
ভোটেকোশী ও ত্রিশূলীর তীরে কেন একের পর এক জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, সড়ক, সেতু, বাজার ও পর্যটনকেন্দ্র তৈরি হল? উন্নয়নের এই মডেল কতটা নিরাপদ? ২৬ আগস্টের ধ্বংসের পরে কোন প্রকল্পগুলিকে নতুন করে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন?
Published on: সেপ্টে ৩, ২০২৬ at ১৯:৪৩
✍️ অনিরুদ্ধ পাল
সংবাদ প্রভাকর টাইমস
এসপিটি বিশেষ প্রতিবেদন: নদীকে ঘিরেই সভ্যতা তৈরি হয়।
জল যেখানে, মানুষ সেখানেই যায়। নদী দেয় পানীয় জল, কৃষির সুযোগ, যাতায়াতের পথ, বাণিজ্যের রাস্তা। পাহাড়ে সেই নদী আরও গুরুত্বপূর্ণ—কারণ খাড়া ভূখণ্ডের মধ্যে নদীর উপত্যকাই অনেক সময় চলাচল ও বসতির সবচেয়ে স্বাভাবিক পথ। ভোটেকোশী ও ত্রিশূলীর ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। কিন্তু গত ২৬ আগস্ট হিমালয়ের সেই চিরচেনা ভূগোলই ভয়ঙ্কর প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
যে নদীকে কেন্দ্র করে উন্নয়ন হয়েছে, সেই নদীই যদি একদিন কয়েক মিনিটের মধ্যে সেই উন্নয়নকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়, তাহলে ভুলটা কোথায়?
নদীর?
পাহাড়ের?
জলবায়ুর পরিবর্তনের?
নাকি মানুষের উন্নয়ন পরিকল্পনায়?
এই প্রশ্নের উত্তর সরল নয়।
কারণ ২৬ আগস্টের ঘটনা কোনও সাধারণ বর্ষার বন্যা ছিল না। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপের প্রাথমিক বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, লাংটাং জাতীয় উদ্যানের উচ্চভূমিতে হিমবাহ-সংলগ্ন ঢালের দ্রুত ধস থেকে বরফ, পাথর ও ধ্বংসাবশেষ নেমে এসে বিপুল ধ্বংসস্রোত তৈরি করে। সেই স্রোত ল্হেন্দে খোলা হয়ে ভোটেকোশী ও পরে ত্রিশূলী নদীপথ ধরে প্রায় ১০০ কিলোমিটার পর্যন্ত প্রভাব ফেলেছিল।
অর্থাৎ— এটি শুধু নদীর জল বাড়ার গল্প নয়। এটি পাহাড়, বরফ, পাথর, নদী এবং মানুষের নির্মাণ—সবকিছুর সংঘর্ষের গল্প।
প্রথম প্রশ্ন: নদীর ধারেই কেন এত উন্নয়ন?
উত্তরটা লুকিয়ে রয়েছে ভূগোলে।
লাংটাং থেকে ধুনচে, স্যাফ্রুবেশি, তিমুরে, রসুওয়াগঢ়ী হয়ে তিব্বতের দিকে যাওয়ার প্রাচীন পথটি পাহাড়ের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক চলাচলের পথ। নেপাল পর্যটন দপ্তরের বর্ণনায় ত্রিশূলী ও ভোটেকোশী এই অঞ্চলকে প্রাচীন বাণিজ্যপথের সঙ্গে যুক্ত করেছে। লাংটাং উপত্যকা, গোসাইঙ্কুণ্ড, তামাং ঐতিহ্যপথ এবং রসুওয়াগঢ়ী—সব মিলিয়ে এই অঞ্চলে পর্যটন ও তীর্থযাত্রার গুরুত্বও বহুদিনের।
অন্যদিকে ত্রিশূলী নদী নেপালের অন্যতম জনপ্রিয় নদীভিত্তিক পর্যটনকেন্দ্র। নেপাল পর্যটন দপ্তর ত্রিশূলীকে দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় নৌ-অভিযানযোগ্য নদীগুলির একটি হিসেবে উল্লেখ করেছে।
তাই নদীর পাশে রাস্তা তৈরি হয়েছে। রাস্তার পাশে বাজার। বাজারের পাশে বসতি। বসতির কাছে পর্যটনকেন্দ্র।
আর নদীর জল ও স্রোতকে কাজে লাগিয়ে গড়ে উঠেছে একের পর এক জলবিদ্যুৎ প্রকল্প। একটি নদী—অসংখ্য ব্যবহার। কিন্তু সেখানেই তৈরি হয়েছে ঝুঁকির প্রথম স্তর।
ভোটেকোশী–ত্রিশূলী কি উন্নয়নের অতিরিক্ত ভার বহন করছিল?
২০২০ সালে আন্তর্জাতিক অর্থ সংস্থার উদ্যোগে ত্রিশূলী নদী অববাহিকায় একটি সমন্বিত পরিবেশ ও সামাজিক প্রভাব মূল্যায়ন করা হয়েছিল।
সেই গবেষণার সময়ই ত্রিশূলী অববাহিকায় বিভিন্ন পর্যায়ে ৩৬টিরও বেশি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প চিহ্নিত হয়েছিল। গবেষণাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা দিয়েছিল—একটি প্রকল্পকে আলাদা করে বিচার করলে যে প্রভাব ছোট মনে হয়, একই নদী অববাহিকায় বহু প্রকল্প পাশাপাশি গড়ে উঠলে সেই প্রভাবগুলি পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বড় হয়ে উঠতে পারে।
সেখানে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের পাশাপাশি জলবায়ুর পরিবর্তন, পাহাড়ের ঢালের অস্থিতিশীলতা, বালু উত্তোলন এবং নগরায়ণের মতো চাপকেও একসঙ্গে বিবেচনা করা হয়েছিল।
এই তথ্যটি ২৬ আগস্টের পরে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ প্রশ্ন এখন আর শুধু— “এই প্রকল্পটি নিরাপদ কি না?”
প্রশ্ন হওয়া উচিত— “এই নদীর পুরো অববাহিকায় এতগুলি প্রকল্প, রাস্তা, বসতি ও পর্যটন পরিকাঠামো একসঙ্গে থাকলে সম্মিলিত ঝুঁকি কতটা?”
রাস্তা কি নদীর খুব কাছেই চলে গিয়েছিল?
রসুওয়াগঢ়ী যাওয়ার রাস্তার বাস্তব চিত্র এই প্রশ্নকে আরও কঠিন করে তোলে। কাঠমান্ডু পোস্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বেট্রাবতী থেকে রসুওয়াগঢ়ী সীমান্ত পর্যন্ত প্রায় ৪২ কিলোমিটার রাস্তা ২৬ আগস্টের বন্যায় বিভিন্ন জায়গায় ধ্বংস হয়। একাধিক পাকা সেতুও ভেসে যায়।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—এই রাস্তার বড় অংশ ভোটেকোশী নদীর পাশ দিয়ে পাহাড়ের গায়ে তৈরি।
প্রতিবেদনটি জানিয়েছে, গত বছরও বন্যায় এই রাস্তার অংশবিশেষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। এমনকি স্যাফ্রুবেশি থেকে সীমান্তের দিকে প্রায় ১৬ কিলোমিটার রাস্তা নতুন করে দুই লেন করার কাজ শুরু হয়েছিল; ২০২৬ সালের বন্যায় সেই অংশও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এখানে তদন্তের প্রশ্নটি খুব সরাসরি— যে রাস্তা এক বছর আগেই বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, সেটি পুনর্নির্মাণের সময় ২৬ আগস্টের মতো আরও বড় ধ্বংসস্রোতের সম্ভাবনা কতটা বিবেচনা করা হয়েছিল?
একই জায়গায় বারবার ক্ষতি—কিন্তু নকশা কি বদলেছে?
২০২৫ সালের জুলাইয়ে ভোটেকোশী অঞ্চলে একটি বড় আকস্মিক বন্যা হয়েছিল।
তার পরের বছর, ২০২৬ সালের আগস্টে আবার একই নদীপথে আরও ভয়ঙ্কর বিপর্যয়। কাঠমান্ডু পোস্টের প্রতিবেদন বলছে, ২০২৫ সালের ক্ষতির পরে স্যাফ্রুবেশি–রসুওয়াগঢ়ী পথ পুনর্গঠন করে প্রায় এক মাসের মধ্যে চালু করা হয়েছিল। কিন্তু পুরো উপত্যকার পুনর্গঠন তখনও শেষ হয়নি। তার মধ্যেই ২০২৬ সালের ২৬ আগস্ট আবার বিপর্যয় আঘাত করে।
অর্থাৎ এখানে শুধু একটি দুর্যোগের ক্ষতি নয়। একটি দুর্যোগের পরে কীভাবে পুনর্গঠন করা হচ্ছে—সেটিও পরবর্তী দুর্যোগের ঝুঁকি নির্ধারণ করে।
যদি একই জায়গায় একই ধরনের রাস্তা, একই উচ্চতায়, একই নদীর ধার ঘেঁষে তৈরি করা হয়, তাহলে সেটি পুনর্গঠন হতে পারে—কিন্তু ঝুঁকি হ্রাস নাও হতে পারে।
নদী কি তার পুরনো পথেই ছিল?
এই প্রশ্নটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নদীর পথকে পাহাড়ি অঞ্চলে স্থায়ী ধরে নেওয়া বিপজ্জনক।
২০২৬ সালের বিপর্যয়ের পরে নদীর গতিপথের বিভিন্ন অংশে পরিবর্তন হয়েছে। ২৬ আগস্টের ধ্বংসস্রোত বিপুল পরিমাণ পাথর, কাদা, বরফ ও ধ্বংসাবশেষ নদীর মধ্যে এনে ফেলেছে।এর ফলে পুরনো নদীখাতের পাশাপাশি নতুন স্রোতপথ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
অর্থাৎ— আজ যে জমিতে বাড়ি নিরাপদ মনে হচ্ছে, আগামী বর্ষায় সেটিই হয়তো নতুন স্রোতপথ হতে পারে। এই কারণেই এখন পুনর্গঠনের আগে নতুন করে নদীখাত, প্লাবনভূমি এবং ধ্বংসস্রোতের পথ চিহ্নিত করা জরুরি।
সবচেয়ে বড় পরীক্ষার মুখে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলি
২৬ আগস্টের পরে সবচেয়ে ভয়াবহ ছবিগুলির একটি এসেছে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলি থেকে। রয়টার্সের ৩১ আগস্টের প্রতিবেদনে রসুওয়া ও ত্রিশূলী অঞ্চলের একাধিক প্রকল্পে নিখোঁজ কর্মীদের তথ্য তুলে ধরা হয়। তার মধ্যে ছিল—
উপর ত্রিশূলী–১ নির্মাণাধীন ২১৬ মেগাওয়াট ক্ষমতার প্রকল্প। প্রায় ২৫০ জনকে উদ্ধার করা হলেও উদ্ধার অভিযান চলছিল।
উপর ত্রিশূলী–৩এ– ৬০ মেগাওয়াটের প্রকল্প। প্রায় ৪২ জন কর্মী নিখোঁজ থাকার কথা জানানো হয়েছিল।
উপর ত্রিশূলী–৩বি– ৩৭ মেগাওয়াটের প্রকল্প। প্রায় ১২২ জন নিখোঁজ থাকার আশঙ্কা করা হয়েছিল।
চিলিমে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প– ২২ মেগাওয়াট ক্ষমতার প্রকল্প। অন্তত আটজন নিখোঁজ থাকার কথা বলা হয়েছিল।
লাংটাং খোলা জলবিদ্যুৎ প্রকল্প – ২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার প্রকল্প। অন্তত ৪১ জন নিখোঁজ বলে জানানো হয়েছিল।
মাইলুং খোলা জলবিদ্যুৎ প্রকল্প- এখানেও অন্তত সাতজন নিখোঁজ থাকার কথা জানানো হয়েছিল। এ ছাড়াও রসুওয়াগঢ়ী, রসুওয়া-ভোটেকোশী, মধ্য ত্রিশূলী গঙ্গা, ত্রিশূলী ও দেবীঘাটের প্রকল্পগুলিতেও নিখোঁজ কর্মীর খবর ছিল। পরবর্তী প্রতিবেদনে প্রায় ৯০০ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কর্মী সুড়ঙ্গে আটকে পড়ে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
এটি শুধু উদ্ধার অভিযানের প্রশ্ন নয়। এটি এখন পরিকল্পনা ও নিরাপত্তা নিরীক্ষার প্রশ্ন।
কোন প্রকল্পগুলিকে আগে পুনর্মূল্যায়ন করা প্রয়োজন?
২৬ আগস্টের পরে সব প্রকল্পকে একইভাবে বিচার করা উচিত নয়। কিন্তু অন্তত পাঁচ ধরনের প্রকল্পকে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে নতুন করে পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
এক. নদীর সরাসরি তীরে থাকা প্রকল্প- যেসব প্রকল্পের জলগ্রহণ ব্যবস্থা, বিদ্যুৎঘর, কর্মীদের আবাসন অথবা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কাঠামো সরাসরি নদীর তীরের কাছে, সেগুলির অবস্থান নতুন করে পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
দুই. ধ্বংসস্রোতের সম্ভাব্য পথে থাকা প্রকল্প– শুধু নদীর জলস্তর নয়—বরফ, পাথর, কাদা ও গাছপালা মিশ্রিত দ্রুতগামী স্রোত কতটা উচ্চতায় পৌঁছতে পারে, সেটিও হিসাব করতে হবে।
তিন. সুড়ঙ্গনির্ভর প্রকল্প– ২৬ আগস্টের ঘটনা দেখিয়েছে, বাইরে থেকে নিরাপদ মনে হওয়া ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গও বিপদের বাইরে নয়। প্রকল্পগুলিতে বিকল্প বহির্গমনপথ, বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা, জরুরি যোগাযোগ এবং দ্রুত উদ্ধার পরিকল্পনা আছে কি না—তা পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
চার. নির্মাণাধীন প্রকল্প– নির্মাণকাজ চলার সময় শ্রমিকদের অস্থায়ী শিবির, যন্ত্রপাতি, খাদ্যভাণ্ডার এবং নির্মাণসামগ্রী অনেক সময় নদী বা ঢালের কাছে থাকে। এই অস্থায়ী কাঠামোগুলির ঝুঁকি স্থায়ী প্রকল্পের মতোই গুরুত্ব দিয়ে বিচার করা দরকার।
পাঁচ. এক নদীর ওপর পরপর বহু প্রকল্প- এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। একটি প্রকল্প হয়তো নিরাপদ। দুটি প্রকল্পও হয়তো নিরাপদ। কিন্তু একই অববাহিকায় কয়েক ডজন প্রকল্প থাকলে তাদের সম্মিলিত প্রভাব কী?
২০২০ সালের ত্রিশূলী অববাহিকা-সংক্রান্ত সমন্বিত মূল্যায়ন ইতিমধ্যেই এই ধরনের সামগ্রিক বিচার করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছিল।
নদীর বন্যা আর পাহাড়ের ধ্বংসস্রোত এক নয়
এই পার্থক্যটি বোঝা অত্যন্ত জরুরি। সাধারণ বন্যায় জল ধীরে ধীরে বাড়তে পারে। কিন্তু ২৬ আগস্টের মতো ঘটনায় পাহাড় থেকে নেমে আসা বরফ, পাথর, কাদা ও জল একসঙ্গে প্রবল গতিতে এগিয়ে যেতে পারে।
মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপের বিশ্লেষণ বলছে, ঘটনাটির উৎস ছিল লাংটাং লিরুংয়ের কাছের হিমবাহ-সংলগ্ন পাহাড়ি ঢালের দ্রুত ধস; প্রাথমিক ভূকম্পন বিশ্লেষণে ঘটনাটিকে প্রায় ৫.২ মাত্রার সমতুল্য শক্তির ধস হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, ভূত্বকীয় ভূমিকম্প হিসেবে নয়।
তাই ভবিষ্যতের প্রকল্প নকশায় শুধু— “শতবর্ষীয় বন্যা”
এই একটি হিসাব যথেষ্ট নাও হতে পারে। প্রশ্ন করতে হবে— বরফ-পাথর-কাদা মিশ্রিত ধ্বংসস্রোত এলে কী হবে?
নেপালের সরকারি নির্দেশিকাই আসলে কী বলছে?
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আসে।
নেপালের জল ও শক্তি কমিশনের বন্যা-সমতল ব্যবস্থাপনা নির্দেশিকায় নদীর আশপাশকে বিভিন্ন ঝুঁকির অঞ্চলে ভাগ করার কথা বলা হয়েছে।
সেখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নদীপথকে নদীর প্রবাহের জন্য সংরক্ষিত রাখার কথা রয়েছে। উচ্চঝুঁকির এলাকায় আবাসিক নির্মাণ নিষিদ্ধ করার সুপারিশ আছে। অপেক্ষাকৃত কম ঝুঁকির অঞ্চলে উঁচু ভিত্তির বাড়ি নির্মাণের কথা বলা হয়েছে।
আর কৌশলগত স্থাপনা—যেমন জরুরি আশ্রয়কেন্দ্র, বড় শিল্প এবং জলবিদ্যুৎকেন্দ্র—আরও নিরাপদ উচ্চতায় রাখার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ নীতি-নির্দেশের স্তরে বিষয়টি অজানা ছিল না।
তাহলে প্রশ্ন— বাস্তবে সেই ঝুঁকি-মানচিত্র কতটা কার্যকরভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল?
বসতি, বাজার ও পর্যটন—সবকিছুকে কি নদীর কাছে রাখতে হবে?
এই অঞ্চলের অর্থনীতি নদী ও পথের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। রসুওয়াগঢ়ী সীমান্তপথে বাণিজ্য চলে। লাংটাংয়ে পর্যটক যায়। গোসাইঙ্কুণ্ডে তীর্থযাত্রী যায়। ত্রিশূলীতে নদীভিত্তিক পর্যটন চলে। নদীর ধারে বাজার ও হোটেল গড়ে উঠেছে।
২৬ আগস্টের আগে নেপাল পর্যটন দপ্তরও রসুওয়া–ত্রিশূলী অঞ্চলের পর্যটনকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে তুলে ধরেছে। আর বন্যার পরে পর্যটনকেন্দ্রগুলির ক্ষয়ক্ষতি নথিবদ্ধ করার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানিয়েছে নেপাল পর্যটন দপ্তর।
সুতরাং সমাধান এই নয় যে— নদীর পাশে কোনও উন্নয়ন হবে না। বরং প্রয়োজন— ঝুঁকি বুঝে উন্নয়ন।
উন্নয়নের নতুন নকশা কেমন হওয়া উচিত?
২৬ আগস্টের পরে ভোটেকোশী–ত্রিশূলী অঞ্চলে পুনর্গঠন যদি পুরনো নকশায় হয়, তাহলে সেটি হবে সবচেয়ে বড় ভুল। নতুন পরিকল্পনায় অন্তত এই বিষয়গুলি থাকা প্রয়োজন—
প্রথম, নদীর বর্তমান ও অতীত গতিপথের পূর্ণ মানচিত্র তৈরি করতে হবে।
দ্বিতীয়, কোথায় বন্যা, কোথায় পাহাড়ধস, কোথায় ধ্বংসস্রোত—এই তিন ধরনের ঝুঁকি আলাদা করে চিহ্নিত করতে হবে।
তৃতীয়, নদীর স্বাভাবিক বিস্তারের জায়গা দখল করে নতুন বসতি তৈরি বন্ধ করতে হবে।
চতুর্থ, অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় ইতিমধ্যে থাকা বসতিগুলির জন্য পর্যায়ক্রমিক নিরাপদ পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে।
পঞ্চম, বিদ্যালয়, হাসপাতাল, জরুরি আশ্রয়কেন্দ্র ও উদ্ধারকেন্দ্র নদীর সরাসরি ঝুঁকিপথের বাইরে রাখতে হবে।
ষষ্ঠ, জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের অনুমোদনে শুধু প্রকল্পভিত্তিক পরিবেশ মূল্যায়ন নয়, পুরো নদী অববাহিকার সম্মিলিত ঝুঁকি বিচার করতে হবে।
সপ্তম, সেতু ও রাস্তার নকশায় শুধু জল নয়—পাথর, কাদা, বরফ, গাছ ও ধ্বংসাবশেষের প্রবল স্রোত বিবেচনায় নিতে হবে।
অষ্টম, নদীর উজানে হিমবাহ, হিমবাহ-হ্রদ, পাহাড়ের ঢাল ও জলস্তরের নজরদারি বাড়াতে হবে।
নবম, নেপাল ও চীনের মধ্যে উজানের জলস্তর ও হিমবাহের গতিবিধি সংক্রান্ত তথ্য আরও দ্রুত বিনিময়ের ব্যবস্থা করতে হবে। ৩০ আগস্ট রয়টার্স জানায়, নেপাল ইতিমধ্যেই চীনের সঙ্গে এমন তথ্য বিনিময় ও আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা জোরদারের দাবি তুলেছে।
পুনর্গঠন যদি আগের জায়গাতেই হয়, তবে কি আবার একই বিপদ?
এই প্রশ্ন আজ সবচেয়ে জরুরি।
৩ সেপ্টেম্বরের রয়টার্স প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নেপালে প্রায় ২০ হাজার বাড়ি পুনর্নির্মাণের প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে নিরাপদ জায়গায় পুনর্গঠনের প্রয়োজনীয়তাও সামনে এসেছে। এখানেই রাষ্ট্রের সবচেয়ে কঠিন সিদ্ধান্ত। মানুষকে নিজের ভিটে থেকে সরানো সহজ নয়।
কিন্তু এমন জায়গায় আবার বাড়ি তৈরি করা, যেখানে নতুন করে ধ্বংসস্রোত আসার সম্ভাবনা রয়েছে, সেটিও কোনও সমাধান নয়। পুনর্গঠন মানে শুধু ভাঙা বাড়ি আবার বানানো নয়। পুনর্গঠন মানে— আগের ভুলের পুনরাবৃত্তি না করা।
তাহলে কি জলবিদ্যুৎ উন্নয়ন বন্ধ করতে হবে?
না। নেপালের অর্থনীতিতে জলবিদ্যুতের গুরুত্ব এত বেশি যে সেটি বন্ধ করার প্রশ্নই ওঠে না।
প্রশ্ন হল— কোথায়? কতটা? কী নকশায়? এবং কতটা ঝুঁকি মেনে?
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণও বলছে, নেপালের জলবিদ্যুৎ পরিকাঠামোকে শুধু আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়া নয়, ভবিষ্যতের জলবায়ু ও দুর্যোগের ঝুঁকি মাথায় রেখে আরও সহনশীল করে পুনর্নির্মাণ করার প্রয়োজন রয়েছে।
অর্থাৎ— উন্নয়ন থামবে না। উন্নয়নের পদ্ধতি বদলাতে হবে।
২৬ আগস্টের সবচেয়ে বড় শিক্ষা
এই বিপর্যয়ের পরে একটি বিষয় স্পষ্ট। হিমালয়ে নদীকে শুধু জলধারা হিসেবে দেখলে চলবে না।
নদী হল—
পাহাড়ের ঢালের অংশ।
হিমবাহের অংশ।
ভূমিকম্পপ্রবণ ভূপ্রকৃতির অংশ।
বৃষ্টিপাতের অংশ।
বসতির অংশ।
রাস্তার অংশ।
বিদ্যুতের অংশ।
পর্যটনের অংশ।
একটি জায়গায় বিপদ তৈরি হলে তার অভিঘাত বহু দূরে পৌঁছে যায়। লাংটাংয়ের পাহাড়ে ধস নামল। তার অভিঘাত পৌঁছল ভোটেকোশীতে। তারপর ত্রিশূলীতে। তারপর আরও নীচের জনপদে। অর্থাৎ— হিমালয়ে কোনও প্রকল্পকে একা দেখে নিরাপদ ঘোষণা করা যায় না।
তার উজান কোথায়? তার ভাটিতে কী আছে? তার পাশের পাহাড় কতটা স্থিতিশীল? তার নীচে কত মানুষ বাস করে? একই নদীতে আর কত প্রকল্প আছে? এই সব প্রশ্নের উত্তর একসঙ্গে না জানলে উন্নয়ন পরিকল্পনা অসম্পূর্ণ।
এই পর্বের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন
২৬ আগস্টের পরে এখন তিনটি পথ খোলা।
প্রথম পথ— আগের জায়গায় আগের মতোই পুনর্গঠন।
দ্বিতীয় পথ— সব উন্নয়ন বন্ধ করে দেওয়া।
তৃতীয় পথ— ঝুঁকির মানচিত্র বদলে, নদীর জায়গা রেখে, নিরাপদ উচ্চতায়, নতুন নকশায় উন্নয়ন। তৃতীয় পথটিই বাস্তবসম্মত। কারণ হিমালয়কে উন্নয়ন থেকে বাদ দেওয়া যাবে না। কিন্তু হিমালয়ের স্বভাবকে উন্নয়ন পরিকল্পনা থেকে বাদ দেওয়াও যাবে না।
শেষ কথা
২৬ আগস্টের ভোটেকোশী–ত্রিশূলী বিপর্যয় হয়তো একটি ভয়াবহ প্রাকৃতিক ঘটনা। কিন্তু তার ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা শুধু প্রকৃতি দিয়ে ব্যাখ্যা করলে পুরো ছবিটা দেখা হবে না।
যেখানে নদীর পাশে রাস্তা, রাস্তার পাশে বাজার, বাজারের পাশে বসতি, বসতির পাশে জলবিদ্যুৎকেন্দ্র, আর তারই মধ্যে পর্যটন ও সীমান্ত বাণিজ্যের বিস্তার— সেখানে ঝুঁকিও একসঙ্গে জমা হয়। তাই ভবিষ্যতের প্রশ্ন— নদীকে বশে আনা যাবে কি না—তা নয়।
প্রশ্ন হল— নদী যখন নিজের শক্তি ফিরে পাবে, তখন মানুষের তৈরি পৃথিবী তার সঙ্গে লড়াই না করে কতটা নিরাপদে টিকে থাকতে পারবে?
২৬ আগস্ট হয়তো সেই পরীক্ষার প্রথম বড় ঘণ্টা বাজিয়েছে।
হিমালয়ের হুঁশিয়ারি তাই শুধু বন্যার সতর্কবার্তা নয়। এটি উন্নয়নের নকশা বদলেরও সতর্কবার্তা।
নদীকে জায়গা দিতে হবে।
পাহাড়কে বুঝতে হবে।
আর উন্নয়নকে প্রকৃতির সঙ্গে সমঝোতা করেই এগোতে হবে।
কারণ—
**নদীর পাশে উন্নয়ন অপরাধ নয়।
নদীর বিপদ জেনেও ভুল জায়গায় উন্নয়ন করাই বিপদ।**
প্রধান তথ্যসূত্র
মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপের বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ; আন্তর্জাতিক অর্থ সংস্থার ত্রিশূলী নদী অববাহিকার সম্মিলিত প্রভাব মূল্যায়ন; নেপালের জল ও শক্তি কমিশনের বন্যা-সমতল ব্যবস্থাপনা নির্দেশিকা; নেপাল পর্যটন দপ্তরের নদী, লাংটাং ও তীর্থপর্যটন সংক্রান্ত তথ্য; নেপাল সরকারের দুর্যোগ-সংক্রান্ত তথ্য; রয়টার্স; অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস; কাঠমান্ডু পোস্ট এবং সাম্প্রতিক উপগ্রহচিত্রভিত্তিক বিশ্লেষণ।
Published on: সেপ্টে ৩, ২০২৬ at ১৯:৪৩




