প্রাণের আরাধনায় অখণ্ড সাধনা: সেবাশ্রমে শেষ হল মহোৎসব

Main দেশ ধর্ম ভ্রমণ রাজ্য
শেয়ার করুন

 Published on: জানু ৩০, ২০২৬ at ২০:১৩
Reporter: Aniruddha Pal

এসপিটি নিউজ, বাখারপুর (পূর্ব মেদিনীপুর) ও কলকাতা, ৩০ জানুয়ারি : প্রাণই ধর্ম, প্রাণই সাধনা—এই ভাবনাকে কেন্দ্র করেই টানা ছয়দিন ধরে আধ্যাত্মিক সাধনা, যজ্ঞ, জপ-তপস্যা ও লোকসেবার এক অনন্য মিলনক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল অখণ্ড শ্রী ক্রিয়াযোগ সাধন মন্দির সেবাশ্রম। সমস্ত রীতি-নীতি মেনে গত ২৯ জানুয়ারি, সাধু-সন্ত ও পীঠাধীশদের পবিত্র উপস্থিতিতে সমাপ্ত হল আশ্রমের ২১তম বাৎসরিক মহোৎসব। অনুষ্ঠানের শেষ দিনটি যেন আধ্যাত্মিকতায় পূর্ণ এক তীর্থসম্ভব হয়ে উঠেছিল—যেখানে সাধনা, শৃঙ্খলা ও মানবকল্যাণ একসূত্রে বাঁধা পড়ল।

এই ছয়দিনের মহাযজ্ঞে সেবাশ্রম প্রাঙ্গনে অনুষ্ঠিত হয় শতাবৃত্তি শ্রীশ্রী চণ্ডীপাঠ, গীতা পাঠ, জপ, যজ্ঞ, অষ্টপ্রহর হরিনাম সংকীর্তন, মহাকাল মহামৃত্যুঞ্জয় যজ্ঞ। পাশাপাশি আয়োজিত হয় সাধু ভাণ্ডারা, অন্নদান, কম্বল ও বস্ত্র দান কর্মসূচি। ধর্মীয় অনুষ্ঠানের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে আয়োজন করা হয় অঙ্কন ও নৃত্য প্রতিযোগিতা, নাটক ও শ্রুতি নাটকের মতো কর্মসূচি। দেওয়া হয় গুণীজন সংবর্ধনা—যা এই মহোৎসবকে পরিণত করে এক পূর্ণাঙ্গ সামাজিক-আধ্যাত্মিক মিলনমেলায়।

আশ্রমের প্রতিষ্ঠাতা গুরুজি আচার্য দেবানন্দ শাস্ত্রী বলেন, “আশ্রমের সার্বিক কল্যাণে যারা ভাবেন, দীর্ঘদিন ধরে যারা আমার সঙ্গে যুক্ত, আজ তাঁরা সবাই এখানে উপস্থিত। দেবী জগজ্জননী জগদম্বা শ্রীশ্রী মা কনকেশ্বরী এবং বাবা কালভৈরব শ্রীশ্রী নেগেশ্বর মহাদেবের কৃপায়, আপনাদের সকলের সহযোগিতাতেই এই অনুষ্ঠান সুসম্পন্ন হয়েছে।”
অখণ্ড শ্রী ক্রিয়াযোগ সাধন মন্দির সেবাশ্রমের প্রতিষ্ঠাতা গুরুজি আচার্য দেবানন্দ শাস্ত্রী যোগীরাজ শ্যামাচরণ লাহিড়ির দেখানো পথেই নিজের গুরদেবের আদেশে লোকসেবায় মন দিয়েছেন। ঋষিরা বলে গেছেন- “পিতা হ বৈ প্রাণঃ, মাতা হ বৈ প্রাণঃ, পুত্র হ বৈ প্রাণঃ, আচার্য্য হ বৈ প্রাণঃ।“ প্রাণ হতেই প্রাণের উৎপত্তি, আবার প্রাণেই অবস্থান। প্রাণই ধর্ম, কারণ প্রাণই সব কিছু ধারণ করে আছেন। প্রাণই কর্ম, কারণ প্রাণ ছাড়া কোন কর্ম সম্পাদন হয় না। প্রাণই জীব, কারণ প্রাণ চঞ্চল বলে জীবিত। প্রাণই শিব, কারণ তিনিই নিধন কর্তা।  প্রাণই বিষ্ণু, কারণ তিনিই পালন কর্তা। প্রাণই দুর্গা, কারণ তিনিই এই দেহ্রূপ কেল্লা অর্থাৎ দুর্গে বাস করে স্কল দুর্গতিকে নাশ করেন। প্রাণই পুরুষ, কারণ এই দেহ্রূপ পুরে একমাত্র তিনই বাস করেন। তিনিওই এই দেহ ও দেহের বাইরে সর্ব্বত্র বিরাজমান। তিনিই সর্বদর্শী। অতএব, মানুষ হতেই কীট, পতঙ্গ, স্থাবর, জঙ্গম সকলেরই একমাত্র উপাস্য ও ধর্ম এই প্রাণ। এই ক্রিয়াযোগ আশ্রমে গুরুজি সেই ভাবে স্কল জীবের প্রাণকে সম্মান করে চলেছেন তার সাধন-ভজন আর ক্রিয়াযোগের মাধ্যমে। তাদের সেবাতেই নিজেকে সঁপে দিয়েছেন।

অনুষ্ঠানের শেষদিন মঞ্চে দাঁড়িয়ে গুরুজি আচার্য দেবানন্দ শাস্ত্রী আবেগভরে জানান, সারা ভারতবর্ষ থেকে প্রতি বছর সাধু-সন্ত ও পীঠাধীশদের আগমন ঘটে এই আশ্রমে। এবছর শতচণ্ডী যজ্ঞের ব্যস্ততার কারণে কয়েকজন পীঠাধীশকে অনুরোধ করে আসতে না বললেও হিমাচল প্রদেশের সোমবার গিরি মহারাজ সেই অনুরোধ মানেননি। “এক গ্লাস জল পেলেও আমি আসব”—এই সংকল্প নিয়েই তিনি উপস্থিত হন। দীর্ঘ ১৬ বছর ফলাহার করে জীবনযাপন করা এই সাধুর সরলতা ও ত্যাগ উপস্থিত সকলের মন ছুঁয়ে যায়।

জয়রামবাটি থেকে আগত ব্রহ্মচারী বিষ্ণুচৈতন্য মহারাজ বলেন, “অনেক জায়গায় যজ্ঞ দেখেছি, কিন্তু সারাদিন ধরে যজ্ঞ—এটা কোথাও দেখিনি। মহারাজ যে উদ্দেশ্যে এই যজ্ঞ করেছেন, তা যেন দেশ ও দশের কল্যাণে সফল হয়—এই প্রার্থনাই করি।”

রামকৃষ্ণ মিশনের পার্থ মহারাজ আশ্রমের পরিবেশ ও শৃঙ্খলার ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, “এই আশ্রমের ফটকে পা রাখার মুহূর্তেই মনে হয়—এটা একটা তীর্থস্থান। এখানকার ভক্তমণ্ডলী অত্যন্ত শৃঙ্খলাপরায়ণ। মহারাজের নির্দেশ মেনে চলেন। এই শৃঙ্খলা ও ভক্তিভাব অন্যত্র খুব কমই দেখা যায়।”
তিনি আরও উল্লেখ করেন, যজ্ঞস্থলে মহারাজের দেওয়া উপদেশ—‘অন্যের অমঙ্গল কামনা নয়, নিজের শুদ্ধতা ও উন্নতির ভাবনা’—তাঁর কাছে অমূল্য মনে হয়েছে।

স্বামী সাধ্যান্তানন্দ মহারাজ বলেন, “অখণ্ড চণ্ডীর যজ্ঞ চারবার চলতে দেখা আমার কাছে এক বিরল অভিজ্ঞতা। এই যজ্ঞের শুভ প্রভাব শুধু আশ্রমেই নয়, সমগ্র অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়বে। বছরের পর বছর এই যজ্ঞ আরও বিস্তৃত হোক—এই কামনাই করি।”

বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সিআইডি-র প্রাক্তন ইন্সপেক্টর হরেকৃষ্ণ দলুই এলাকার আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতির কথা তুলে ধরে স্থানীয় শিশুদের শিক্ষার জন্য গুরুকুল গড়ে তোলার প্রস্তাব দেন এবং এই উদ্যোগে সর্বতোভাবে সহযোগিতার আশ্বাস দেন।

স্বামী সদানন্দ মহারাজ গুরুজির সঙ্গে নিজের দীর্ঘদিনের সম্পর্কের কথা স্মরণ করে বলেন, “এই আশ্রম গুরুজির একার নয়—এটা সকল ভক্তের। ত্যাগ আর ভক্তির মাধ্যমেই এই আশ্রম গড়ে উঠেছে। গুরুজি নিজের হাতে মাটি কেটে, ইট বয়ে এই আশ্রম নির্মাণ করেছেন—এই ত্যাগ সত্যিই বিরল।”

ছয়দিনের এই মহোৎসব শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়—এ ছিল প্রাণের সাধনা, শৃঙ্খলার শিক্ষা এবং মানবকল্যাণের এক জীবন্ত দর্শন। যজ্ঞের আগুন যেমন চারদিকে তাপ ছড়িয়ে দেয়, তেমনই অখণ্ড শ্রী ক্রিয়াযোগ সেবাশ্রমের এই সাধনা ও ভাবনা ছড়িয়ে দিক সমাজের প্রতিটি স্তরে শুভবোধ ও কল্যাণের আলো। প্রাণের আরাধনাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই তীর্থস্থান আগামী দিনেও ত্যাগ, ভক্তি ও লোকসেবার অনন্য দিশারি হয়ে থাকুক—এই প্রত্যাশাই রইল।

Published on: জানু ৩০, ২০২৬ at ২০:১৩


শেয়ার করুন