
একটি প্রাচীন শব্দ, একটি আধুনিক পরিচয় এবং ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ
Published on: অক্টো ২৮, ২০২৬ at ১৭:২৮
✍️ লিখছেন অনিরুদ্ধ পাল। সংবাদ প্রভাকর টাইমস
এসপিটি বিশেষ প্রতিবেদন: ‘সনাতন ধর্ম’—দুটি শব্দের মধ্যে রয়েছে প্রাচীনত্ব, চিরন্তনতার ধারণা এবং ধর্মীয় বিশ্বাসের গভীর তাৎপর্য। আজ বহু মানুষ এই নামেই নিজেদের ধর্মীয় ঐতিহ্যকে চিহ্নিত করেন। তাঁদের কাছে এটি কেবল একটি পরিচয় নয়, বরং জীবনদর্শন, বিশ্বাস, আচার, নৈতিকতা এবং উত্তরাধিকার বহনকারী একটি শব্দবন্ধ।
কিন্তু ইতিহাসের অনুসন্ধানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে: ‘সনাতন ধর্ম’ কথাটি প্রাচীন সংস্কৃত সাহিত্যে ব্যবহৃত হলেও, কখন থেকে এটি আজকের অর্থে হিন্দুধর্মের একটি সাধারণ নাম হিসেবে প্রচলিত হল?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে আমাদের বিশ্বাসের তাৎপর্য এবং শব্দের ইতিহাসকে পৃথকভাবে বিবেচনা করতে হবে। কোনও শব্দের প্রাচীনত্ব প্রমাণিত হলেই সেই শব্দটি প্রাচীনকাল থেকে একটি বৃহত্তর ধর্মীয় সম্প্রদায়ের সর্বজনস্বীকৃত নাম ছিল—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায় না।
এই পর্বের মূল অনুসন্ধান সেই পার্থক্যকে ঘিরেই।
‘সনাতন’ শব্দটি কি প্রাচীন?
নিশ্চয়ই। সংস্কৃত ভাষায় ‘সনাতন’ শব্দের অর্থ চিরন্তন, শাশ্বত কিংবা সুদীর্ঘকাল ধরে বিদ্যমান—প্রসঙ্গ অনুযায়ী এর অর্থের প্রয়োগে পার্থক্য থাকতে পারে। প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্য ও দর্শনে শব্দটির ব্যবহার পাওয়া যায়।
একইভাবে, ‘ধর্ম’ শব্দটির অর্থও বহুমাত্রিক। কোনও প্রসঙ্গে তা কর্তব্য, নৈতিক বিধান, আচরণবিধি কিংবা কোনও কিছুর স্বভাব বা বৈশিষ্ট্য বোঝাতে পারে। অন্য প্রসঙ্গে তা ধর্মীয় অনুশাসন, সামাজিক দায়িত্ব কিংবা বৃহত্তর জীবনব্যবস্থার ধারণা প্রকাশ করে।
তাই ‘সনাতন ধর্ম’ কথাটি যখন কোনও প্রাচীন গ্রন্থে পাওয়া যায়, তখন প্রথমেই দেখতে হবে, সেটি কোন প্রসঙ্গে ব্যবহৃত হয়েছে। সেখানে কি চিরন্তন কর্তব্য বা নৈতিক নীতি বোঝানো হয়েছে? কোনও বিশেষ আচরণবিধিকে কি শাশ্বত বলা হয়েছে? নাকি সমগ্র ভারতীয় ধর্মীয় ঐতিহ্যের একটি সাধারণ নাম হিসেবে শব্দবন্ধটি ব্যবহৃত হয়েছে?
এই প্রশ্নগুলির উত্তর এক নয়।
কোনও গ্রন্থে ‘সনাতন ধর্ম’ কথাটি পাওয়া গেলে তার ঐতিহাসিক তাৎপর্য অবশ্যই রয়েছে। কিন্তু সেই উল্লেখের অর্থ নির্ধারণ করতে হলে সংশ্লিষ্ট বাক্য, অধ্যায়, গ্রন্থের বিষয়বস্তু এবং রচনার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিচার করতে হবে।
শব্দের প্রাচীন ব্যবহার এবং একটি ধর্মের সর্বজনীন নাম হিসেবে তার ব্যবহার—দুটি পৃথক ঐতিহাসিক বিষয়।
পিটার হীশের গবেষণা: আলোচনায় নতুন প্রশ্ন
এই বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা করেছেন ইতিহাসবিদ পিটার হীশ। তাঁর গবেষণাপত্রের শিরোনাম ‘চিরন্তন ধর্মের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস: সনাতন ধর্মের ঐতিহাসিক বংশপরম্পরা’। এটি ২০২৪ সালে অনলাইনে প্রকাশিত হয় এবং ২০২৫ সালে আন্তর্জাতিক হিন্দুধর্ম অধ্যয়ন পত্রিকা-র ঊনত্রিশতম খণ্ডে প্রকাশিত হয়।
হীশের গবেষণার মূল বক্তব্য হলো, বর্তমানে যে ধর্মকে হিন্দুধর্ম বলা হয়, তার আদি সংস্কৃত নাম ‘সনাতন ধর্ম’ ছিল—এই বহুল প্রচলিত ধারণার পক্ষে পর্যাপ্ত ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই। তাঁর অনুসন্ধান অনুযায়ী, ধ্রুপদি ও মধ্যযুগীয় সংস্কৃত সাহিত্যে শব্দবন্ধটির ব্যবহার পাওয়া গেলেও তা ভারতবর্ষের মানুষের সামগ্রিক ধর্মীয় বিশ্বাস ও আচারের সাধারণ নাম হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল—এমন প্রমাণ তিনি পাননি।
তাঁর মতে, হিন্দুধর্মের সমার্থক বৃহত্তর পরিচয় হিসেবে ‘সনাতন ধর্ম’ কথাটির ব্যবহার ঔপনিবেশিক যুগের শেষভাগে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ঊনবিংশ শতকের শেষভাগে ধর্মীয় সংস্কার, ঐতিহ্য রক্ষা এবং ভারতীয় সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয় নিয়ে বিতর্কের মধ্যে এই নাম বিশেষ গুরুত্ব অর্জন করে।
এখানে হীশের বক্তব্যের প্রকৃতি বোঝা জরুরি। তিনি বলছেন না যে ‘সনাতন’ শব্দটি আধুনিক যুগে সৃষ্টি হয়েছে। তিনি বলছেন না যে ‘সনাতন ধর্ম’ কথাটির আগে কোনও ব্যবহার ছিল না। তাঁর গবেষণার প্রশ্নটি আরও নির্দিষ্ট: প্রাচীন শব্দবন্ধটি কখন হিন্দুধর্মের সমার্থক একটি বৃহত্তর ধর্মীয় পরিচয় হিসেবে ব্যবহৃত হতে শুরু করল?
এই পার্থক্যটি না বুঝলে তাঁর গবেষণার বক্তব্য ভুলভাবে ব্যাখ্যা হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
১৮৭০ সালের আগের প্রমাণ নিয়ে কী বলছেন হীশ?
হীশ তাঁর গবেষণায় ১৭৯০ থেকে ১৯০০ সালের মধ্যে প্রকাশিত বিভিন্ন মুদ্রিত উপাদান অনুসন্ধান করেছেন। এর জন্য তিনি গুগল বুকস, আর্কাইভ ডট অর্গ এবং হ্যাথি ট্রাস্টের মতো ডিজিটাল গ্রন্থভান্ডারের পাঠ্য অনুসন্ধানের সাহায্য নেন।
তাঁর অনুসন্ধানে, ১৮৭০ সালের আগে ‘সনাতন ধর্ম’ কথাটিকে হিন্দুধর্মের সমার্থক সাধারণ নাম হিসেবে ব্যবহার করার প্রমাণ অত্যন্ত সীমিত। তিনি ১৮৬১ সালে প্রকাশিত কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি গ্রন্থে পাওয়া উল্লেখকে ব্যতিক্রম হিসেবে আলোচনা করেছেন। তাঁর মতে, ১৮৬৯ সালের আগের মুদ্রিত উপাদানে এই আধুনিক অর্থের ব্যবহার প্রায় অনুপস্থিত, অথচ ১৮৭০ সালের পরের উপাদানে এর ব্যবহার অনেক বেশি দেখা যায়।
তবে এই সিদ্ধান্তের সীমাবদ্ধতাও হীশ নিজেই স্বীকার করেছেন।
তাঁর অনুসন্ধানের প্রধান উপাদান ছিল ডিজিটাল ভান্ডারে পাওয়া মুদ্রিত গ্রন্থ। ভারতীয় ভাষার সব পুরোনো গ্রন্থ এই ভান্ডারগুলিতে সমানভাবে সংরক্ষিত বা অনুসন্ধানযোগ্য নয়। পাণ্ডুলিপি, মৌখিক বক্তব্য কিংবা এখনও যথাযথভাবে অনুসন্ধান না করা আঞ্চলিক নথির সব কিছুও এই অনুসন্ধানের আওতায় আসেনি।
অতএব, তাঁর গবেষণার সিদ্ধান্তকে এভাবে বোঝা উচিত নয় যে ১৮৭০ সালের আগে পৃথিবীর কোথাও ‘সনাতন ধর্ম’ কথাটি হিন্দুধর্মের অর্থে উচ্চারিত হয়নি। বরং বলা যায়, এখন পর্যন্ত অনুসন্ধান করা মুদ্রিত উপাদানে এই অর্থের প্রমাণ অত্যন্ত সীমিত, আর ঊনবিংশ শতকের শেষভাগ থেকে এর ব্যবহার স্পষ্টভাবে বাড়তে দেখা যায়।
ইতিহাসচর্চায় এই সতর্কতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রমাণের অভাব এবং কোনও ঘটনার অনস্তিত্ব এক কথা নয়। আবার নতুন প্রমাণ পাওয়া গেলে বর্তমান সিদ্ধান্ত সংশোধন করার সুযোগও খোলা রাখতে হয়।
ঊনবিংশ শতকের শেষভাগে কী পরিবর্তন ঘটছিল?
ঊনবিংশ শতকের ভারতীয় সমাজ ছিল ধর্মীয় ও সামাজিক পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ের মধ্য দিয়ে অগ্রসরমান। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন, পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসার, খ্রিস্টান ধর্মপ্রচারকদের কার্যকলাপ, মুদ্রণযন্ত্রের বিস্তার এবং সমাজসংস্কার আন্দোলন ধর্মীয় ঐতিহ্য নিয়ে নতুন ধরনের বিতর্ক সৃষ্টি করেছিল।
একদিকে, রাজা রামমোহন রায়ের মতো চিন্তাবিদেরা ধর্মীয় গ্রন্থের নতুন ব্যাখ্যা এবং সামাজিক সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা করেছিলেন। ব্রাহ্মসমাজের মতো আন্দোলন প্রচলিত ধর্মীয় বিশ্বাস ও আচারের বিভিন্ন দিকের সমালোচনা করেছিল। অন্যদিকে, বহু পণ্ডিত ও ধর্মীয় নেতা মনে করেছিলেন, প্রাচীন ধর্মীয় ঐতিহ্য, আচার এবং সামাজিক বিধানকে রক্ষা করা প্রয়োজন।
এই বিতর্কের মধ্যে একটি বড় প্রশ্ন উঠে আসে: ভারতীয় ধর্মীয় ঐতিহ্যের মূল পরিচয় কী? বিভিন্ন আচার, সম্প্রদায় ও বিশ্বাসের মধ্যে কোন বিষয়গুলিকে সাধারণ ভিত্তি হিসেবে চিহ্নিত করা যায়? ঐতিহ্য রক্ষা বলতে ঠিক কী বোঝানো হবে?
‘সনাতন ধর্ম’ কথাটি এই বৃহত্তর বিতর্কের মধ্যে নতুন তাৎপর্য লাভ করে। ‘সনাতন’ শব্দের চিরন্তনতার ভাব ধর্মীয় ঐতিহ্যের প্রাচীনত্ব ও স্থায়িত্ব বোঝাতে কার্যকর হয়ে ওঠে। এর মাধ্যমে কেউ কেউ প্রচলিত ধর্মীয় আচার ও সামাজিক বিধানকে দীর্ঘ ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে তুলে ধরতে চেয়েছিলেন।
তবে এই প্রবণতাকে সব ধর্মীয় চিন্তাবিদের অভিন্ন অবস্থান হিসেবে দেখা যাবে না। কেউ ঐতিহ্য রক্ষার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন, কেউ সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন, আবার কেউ প্রাচীন গ্রন্থের নতুন ব্যাখ্যার মাধ্যমে ধর্মীয় পরিচয়কে পুনর্গঠনের চেষ্টা করেছেন।
হীশের বিশ্লেষণে, ‘সনাতন ধর্ম’ কথাটির আধুনিক ব্যবহার এই পরিবর্তনশীল সমাজে অতীতের একটি আদর্শায়িত ধারণাকে সামনে আনার প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত। তিনি এই প্রক্রিয়াকে এমন এক ধরনের ঐতিহ্য নির্মাণ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন, যেখানে বর্তমানের অনিশ্চয়তা ও বিতর্কের মধ্যে মানুষ অতীতের একটি আদর্শ রূপের আশ্রয় নেয়।
এর অর্থ এই নয় যে ঐতিহ্যটি মিথ্যা কিংবা প্রাচীন ধর্মীয় বিশ্বাসগুলি কল্পিত। বরং অতীতের বহুস্তরীয় ইতিহাস থেকে কিছু নির্দিষ্ট বিষয়কে বেছে নিয়ে বর্তমানের পরিচয় নির্মাণের প্রক্রিয়াটিকেই এখানে বোঝানো হচ্ছে।
১৮৬৯–৭০: একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ
হীশের গবেষণায় ১৮৬৯–৭০ সাল একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ সময় হিসেবে উঠে এসেছে।
এই সময়ে ‘ভারতবর্ষীয় সনাতন ধর্মরক্ষিণী সভা’ নামে একটি সংগঠন কার্যক্রম শুরু করে। সংগঠনটি ধর্মীয় গ্রন্থ অধ্যয়ন, ধর্মীয় প্রশ্নে মতামত প্রদান এবং ভারতীয় ধর্মীয় ঐতিহ্য রক্ষার উদ্দেশ্যে কাজ করেছিল বলে তার প্রকাশিত বিবরণ থেকে জানা যায়।
হীশের অনুসন্ধান অনুযায়ী, এই সংগঠনের ১৮৬৯–৭০ সালের প্রকাশিত বিবরণ ও অন্যান্য মুদ্রিত উপাদানগুলির মধ্যে ‘সনাতন ধর্ম’ কথাটিকে হিন্দুধর্মের সমার্থক বৃহত্তর পরিচয় হিসেবে ব্যবহারের প্রাচীনতম মুদ্রিত প্রমাণ পাওয়া যায়। তবে এই তথ্য থেকে এককভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না যে ধারণাটির জন্ম ঠিক এই সংগঠনের মধ্যেই হয়েছিল। এর আগে মৌখিক আলোচনা, অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপি কিংবা অন্য কোনও ব্যবহার ছিল কি না, তা সম্পূর্ণ নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।
এই সময়ের তাৎপর্য হলো, ‘সনাতন ধর্ম’ কথাটি ক্রমশ একটি বৃহত্তর ধর্মীয় পরিচয় ও ঐতিহ্য রক্ষার বক্তব্যের সঙ্গে যুক্ত হয়ে উঠছিল। শব্দটি কেবল কোনও চিরন্তন নীতি বা কর্তব্য বোঝানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছিল না; তা একটি ধর্মীয় সমাজের ঐতিহ্য ও স্বাতন্ত্র্য প্রকাশের মাধ্যম হিসেবেও ব্যবহৃত হতে শুরু করেছিল।
এই পরিবর্তন এক দিনে ঘটেনি। ঊনবিংশ শতকের শেষভাগে বিভিন্ন অঞ্চলে ধর্মীয় সভা, সংগঠন, প্রকাশনা এবং বিতর্কের মাধ্যমে ‘সনাতন ধর্ম’ পরিচয়ের অর্থ ও ব্যবহার আরও বিস্তৃত হয়।
১৮৭৭ সালের একটি গ্রন্থের গুরুত্ব
এই ইতিহাসের আরেকটি উল্লেখযোগ্য উপাদান হলো পণ্ডিত গুরুসহায়ের রচিত ‘সনাতন ধর্মমার্তণ্ড’ নামের গ্রন্থ। ১৮৭৭ সালে প্রকাশিত এই গ্রন্থে মনুস্মৃতিসহ বিভিন্ন ধর্মীয় গ্রন্থের বক্তব্যের ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল সংস্কৃত ভাষায় দক্ষ নন—এমন পাঠকদের কাছেও ঐতিহ্যগত ধর্মীয় বিধান ও নৈতিক শিক্ষাকে পৌঁছে দেওয়া।
ফরাসি গবেষক ক্যাথরিন ক্লেমঁতা-ওঝার গবেষণাতেও ঊনবিংশ শতকের শেষভাগে উত্তর ভারতের শিক্ষিত হিন্দু সমাজে ‘সনাতন ধর্ম’ পরিচয়ের বিকাশের বিষয়টি আলোচিত হয়েছে। তাঁর বিশ্লেষণে, এই পরিচয় একদিকে প্রাচীন ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতার দাবি বহন করেছিল, অন্যদিকে ধর্মীয় ও সামাজিক সংস্কারের দাবির প্রতিক্রিয়াতেও গুরুত্ব লাভ করেছিল।
এখানে লক্ষণীয়, ‘সনাতন ধর্ম’ পরিচয়ের আধুনিক ইতিহাস কেবল শব্দটির ব্যবহার বাড়ার ইতিহাস নয়। এর সঙ্গে যুক্ত ছিল ধর্মীয় গ্রন্থের ব্যাখ্যা, সাধারণ মানুষের কাছে ধর্মীয় শিক্ষা পৌঁছে দেওয়া এবং কোন আচার বা সামাজিক বিধানকে ঐতিহ্যের অপরিহার্য অংশ বলে গণ্য করা হবে—সেই প্রশ্নে বিতর্ক।
কিন্তু এই পরিচয় গ্রহণকারী সকলের চিন্তাভাবনা এক ছিল না। ‘সনাতন ধর্ম’ কথাটিকে কেউ সামাজিক ও ধর্মীয় রক্ষণশীলতার সঙ্গে যুক্ত করেছেন, আবার কেউ বৃহত্তর আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের পরিচয় হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তাই শব্দটির আধুনিক ব্যবহারকে একটিমাত্র রাজনৈতিক বা ধর্মীয় অবস্থানের মধ্যে সীমাবদ্ধ করা ইতিহাসের জটিলতাকে কমিয়ে দেখানো হবে।
তাহলে কি ‘সনাতন ধর্ম’ পরিচয়টি কৃত্রিম?
এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে ‘কৃত্রিম’ শব্দটির অর্থ পরিষ্কার করা দরকার।
যদি বলা হয়, ‘সনাতন’ শব্দটি আধুনিক যুগে তৈরি হয়েছে, তবে তা ভুল। শব্দটি প্রাচীন সংস্কৃত সাহিত্যে ব্যবহৃত হয়েছে। ‘ধর্ম’ ধারণারও ভারতীয় দর্শন, সাহিত্য ও সামাজিক জীবনে দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে।
যদি বলা হয়, ‘সনাতন ধর্ম’ কথাটির কোনও প্রাচীন ব্যবহার ছিল না, তবে সেটিও সঠিক নয়। প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় সাহিত্যে শব্দবন্ধটির ব্যবহার পাওয়া যায়।
কিন্তু যদি প্রশ্ন হয়, এই শব্দবন্ধটি কি প্রাচীনকাল থেকেই ভারতীয় উপমহাদেশের সমস্ত হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাস ও আচারের একক, সর্বজনস্বীকৃত নাম ছিল—তাহলে তার পক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণ রয়েছে কি না, সেটিই মূল ঐতিহাসিক বিতর্ক। পিটার হীশের গবেষণা এই প্রচলিত দাবির পক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণ না থাকার কথাই তুলে ধরে।
এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন: কোনও পরিচয়ের নাম ও তার সামাজিক ব্যবহার ইতিহাসের মধ্যে পরিবর্তিত হতে পারে। একটি প্রাচীন শব্দ নতুন যুগে নতুন অর্থ অর্জন করতে পারে। সেই নতুন অর্থে শব্দটির ব্যবহার শুরু হওয়া মানেই শব্দটির পুরোনো অর্থ বা তার সঙ্গে যুক্ত প্রাচীন ঐতিহ্যগুলি অস্বীকার করা নয়।
‘সনাতন ধর্ম’ কথাটির ইতিহাসেও এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ।
‘সনাতন ধর্ম’ ও ‘হিন্দুধর্ম’: আজকের পরিচয়, ইতিহাসের প্রশ্ন
আজ বহু মানুষ ‘সনাতন ধর্ম’ ও ‘হিন্দুধর্ম’কে একই ধর্মীয় ঐতিহ্যের দুটি নাম হিসেবে ব্যবহার করেন। এই ব্যবহার তাঁদের ধর্মীয় আত্মপরিচয়ের অংশ। সেই বিশ্বাস ও পরিচয়ের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই ইতিহাসের প্রশ্নগুলি আলোচনা করা প্রয়োজন।
ইতিহাসবিদের কাজ কোনও ব্যক্তির বিশ্বাসের বৈধতা নির্ধারণ করা নয়। তাঁর কাজ হলো শব্দ, নথি, গ্রন্থ, সংগঠন এবং সামাজিক পরিবর্তনের সূত্র ধরে অতীতের ব্যবহার ও অর্থ অনুসন্ধান করা।
সেই দৃষ্টিতে ‘সনাতন ধর্ম’ কথাটির অন্তত দুটি পৃথক ইতিহাস রয়েছে।
প্রথমটি হলো প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় সাহিত্যে শব্দবন্ধটির ব্যবহার, যেখানে প্রসঙ্গ অনুযায়ী তা চিরন্তন ধর্মনীতি, কর্তব্য কিংবা নৈতিক বিধান বোঝাতে পারে।
দ্বিতীয়টি হলো আধুনিক যুগে শব্দবন্ধটির বৃহত্তর ধর্মীয় পরিচয় হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভের ইতিহাস। ঊনবিংশ শতকের শেষভাগে ধর্মীয় সংস্কার, ঐতিহ্য রক্ষা, সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয় এবং সংগঠন গড়ে তোলার প্রচেষ্টার মধ্যে এই ব্যবহার ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
এই দুই ইতিহাস পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত, কিন্তু এক নয়।
কোনও শব্দের প্রাচীনত্বকে সম্মান জানাতে হলে তার ঐতিহাসিক ব্যবহারকে যথাযথভাবে বুঝতে হবে। আবার আধুনিক পরিচয়ের বিকাশ বুঝতে হলে সেই সময়ের সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতিকেও বিবেচনা করতে হবে।
এই অনুসন্ধান আমাদের কী শেখায়?
‘সনাতন ধর্ম’ কথাটির ইতিহাস নিয়ে আলোচনা আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়: কোনও শব্দের অর্থ চিরকাল অপরিবর্তিত থাকে না। শব্দের প্রাচীন ব্যবহার, ধর্মীয় তাৎপর্য এবং বৃহত্তর সামাজিক পরিচয় হিসেবে তার প্রতিষ্ঠা—এই তিনটি বিষয়কে আলাদা করে অনুসন্ধান করা প্রয়োজন।
পিটার হীশের গবেষণা আমাদের সেই অনুসন্ধানের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিশা দেখায়। তাঁর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ‘সনাতন ধর্ম’ প্রাচীন শব্দ হলেও হিন্দুধর্মের সমার্থক সাধারণ নাম হিসেবে এর সুস্পষ্ট ব্যবহার ঊনবিংশ শতকের শেষভাগে দেখা যায়। ১৮৭০ সালের আগের মুদ্রিত উপাদানে এ অর্থের প্রমাণ অত্যন্ত সীমিত। তবে তাঁর অনুসন্ধানের সীমাবদ্ধতাও মনে রাখতে হবে; নতুন নথি আবিষ্কৃত হলে ইতিহাসের এই আলোচনায় নতুন তথ্য যুক্ত হতে পারে।
অতএব, এই পর্বের সিদ্ধান্ত কোনও ধর্মীয় বিশ্বাসকে অস্বীকার করা নয়। বরং একটি পরিচয়ের ইতিহাসকে প্রমাণ, প্রেক্ষাপট ও সতর্কতার সঙ্গে বোঝা।
‘সনাতন ধর্ম’ শব্দবন্ধটি প্রাচীন—কিন্তু হিন্দুধর্মের সমার্থক বৃহত্তর পরিচয় হিসেবে এর প্রতিষ্ঠার ইতিহাস মূলত আধুনিক যুগের, বিশেষত ঊনবিংশ শতকের শেষভাগের সঙ্গে যুক্ত। এই দুই সত্যকে একসঙ্গে বুঝতে পারলেই শব্দটির ইতিহাস সম্পর্কে আরও নির্ভুল ধারণা পাওয়া সম্ভব।
এই পর্বের সূত্র
১। পিটার হীশ, ‘চিরন্তন ধর্মের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস: সনাতন ধর্মের ঐতিহাসিক বংশপরম্পরা’, আন্তর্জাতিক হিন্দুধর্ম অধ্যয়ন পত্রিকা, ২০২৫। গবেষণাপত্রটি ২০২৪ সালের ২৫ অক্টোবর অনলাইনে প্রকাশিত হয়েছিল।
২। ক্যাথরিন ক্লেমঁতা-ওঝা, ‘সনাতনধর্মমার্তণ্ড: আধুনিক হিন্দুধর্মের ইতিহাসচর্চার একটি উৎস’, ২০২০। ঊনবিংশ শতকের শেষভাগে ‘সনাতন ধর্ম’ পরিচয়ের বিকাশ নিয়ে গবেষণা।
৩। পণ্ডিত গুরুসহায়, ‘সনাতন ধর্মমার্তণ্ড’, ১৮৭৭। ধর্মীয় গ্রন্থের ব্যাখ্যা ও ঐতিহ্যগত ধর্মীয় শিক্ষার একটি ঐতিহাসিক নিদর্শন।
৪। ঊনবিংশ শতকের শেষভাগে ভারতীয় ধর্মীয় পরিচয়, সমাজসংস্কার, ঐতিহ্য রক্ষা এবং সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদের বিকাশবিষয়ক গবেষণা।
পরবর্তী পর্ব
পর্ব ১৯ — ‘সনাতনী’ পরিচয়ের উত্থান
ঊনবিংশ ও বিংশ শতকে ‘সনাতনী’ পরিচয় কীভাবে বিকশিত হল? আর্যসমাজ ও ব্রাহ্মসমাজের সংস্কারবাদী চিন্তা, ঐতিহ্য রক্ষার আন্দোলন, ধর্মীয় সংগঠন এবং জাতীয়তাবাদের সঙ্গে এই পরিচয়ের সম্পর্ক কী ছিল?
কেন কিছু মানুষ নিজেদের পরিচয়ে ‘সনাতনী’ শব্দটিকে গুরুত্ব দিতে শুরু করলেন? এই পরিচয় কি শুধু প্রাচীন ঐতিহ্য রক্ষার দাবি, নাকি আধুনিক সমাজে ধর্মীয় পরিচয় ও মতাদর্শের বিতর্কের সঙ্গেও যুক্ত?
পরবর্তী পর্বে থাকবে সেই অনুসন্ধান।
— লিখছেন অনিরুদ্ধ পাল
“বিশ্বাসের প্রতি শ্রদ্ধা, ইতিহাসের প্রতি দায়বদ্ধতা।”
Published on: অক্টো ২৮, ২০২৬ at ১৭:২৮




