পর্ব ১৬ — ‘হিন্দুইজম’ শব্দটি কোথা থেকে এল?

Main দেশ ধর্ম ভ্রমণ রাজ্য
শেয়ার করুন

একটি শব্দের জন্ম, বহু ধর্মীয় পরম্পরার পরিচয় এবং আধুনিক ধর্মধারণার ইতিহাস

Published on: অক্টো ২৪, ২০২৬ at ১৭:১৯

✍️ লিখছেন অনিরুদ্ধ পাল। সংবাদ প্রভাকর টাইমস

এসপিটি বিশেষ প্রতিবেদন: ‘হিন্দু’ আর ‘হিন্দুইজম’—দুটি শব্দের ইতিহাস এক নয়। একটি শব্দের শিকড় প্রাচীন ভূগোল ও মানুষের পরিচয়ের ইতিহাসে; অন্যটি ইংরেজি ভাষায় গড়ে ওঠা তুলনামূলকভাবে আধুনিক একটি ধারণা। এই পার্থক্যটি বুঝতে পারলে ভারতীয় ধর্মীয় পরম্পরার ইতিহাস সম্পর্কে অনেক প্রচলিত ধারণাকে নতুন করে যাচাই করার সুযোগ তৈরি হয়।

আজ আমরা যে ‘হিন্দুইজম’ শব্দটি ব্যবহার করি, তার মধ্যে বৈদিক ঐতিহ্য, উপনিষদের দর্শন, শৈব, বৈষ্ণব ও শাক্ত উপাসনা, বিভিন্ন লোকাচার, ভক্তি আন্দোলন এবং আরও বহু ধর্মীয় ও দার্শনিক ধারা অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু এই সমস্ত ধারার মধ্যে ঐতিহাসিক সম্পর্ক থাকা আর প্রাচীনকাল থেকেই সেগুলি একটি নির্দিষ্ট নামে পরিচিত, সুসংহত ধর্মীয় ব্যবস্থা হিসেবে নিজেদের বুঝত—এই দুটি দাবি এক নয়।

তাহলে প্রশ্ন ওঠে, এত বৈচিত্র্যময় ধর্মীয় পরম্পরাকে এক বৃহত্তর পরিচয়ের মধ্যে বোঝানোর জন্য ‘হিন্দুইজম’ শব্দটি কখন প্রচলিত হলো? এটি কি প্রাচীন ভারতীয়দের নিজেদের ব্যবহৃত কোনও নাম ছিল, নাকি আধুনিক যুগে অন্য এক ভাষা ও বৌদ্ধিক পরিসরে শব্দটির জন্ম হয়েছিল?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে শব্দটির ইতিহাসের পাশাপাশি সেই সময়ের সমাজ, রাজনীতি, ধর্মতত্ত্ব ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগের ইতিহাসও বুঝতে হবে।

‘হিন্দু’ শব্দের ইতিহাস আর ‘হিন্দুইজম’-এর ইতিহাস এক নয়

এই ধারাবাহিকের আগের পর্বগুলিতে আমরা দেখেছি, ‘হিন্দু’ শব্দটির ইতিহাস বহু প্রাচীন। প্রাচীন পারসিক ভাষায় ‘হিন্দুশ’ নামের একটি ভৌগোলিক পরিচয়ের উল্লেখ পাওয়া যায়। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন ভাষায় শব্দটির অর্থ ও ব্যবহার বদলেছে। কোনও কোনও প্রসঙ্গে এটি একটি অঞ্চলের মানুষকে বোঝাত, আবার মধ্যযুগের কিছু লেখায় ধর্মীয় পরিচয় হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছে।

কিন্তু ‘হিন্দু’ শব্দটির প্রাচীন অস্তিত্ব থেকে সরাসরি প্রমাণিত হয় না যে ‘হিন্দুইজম’ নামে একটি সুসংহত ধর্মীয় শ্রেণি তখনই প্রচলিত ছিল।

ঐতিহাসিক অড্রে ট্রুশকের গবেষণায় এই পার্থক্যটি বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে। তাঁর মতে, ‘হিন্দু’ শব্দটি দুই হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে নানা অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। কিন্তু আজকের অর্থে একটি বিস্তৃত ধর্মীয় পরম্পরার নাম হিসেবে এর ব্যবহার তুলনামূলকভাবে সাম্প্রতিক। ইংরেজি ‘হিন্দুইজম’ শব্দটির আবির্ভাবও প্রায় ১৮০০ সালের কাছাকাছি সময়ের ঘটনা।

অর্থাৎ, শব্দটির আধুনিক রূপের ইতিহাস অনুসন্ধান করতে গিয়ে আমাদের প্রাচীন ভারতীয় ধর্মীয় ঐতিহ্যগুলির অস্তিত্ব অস্বীকার করার প্রয়োজন নেই। আবার সেই ঐতিহ্যগুলির প্রাচীনত্ব দেখিয়ে ‘হিন্দুইজম’ শব্দটিকেও একই রকম প্রাচীন বলে ধরে নেওয়া যায় না।

আঠারো শতকের শেষভাগে নতুন একটি শব্দ

‘হিন্দুইজম’ শব্দটির প্রাথমিক ইতিহাস অনুসন্ধান করতে গিয়ে গবেষকেরা আঠারো শতকের শেষভাগে পৌঁছন। ঐতিহাসিক ট্রুশকের গবেষণা অনুযায়ী, ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে যুক্ত ধর্মপ্রচারক চার্লস গ্রান্ট ১৭৮৭ সালে কলকাতা থেকে ইংল্যান্ডে লেখা একটি চিঠিতে ‘হিন্দুইজম’ শব্দটির প্রাচীনতম পরিচিত ব্যবহারগুলির একটি করেন। তখন শব্দটির বানান ছিল ‘হিন্দুইজম’-এর পুরোনো ইংরেজি রূপ।

গ্রান্ট ও তাঁর সমসাময়িক কয়েকজন খ্রিস্টান ধর্মপ্রচারক ভারতীয় ধর্মীয় বিশ্বাস ও আচারকে নিজেদের ধর্মতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বুঝতে এবং খ্রিস্টধর্মের সঙ্গে তুলনা করতে আগ্রহী ছিলেন। তাঁদের লেখায় ভারতীয় ধর্মীয় পরম্পরাকে একটি পৃথক ধর্মীয় ব্যবস্থা হিসেবে চিহ্নিত করার প্রবণতা দেখা যায়।

এই প্রেক্ষাপটে ‘হিন্দুইজম’ শব্দটির জন্ম ও প্রাথমিক ব্যবহারকে বুঝতে হবে। এটি কেবল একটি নতুন শব্দের আবির্ভাব ছিল না; ভারতীয় ধর্মীয় বৈচিত্র্যকে কীভাবে শ্রেণিবদ্ধ করা হবে, তা নিয়েও একটি নতুন বৌদ্ধিক আলোচনা শুরু হয়েছিল।

তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। কোনও শব্দ প্রথম কখন ব্যবহৃত হয়েছিল, তার প্রমাণ পাওয়া আর সেই শব্দটি ঠিক কোন অর্থে ব্যবহৃত হয়েছিল, তা নিশ্চিতভাবে জানা—এক কথা নয়। গ্রান্ট শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন বলেই তিনি আধুনিক হিন্দু ধর্মের সমস্ত ধারণা একাই তৈরি করেছিলেন, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায় না।

রাজা রামমোহন রায় ও শব্দটির ভারতীয় ব্যবহার

‘হিন্দুইজম’ শব্দটির ইতিহাসে রাজা রামমোহন রায়ের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। ট্রুশকের গবেষণা অনুযায়ী, ১৮১৬ সালে রামমোহন রায় তাঁর একটি লেখায় এই শব্দটি ব্যবহার করেন। ভারতীয় ধর্মীয় ঐতিহ্যকে কীভাবে ব্যাখ্যা করা হবে, কোন আচারকে তার অপরিহার্য অংশ বলে গণ্য করা হবে এবং কোন প্রথার সমালোচনা করা উচিত—এসব প্রশ্ন নিয়ে তখন শিক্ষিত ভারতীয় সমাজের মধ্যেও বিতর্ক চলছিল।

রামমোহন রায় ভারতীয় ধর্মীয় ঐতিহ্যের একজন অভ্যন্তরীণ সমালোচক ও সংস্কারক ছিলেন। তিনি একদিকে প্রাচীন ধর্মগ্রন্থের ব্যাখ্যা ও একেশ্বরবাদী চিন্তাকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন, অন্যদিকে জাতিভেদ ও কিছু সামাজিক-ধর্মীয় প্রথার বিরুদ্ধেও মত প্রকাশ করেছিলেন।

তাঁর মতো চিন্তাবিদদের লেখায় নতুন শব্দটির ব্যবহার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। ইউরোপীয় লেখকেরা যে ধারণা নিয়ে আলোচনা শুরু করেছিলেন, ভারতীয় চিন্তাবিদদের একাংশও সেই ধারণাকে গ্রহণ, পুনর্ব্যাখ্যা কিংবা সমালোচনা করতে শুরু করেন।

অর্থাৎ, ‘হিন্দুইজম’ শব্দটির ইতিহাস কেবল ইউরোপীয়দের দেওয়া কোনও নামের ইতিহাস নয়। এটি ভারতীয় ও ইউরোপীয় চিন্তাবিদদের মধ্যে কথোপকথন, মতবিরোধ এবং ধর্মীয় ঐতিহ্যকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করার ইতিহাসও।

এতগুলি ধর্মীয় ধারা এক পরিচয়ের মধ্যে এল কীভাবে?

ভারতীয় ধর্মীয় পরম্পরার ইতিহাসে বৈচিত্র্য দীর্ঘদিনের। বৈদিক আচার ও দর্শন, উপনিষদীয় চিন্তা, শৈব ও বৈষ্ণব উপাসনা, শাক্ত সাধনা, স্মার্ত ঐতিহ্য, ভক্তি আন্দোলন এবং বিভিন্ন আঞ্চলিক ও লোকায়ত প্রথার মধ্যে মিল যেমন রয়েছে, তেমনই রয়েছে মতবাদ, উপাসনা, আচার ও দার্শনিক ব্যাখ্যার পার্থক্য।

সব ধারার মানুষ একই গ্রন্থকে সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব বলে মানেন না। সকলের উপাস্যও এক নয়, ধর্মাচরণের পদ্ধতিও এক নয়। কোথাও ভক্তি মুখ্য, কোথাও জ্ঞান বা দর্শন, কোথাও আচার, কোথাও ব্যক্তিগত সাধনা কিংবা স্থানীয় দেবদেবীর উপাসনা বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।

আধুনিক যুগে ‘হিন্দুইজম’ শব্দটি এই বৈচিত্র্যময় ধারাগুলিকে একটি বৃহত্তর ধর্মীয় শ্রেণির মধ্যে বোঝানোর মাধ্যম হয়ে ওঠে। এর ফলে এমন একটি পরিচিতি গড়ে ওঠে, যার অধীনে বহু ভিন্ন ঐতিহ্যকে একসঙ্গে আলোচনা করা সম্ভব হয়।

কিন্তু এই শ্রেণিবিন্যাসের সুবিধার পাশাপাশি একটি ঝুঁকিও ছিল। একটি বৃহত্তর নামের ব্যবহার কখনও কখনও বিভিন্ন পরম্পরার স্বতন্ত্র ইতিহাস, মতপার্থক্য এবং আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্যকে আড়াল করতে পারে। আবার এই বৃহত্তর পরিচয় বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে আত্মপরিচয় ও ঐক্যবোধ গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখতে পারে।

তাই ‘হিন্দুইজম’ শব্দটির ইতিহাসকে কেবল একটি নামের ইতিহাস হিসেবে দেখলে চলবে না। এর মধ্যে রয়েছে বৈচিত্র্যকে শ্রেণিবদ্ধ করার চেষ্টা, একটি বৃহত্তর পরিচয় নির্মাণের প্রক্রিয়া এবং সেই পরিচয়কে ঘিরে বিতর্কের ইতিহাস।

ইউরোপীয় ধর্মতত্ত্বের প্রভাব কতটা ছিল?

আঠারো ও ঊনবিংশ শতকে ইউরোপীয় লেখক ও পণ্ডিতদের একটি অংশ বিভিন্ন ধর্মকে নির্দিষ্ট ধর্মগ্রন্থ, বিশ্বাস, আচার এবং নৈতিক বিধানের সমন্বয়ে গঠিত সুসংহত ব্যবস্থা হিসেবে বোঝার চেষ্টা করছিলেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি ভারতীয় ধর্মীয় পরম্পরাকে বর্ণনা করার ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলেছিল।

ভারতের ধর্মীয় জীবন কিন্তু সব সময় একই রকম কাঠামোয় সংগঠিত ছিল না। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের নিজস্ব গ্রন্থ, গুরুপরম্পরা, মন্দির, আচার, দার্শনিক মত এবং সামাজিক রীতি ছিল। সেই বৈচিত্র্যকে একটি বৃহত্তর ধর্মের পরিচয়ের অধীনে উপস্থাপন করতে গিয়ে কিছু মিলকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, আবার কিছু পার্থক্যও নতুনভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

ইতিহাসবিদ ব্রায়ান কে. পেনিংটনের Was Hinduism Invented? Britons, Indians, and the Colonial Construction of Religion গ্রন্থটি এই বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করে। তাঁর গবেষণা দেখায়, ঔপনিবেশিক যুগে ব্রিটিশদের ভারতীয় ধর্মীয় ঐতিহ্য বোঝার প্রচেষ্টা এবং ভারতীয়দের নিজস্ব ব্যাখ্যা ও প্রতিক্রিয়া—দুইয়ের পারস্পরিক সংযোগের মধ্যেই আধুনিক ‘হিন্দুইজম’ ধারণার বিকাশকে দেখতে হবে। ব্রিটিশরা একতরফাভাবে একটি ধর্ম তৈরি করেছিল—এমন ব্যাখ্যা ভারতীয়দের নিজস্ব ধর্মীয় পরিচয় ও ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতাকে যথাযথ গুরুত্ব দেয় না। রএখানে আরও একটি পার্থক্য স্পষ্ট করা দরকার। ‘হিন্দুইজম’ শব্দটি আধুনিক যুগে প্রচলিত হয়েছে বলেই যে শব্দটির অধীনে আলোচিত সমস্ত ধর্মীয় ঐতিহ্যও তখনই সৃষ্টি হয়েছিল, তা নয়। বৈদিক, শৈব, বৈষ্ণব, শাক্ত এবং অন্যান্য পরম্পরার ইতিহাস এই শব্দটির আধুনিক প্রচলনের বহু আগের।

একইভাবে, সেই পরম্পরাগুলির প্রাচীন ইতিহাস থাকলেই যে আধুনিক বৃহত্তর পরিচয়টির নাম ও সীমানা সব যুগে একই ছিল, সেটিও প্রমাণিত হয় না।

‘হিন্দুইজম’ কি শুধুই বাইরের দেওয়া নাম?

এই প্রশ্নের উত্তরও সরল ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ দিয়ে দেওয়া যায় না।

শব্দটির প্রাথমিক প্রচলনে ইউরোপীয় লেখক ও ধর্মপ্রচারকদের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ঊনবিংশ শতকে ভারতীয় চিন্তাবিদ, ধর্মীয় সংস্কারক ও লেখকেরাও শব্দটি ব্যবহার করতে শুরু করেন। তাঁরা কেউ ভারতীয় ধর্মীয় ঐতিহ্যকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করেছেন, কেউ তার সমালোচনা করেছেন, কেউ আবার তার পক্ষে যুক্তি দিয়েছেন।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শব্দটি ভারতীয় সমাজের মধ্যেও বৃহত্তর ধর্মীয় আত্মপরিচয়ের অংশ হয়ে ওঠে। অর্থাৎ, শব্দটির জন্মের ইতিহাস এবং পরবর্তী সময়ে ভারতীয় মানুষের মধ্যে তার গ্রহণযোগ্যতা অর্জনের ইতিহাস আলাদা করে দেখতে হবে।

কোনও পরিচয়ের নাম বাইরে থেকে প্রচলিত হতে পারে, কিন্তু পরে সেই পরিচয় সংশ্লিষ্ট সমাজের মানুষের কাছে অর্থপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তখন তারা সেই পরিচয়কে নিজেদের মতো করে ব্যাখ্যা, গ্রহণ কিংবা পরিবর্তনও করতে পারেন। ‘হিন্দুইজম’ শব্দটির ইতিহাসেও এই ধরনের পারস্পরিক প্রভাব লক্ষ করা যায়।

তাহলে ‘সনাতন ধর্ম’ ও ‘হিন্দুইজম’ কি একই?

আজকের ব্যবহারে অনেকেই ‘সনাতন ধর্ম’ ও ‘হিন্দুইজম’ শব্দ দুটিকে একই ধর্মীয় ঐতিহ্যের পরিচয় হিসেবে ব্যবহার করেন। অন্যদিকে, কেউ কেউ ‘সনাতন ধর্ম’ নামটিকে বিশেষভাবে পছন্দ করেন, কারণ এর মধ্যে তাঁদের কাছে চিরন্তন ধর্মনীতি, প্রাচীন ঐতিহ্য ও আধ্যাত্মিক ধারাবাহিকতার ভাব প্রকাশ পায়।

কিন্তু ইতিহাসের দৃষ্টিতে শব্দ দুটির ব্যবহার ও বিকাশের পথ এক ছিল—এমন ধরে নেওয়া ঠিক নয়। ‘সনাতন’ শব্দের প্রাচীন ব্যবহার এবং ‘হিন্দুইজম’ শব্দের আধুনিক প্রচলন দুটি পৃথক ঐতিহাসিক প্রশ্ন।

‘সনাতন ধর্ম’ কথাটির বিভিন্ন প্রাচীন পাঠে ব্যবহার পাওয়া গেলেই প্রমাণিত হয় না যে তা সর্বত্র, সব যুগে, আজকের অর্থে একটি বৃহত্তর ধর্মীয় শ্রেণির একমাত্র বা সর্বজনস্বীকৃত নাম ছিল। একইভাবে ‘হিন্দুইজম’ শব্দটির আধুনিক ইতিহাস তুলে ধরলেও তার অধীনে আজ আলোচিত প্রাচীন ধর্মীয় ঐতিহ্যগুলির অস্তিত্ব অস্বীকার করা যায় না।

এই ধারাবাহিকের মূল অনুসন্ধানও কোনও নামকে শ্রেষ্ঠ বা নিকৃষ্ট প্রমাণ করা নয়। লক্ষ্য হলো—কোন শব্দ কখন, কোন প্রেক্ষাপটে এবং কী অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে, তা ইতিহাসের সূত্র ধরে বোঝা।

ইতিহাসের শিক্ষা: নামের ইতিহাস আর বিশ্বাসের ইতিহাস আলাদা

‘হিন্দুইজম’ শব্দটির ইতিহাস আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। ধর্মীয় ঐতিহ্য বহু শতাব্দী ধরে নানা আচার, দর্শন, উপাসনা, সাধনা ও সামাজিক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গড়ে উঠতে পারে। সেই ঐতিহ্যকে বোঝানোর জন্য ব্যবহৃত বৃহত্তর নামটি তার অনেক পরে প্রচলিত হতে পারে।

শব্দের ইতিহাস জানার অর্থ বিশ্বাসকে অস্বীকার করা নয়। বরং বিশ্বাসের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই তার ইতিহাসকে আরও নির্ভুলভাবে বোঝা সম্ভব।

তাই ‘হিন্দু’ ও ‘হিন্দুইজম’-এর পার্থক্য বুঝতে গেলে তিনটি বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন: প্রথমত, ‘হিন্দু’ শব্দের ইতিহাস প্রাচীন এবং তার অর্থ সময়ের সঙ্গে বদলেছে; দ্বিতীয়ত, ইংরেজি ‘হিন্দুইজম’ শব্দটি আঠারো শতকের শেষভাগে পরিচিত হতে শুরু করে এবং ঊনবিংশ শতকে ব্যাপক প্রচলন লাভ করে; তৃতীয়ত, এই আধুনিক বৃহত্তর পরিচয়ের বিকাশে ইউরোপীয় লেখক ও ঔপনিবেশিক পরিসরের পাশাপাশি ভারতীয় চিন্তাবিদদেরও ভূমিকা ছিল।

এই ইতিহাস কোনও একক আবিষ্কারকের কাহিনি নয়। এটি একটি শব্দের জন্ম, বহু পুরোনো ধর্মীয় পরম্পরার নতুন শ্রেণিবিন্যাস এবং সেই শ্রেণিবিন্যাসকে ঘিরে ভারতীয় ও ইউরোপীয় চিন্তার দীর্ঘ কথোপকথনের ইতিহাস।

এই পর্বের সূত্র
  1. অড্রে ট্রুশকে, ‘হিন্দু: একটি ইতিহাস’, তুলনামূলক সমাজ ও ইতিহাস অধ্যয়ন পত্রিকা, কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশনা, ২০২৩।
  2. ব্রায়ান কে. পেনিংটন, ‘হিন্দুইজম কি উদ্ভাবিত হয়েছিল? ব্রিটিশ, ভারতীয় এবং ঔপনিবেশিক যুগে ধর্মের নির্মাণ’, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশনা, ২০০৫।
  3. চার্লস গ্রান্টের ১৭৮৭ সালের চিঠি ও আঠারো শতকের শেষভাগে ‘হিন্দুইজম’ শব্দের প্রাথমিক ব্যবহার বিষয়ে ঐতিহাসিক গবেষণা।
  4. ঊনবিংশ শতকের প্রথম ভাগে রাজা রামমোহন রায়ের লেখায় ‘হিন্দুইজম’ শব্দের ব্যবহার বিষয়ে গবেষণা।
  5. ঔপনিবেশিক যুগে ভারতীয় ধর্মীয় গ্রন্থ, বিশ্বাস ও আচারকে শ্রেণিবদ্ধ করার ইতিহাসবিষয়ক গবেষণা।
পরবর্তী পর্ব

পর্ব ১৭ — ব্রিটিশরা কি ‘হিন্দুইজম’ তৈরি করেছিল?

“ব্রিটিশরা হিন্দু ধর্ম বানিয়েছিল”—এটি অতিসরলীকরণ।

কিন্তু ঔপনিবেশিক প্রশাসন, জনগণনা, আইন, শিক্ষা, মুদ্রণ এবং ইউরোপীয় ধর্মতত্ত্ব কীভাবে ‘হিন্দুইজম’-কে একটি সুসংহত শ্রেণি হিসেবে প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখল—সেটিই হবে পরবর্তী পর্বের মূল অনুসন্ধান।

— লিখছেন অনিরুদ্ধ পাল

“বিশ্বাসের প্রতি শ্রদ্ধা, ইতিহাসের প্রতি দায়বদ্ধতা।”

Published on: অক্টো ২৪, ২০২৬ at ১৭:১৯


শেয়ার করুন