
Published on: অক্টো ৭, ২০২৬ at ১৭:২৩
এসপিটি নিউজ, কলকাতা, ৭ অক্টোবর: বিমান জ্বালানির দাম লাগাতার বাড়তে থাকায় দেশের বিমানযাত্রীদের জন্য আরও ব্যয়বহুল হতে চলেছে বিমানযাত্রা। জ্বালানি খরচের চাপ সামলাতে দেশের অন্যতম বড় বিমান সংস্থা ইন্ডিগো দেশীয় ও আন্তর্জাতিক উড়ানের ক্ষেত্রে নতুন করে জ্বালানি খরচ নির্ধারণ করেছে। ৬ অক্টোবর রাত ১২টা ১ মিনিটের পর করা সমস্ত নতুন টিকিট বুকিংয়ের ক্ষেত্রে এই নতুন খরচ কার্যকর হয়েছে।
দেশীয় উড়ানের ক্ষেত্রে যাত্রাপথের দূরত্ব অনুযায়ী নতুন জ্বালানি খরচ ৩৭৫ টাকা থেকে ১,৩০০ টাকা পর্যন্ত রাখা হয়েছে। ৫০০ কিলোমিটার পর্যন্ত যাত্রায় খরচ ৩৭৫ টাকা, ৫০১ থেকে ১,০০০ কিলোমিটারে ৬০০ টাকা, ১,০০১ থেকে ১,৫০০ কিলোমিটারে ৯০০ টাকা, ১,৫০১ থেকে ২,০০০ কিলোমিটারে ১,১৫০ টাকা এবং ২,০০০ কিলোমিটারের বেশি দূরত্বের ক্ষেত্রে ১,৩০০ টাকা নেওয়া হবে।
আন্তর্জাতিক উড়ানের ক্ষেত্রেও খরচ বেড়েছে। সার্কভুক্ত অঞ্চলে ৫০০ কিলোমিটার পর্যন্ত যাত্রায় ১,০০০ টাকা এবং তার বেশি দূরত্বে ৩,০০০ টাকা জ্বালানি খরচ ধার্য করা হয়েছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদভুক্ত দেশ ও মধ্যপ্রাচ্য এবং উত্তর ও পূর্ব এশিয়ার গন্তব্যগুলির জন্য ৫,৫০০ টাকা করে নেওয়া হবে। আফ্রিকার ক্ষেত্রে এই খরচ ৬,০০০ টাকা এবং ইউরোপের ক্ষেত্রে ১০,০০০ টাকা।
ইন্ডিগোর এই সিদ্ধান্তের পিছনে রয়েছে বিমান জ্বালানির ধারাবাহিক মূল্যবৃদ্ধি। সংস্থাটির বক্তব্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক মাসগুলিতে বিমান জ্বালানির দাম অস্থির রয়েছে এবং গত মাসের তুলনায় চলতি মাসে এর দাম ১৪ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে। এর ফলে বিমান জ্বালানির খরচ গত প্রায় এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছেছে বলে সংস্থাটি জানিয়েছে।
বিমান সংস্থাগুলির মোট পরিচালন ব্যয়ের একটি বড় অংশ জ্বালানির পিছনে চলে যায়। ফলে জ্বালানির দামে বড় পরিবর্তন হলে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে বিমান সংস্থাগুলির ব্যয়ের উপর। ইন্ডিগোর নতুন জ্বালানি খরচ সেই চাপেরই প্রতিফলন। এর ফলে নতুন করে টিকিট কাটতে যাওয়া যাত্রীদের মোট ভাড়া আগের তুলনায় বাড়তে পারে।
এর মধ্যে পশ্চিম এশিয়ার চলমান অস্থিরতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় বিমান জ্বালানির বাজারেও তার প্রভাব পড়ছে। ভারতীয় বিমান সংস্থাগুলির পরিচালন ব্যয় তাই ক্রমশ বাড়ছে।
পরিস্থিতি সামলাতে কেন্দ্রীয় সরকারও বিষয়টি নিয়ে সক্রিয় হয়েছে। কেন্দ্রীয় অসামরিক বিমান পরিবহণ মন্ত্রী কে রামমোহন নাইডু জানিয়েছেন, বিমান সংস্থা এবং তেল বিপণন সংস্থাগুলির সঙ্গে বিমান জ্বালানির উচ্চমূল্য নিয়ে আলোচনা চলছে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব কমানোর জন্য মূল্য স্থিতিশীলতা তহবিল আবার চালু করা যায় কি না, সেটিও সরকার বিবেচনা করছে।
বিমান জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ার ফলে শুধু যাত্রীদের ভাড়াই বাড়ছে না, বিমান সংস্থাগুলির জন্য কিছু উড়ান চালিয়ে যাওয়া নিয়েও অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে তুলনামূলক কম যাত্রীসংখ্যার বা বেশি জ্বালানি খরচের কিছু পথ ভবিষ্যতে বাণিজ্যিকভাবে কতটা লাভজনক থাকবে, তা নিয়ে বিমান সংস্থাগুলির মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ইন্ডিগোর ক্ষেত্রে এটি চলতি বছরে জ্বালানি খরচ পুনর্নির্ধারণের দ্বিতীয় বড় পদক্ষেপ। এর আগে এপ্রিলেও বিমান জ্বালানির দাম বৃদ্ধির কারণে সংস্থাটি দেশীয় ও আন্তর্জাতিক উড়ানের জ্বালানি খরচ পরিবর্তন করেছিল। মার্চে প্রথমবার এই অতিরিক্ত জ্বালানি খরচ চালু করার পর থেকে জ্বালানির বাজার পরিস্থিতি অনুযায়ী তা পরিবর্তন করা হচ্ছে।
ইন্ডিগোর দাবি, জ্বালানির বাড়তি খরচ পুরোপুরি যাত্রীদের উপর চাপিয়ে না দিয়ে সীমিত পরিমাণে নতুন খরচ নির্ধারণ করা হয়েছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, যাত্রীদের উপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ যাতে খুব বেশি না পড়ে, সেই বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই এই পরিবর্তন করা হয়েছে। বাজার পরিস্থিতির উপর নজর রেখে ভবিষ্যতে প্রয়োজন অনুযায়ী আবারও খরচের কাঠামো পরিবর্তন করা হতে পারে।
তবে যাত্রীদের কাছে এর সরাসরি অর্থ হল, ৬ অক্টোবরের পর নতুন করে টিকিট কাটলে টিকিটের মূল দামের সঙ্গে অতিরিক্ত জ্বালানি খরচ যুক্ত হবে। ফলে বিশেষ করে আন্তর্জাতিক যাত্রার ক্ষেত্রে মোট খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। ইউরোপগামী যাত্রীদের জন্য ১০,০০০ টাকা অতিরিক্ত জ্বালানি খরচ ধার্য হওয়ায় দীর্ঘ দূরত্বের বিদেশযাত্রায় এর প্রভাব আরও বেশি হতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে সামনে শীতকালীন পর্যটনের মরশুম। দুর্গাপুজোর পর থেকেই দেশের বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্র এবং বিদেশি গন্তব্যে ভ্রমণের চাহিদা বাড়তে শুরু করে। ফলে বিমান জ্বালানির দাম যদি দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চস্তরে থাকে, তা হলে পর্যটকদের ভ্রমণ ব্যয়েও তার প্রভাব পড়তে পারে।
বিমানভাড়া বাড়লে শুধু সাধারণ পর্যটক নয়, ভ্রমণ সংস্থা, বিমান টিকিট বিক্রেতা, ব্যবসায়িক যাত্রী এবং বিদেশে কর্মসূত্রে যাতায়াতকারী মানুষও প্রভাবিত হবেন। বিশেষ করে কলকাতার মতো আন্তর্জাতিক বিমান যোগাযোগের উপর নির্ভরশীল শহরের ক্ষেত্রে এই পরিস্থিতি পর্যটন ও বিমান পরিবহণ—দুই ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ।
এই মুহূর্তে তাই নজর রয়েছে বিমান জ্বালানির আন্তর্জাতিক বাজারদর, পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি এবং কেন্দ্রের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। জ্বালানির দাম দ্রুত স্বাভাবিক না হলে অন্য বিমান সংস্থাগুলিও ইন্ডিগোর মতো অতিরিক্ত জ্বালানি খরচ বাড়ানোর পথে হাঁটতে পারে। সে ক্ষেত্রে আগামী দিনে বিমানযাত্রার মোট খরচ আরও বাড়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
ফলে ইন্ডিগোর ৬ অক্টোবরের সিদ্ধান্তকে শুধু একটি বিমান সংস্থার ভাড়া বৃদ্ধির ঘটনা হিসেবে দেখলে পুরো ছবিটি ধরা পড়বে না। এর পিছনে রয়েছে আন্তর্জাতিক তেলের বাজার, পশ্চিম এশিয়ার অস্থিরতা, বিমান জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং ভারতীয় বিমান পরিবহণের ক্রমবর্ধমান পরিচালন ব্যয়ের একটি বড় অর্থনৈতিক চাপ।
Published on: অক্টো ৭, ২০২৬ at ১৭:২৩




