হিন্দু ধর্মের নাম হিসেবে ‘সনাতন ধর্ম’ ঘোষণা করা হয়েছে”

—তাহলে ৪.১৩৮ শ্লোকটি সেই দাবির প্রমাণ দেয় না। কারণ শ্লোকটির সরাসরি বিষয় একটি নির্দিষ্ট নৈতিক বিধান। এই পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শব্দ আছে—কিন্তু শব্দটির অর্থ কী, সেটিই আসল প্রশ্ন।

আমাদের অনুসন্ধানের একটি নতুন দিক

এখন পর্যন্ত আমরা তিনটি গুরুত্বপূর্ণ স্তর দেখতে পেলাম। প্রথমত, প্রাচীন সংস্কৃত সাহিত্যে ‘সনাতন’ শব্দটি প্রাচীন এবং এর অর্থ চিরন্তন বা চিরস্থায়ী।

দ্বিতীয়ত, ‘ধর্ম’ শব্দটি অত্যন্ত বিস্তৃত—কর্তব্য, নীতি, বিধান, আচরণ, ন্যায় ইত্যাদি তার অর্থের মধ্যে পড়ে।

তৃতীয়ত, ‘সনাতন ধর্ম’ শব্দবন্ধটি প্রাচীন হলেও মনুস্মৃতি ৪.১৩৮-এ তা একটি নির্দিষ্ট নৈতিক বিধানকে বোঝাচ্ছে। তাই এই শ্লোক থেকে একটি বিষয় যথেষ্ট স্পষ্ট— “এষ ধর্মঃ সনাতনঃ” মানেই “সনাতন ধর্ম” নামে একটি সম্পূর্ণ ধর্মের পরিচয়—এমন নয়। বরং এই শ্লোকে বলা হচ্ছে— “সত্য বলা, প্রিয় কথা বলা, অপ্রিয় সত্য থেকে বিরত থাকা এবং মিথ্যা প্রিয় কথা না বলা—এই নীতিই চিরন্তন ধর্ম।”

তাহলে আমাদের প্রশ্নের উত্তর কী?

মনুস্মৃতি ৪.১৩৮-এ ‘এষ ধর্মঃ সনাতনঃ’ কোনও সমগ্র ধর্মের নাম নয়। এটি একটি নির্দিষ্ট নৈতিক বিধানের পর বলা হয়েছে। সেই বিধান হল— সত্য কথা বলা। প্রিয় কথা বলা। অপ্রিয় সত্য কথা না বলা। এবং মিথ্যা হলেও শুধু প্রিয় বলে তা না বলা।

এই নীতিকে বলা হয়েছে— “এষ ধর্মঃ সনাতনঃ”

অর্থাৎ— “এটাই চিরন্তন ধর্ম।” এই অর্থে ‘সনাতন’ এখানে ধর্মের চিরন্তন বৈশিষ্ট্য বোঝাচ্ছে; ‘সনাতন’ কোনও ধর্মসম্প্রদায়ের নাম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে—এমন প্রমাণ এই শ্লোক নিজে দেয় না।

এই পর্বের সিদ্ধান্ত

মনুস্মৃতির ৪.১৩৮ আমাদের সামনে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ও ভাষাগত সত্য তুলে ধরে। ‘সনাতন ধর্ম’ শব্দবন্ধটি প্রাচীন। কিন্তু প্রাচীন গ্রন্থে এই শব্দবন্ধের ব্যবহার দেখলেই সেটিকে আধুনিক অর্থে একটি সম্পূর্ণ ধর্মের নাম হিসেবে ধরে নেওয়া যায় না। মনুস্মৃতির এই শ্লোকে ‘সনাতন ধর্ম’ বলতে বোঝানো হয়েছে কথাবলার একটি চিরন্তন নৈতিক বিধান।

অতএব— ‘সনাতন ধর্ম’ শব্দটি প্রাচীন—হ্যাঁ। মনুস্মৃতিতে ‘সনাতন ধর্ম’ শব্দবন্ধ আছে—হ্যাঁ। মনুস্মৃতি ৪.১৩৮-এ এটি সমগ্র হিন্দু ধর্মের নাম—এই শ্লোক থেকে তা প্রমাণিত হয়—না। বরং এই শ্লোকের সরল অর্থ “সত্য বলবে, প্রিয় কথা বলবে; অপ্রিয় সত্য বলবে না এবং প্রিয় হলেও মিথ্যা বলবে না—এটাই চিরন্তন ধর্ম।”

এই একটি শ্লোকই আমাদের শেখায়—একটি প্রাচীন শব্দবন্ধের অর্থ বুঝতে হলে তার সময়, প্রসঙ্গ এবং বাক্যের সম্পূর্ণ বক্তব্য দেখতে হয়। আর সেই অনুসন্ধান এবার আমাদের নিয়ে যাবে এমন একটি গ্রন্থের কাছে, যেখানে ‘সনাতন’ এবং ‘ধর্ম’—দুটি শব্দই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু একই অর্থে পাশাপাশি ব্যবহৃত হয়নি।

সেই গ্রন্থ হল ভগবদ্গীতা।

নবম পর্বের সূত্রসমূহ
১. মনুস্মৃতি, চতুর্থ অধ্যায়, ১৩৮ নম্বর শ্লোক — সত্য, প্রিয় কথা, অপ্রিয় সত্য এবং মিথ্যা প্রিয় কথার প্রসঙ্গে ‘এষ ধর্মঃ সনাতনঃ’।
২. মনুস্মৃতি, চতুর্থ অধ্যায়, ১৩৯ নম্বর শ্লোক — শুভ কথা বলা এবং অকারণ শত্রুতা ও বিবাদ থেকে বিরত থাকার প্রসঙ্গ।
৩. মেধাতিথির ভাষ্য — ৪.১৩৮ শ্লোকের ব্যাখ্যায় সত্য ও প্রিয় কথার সম্পর্ক এবং ‘চিরন্তন ধর্ম’ কথাটির ব্যাখ্যা।
৪. মনুস্মৃতির বিভিন্ন পাঠ — ৪.১৩৮-এর মূল সংস্কৃত পাঠের তুলনা।

পরবর্তী পর্ব

পর্ব ১০ — গীতায় ‘সনাতন’ ও ‘ধর্ম’

ভগবদ্গীতা ১১.১৮:

“শাশ্বতধর্মগোপ্তা
সনাতনস্ত্বং পুরুষো…”

এখানে ‘সনাতন’ কাকে বলা হয়েছে? ‘শাশ্বত ধর্ম’ কী? কেন এটিকে সরাসরি আধুনিক অর্থে “সনাতন ধর্ম = হিন্দুধর্ম” বলা ঠিক নাও হতে পারে?

— লিখছেন অনিরুদ্ধ পাল
“বিশ্বাসের প্রতি শ্রদ্ধা, ইতিহাসের প্রতি দায়বদ্ধতা।”


শেয়ার করুন