পর্ব ১০ — গীতায় ‘সনাতন’ ও ‘ধর্ম’

Main দেশ ধর্ম রাজ্য
শেয়ার করুন

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ১১.১৮: ‘শাশ্বতধর্মগোপ্তা সনাতনস্ত্বং পুরুষো…’—এখানে ‘সনাতন’ কাকে বলা হয়েছে? ‘শাশ্বত ধর্ম’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
Published on: অক্টো ১৪, ২০২৬ at ২১:৪১
লিখছেন অনিরুদ্ধ পাল। সংবাদ প্রভাকর টাইমস

এসপিটি বিশেষ প্রতিবেদন: ‘সনাতন ধর্ম’—আজকের ভারতীয় সমাজে পরিচিত একটি ধর্মীয় পরিচয়। কিন্তু প্রাচীন ধর্মগ্রন্থে ‘সনাতন’ এবং ‘ধর্ম’ শব্দের ব্যবহার বুঝতে গেলে শুধু শব্দ দুটির বর্তমান অর্থ জানলেই চলে না। দেখতে হয়, কোন গ্রন্থে, কোন প্রসঙ্গে এবং কাকে উদ্দেশ করে এই শব্দগুলি ব্যবহৃত হয়েছে।

এই ধারাবাহিকের আগের পর্বগুলিতে আমরা ঋগ্বেদ, উপনিষদ, মহাভারত এবং মনুস্মৃতিতে ‘ধর্ম’ ও ‘সনাতন’ শব্দের ব্যবহার নিয়ে আলোচনা করেছি। এবার আমাদের অনুসন্ধানের বিষয় শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা। গীতার একাদশ অধ্যায়ের অষ্টাদশ শ্লোকে এমন একটি অভিব্যক্তি রয়েছে, যা এই আলোচনার ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ—‘শাশ্বতধর্মগোপ্তা’ এবং ‘সনাতনস্ত্বং পুরুষো’।

কিন্তু এই শ্লোকের প্রকৃত অর্থ কী? এখানে ‘সনাতন’ কাকে বলা হয়েছে? ‘শাশ্বত ধর্ম’ বলতে কি কোনও নির্দিষ্ট ধর্মসম্প্রদায়ের নাম বোঝানো হয়েছে, নাকি অন্য কোনও দার্শনিক ধারণা প্রকাশ পেয়েছে?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে প্রথমেই ফিরে যেতে হবে গীতার মূল শ্লোকে।

গীতার একাদশ অধ্যায়ের অষ্টাদশ শ্লোক

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার একাদশ অধ্যায়ে অর্জুন শ্রীকৃষ্ণের বিশ্বরূপ দর্শন করছেন। সেই অসাধারণ রূপ দেখে বিস্মিত ও অভিভূত অর্জুন শ্রীকৃষ্ণের মহিমা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন—

“ত্বমক্ষরং পরমং বেদিতব্যং
ত্বমস্য বিশ্বস্য পরং নিধানম্।
ত্বমব্যয়ঃ শাশ্বতধর্মগোপ্তা
সনাতনস্ত্বং পুরুষো মতঃ মে॥”

এই শ্লোকের একটি সহজ বাংলা ভাবানুবাদ হল—

“আপনিই পরম ব্রহ্ম এবং একমাত্র জ্ঞাতব্য। আপনি বিশ্বের পরম আশ্রয়। আপনি অব্যয়, সনাতন ধর্মের রক্ষক এবং সনাতন পরম পুরুষ। এই আমার অভিমত।”

এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়। শ্লোকটি অর্জুনের মুখে উচ্চারিত। তিনি শ্রীকৃষ্ণের বিশ্বরূপ দর্শনের পর তাঁকে পরম ব্রহ্ম, অবিনশ্বর, বিশ্বজগতের আশ্রয় এবং সনাতন ধর্মের রক্ষক হিসেবে বর্ণনা করছেন। অর্থাৎ, এই শ্লোকে ‘সনাতন’ শব্দটি সরাসরি শ্রীকৃষ্ণকে নির্দেশ করছে। একই সঙ্গে ‘শাশ্বতধর্মগোপ্তা’ শব্দের মাধ্যমে তাঁকে শাশ্বত ধর্মের রক্ষক বলা হয়েছে।

এই দুটি অভিব্যক্তিকে আলাদা করে বোঝা জরুরি।

‘সনাতন’ কাকে বলা হয়েছে?

শ্লোকের শেষাংশ—‘সনাতনস্ত্বং পুরুষো মতঃ মে’—এর সাধারণ অর্থ, “আমার মতে, আপনিই সনাতন পুরুষ।”

এখানে ‘সনাতন’ শব্দটির অর্থ চিরন্তন, নিত্য বা অনাদি-অনন্ত। ‘পুরুষ’ শব্দটি এই প্রসঙ্গে পরম সত্তা বা মহাজাগতিক পুরুষকে নির্দেশ করে বলে বহু ব্যাখ্যায় বোঝানো হয়েছে। গীতার এই অংশে ‘সনাতন’ কোনও ধর্মসম্প্রদায়ের নাম হিসেবে ব্যবহৃত হয়নি। শব্দটি শ্রীকৃষ্ণের চিরন্তন সত্তা বা স্বরূপের বিশেষণ হিসেবে এসেছে। তবে এখান থেকে এমন সিদ্ধান্তও টানা ঠিক হবে না যে প্রাচীন সাহিত্যে ‘সনাতন ধর্ম’ শব্দবন্ধের কোনও ব্যবহার ছিল না। একটি শ্লোকে শব্দটির নির্দিষ্ট ব্যবহার কী, আর বৃহত্তর সাহিত্যে শব্দবন্ধটির ইতিহাস কী—এ দুটি আলাদা প্রশ্ন।

আমাদের অনুসন্ধানের মূল লক্ষ্যও তাই কোনও বিশ্বাসকে অস্বীকার করা নয়; বরং মূল পাঠে শব্দগুলি ঠিক কী অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে, তা বোঝা।

‘শাশ্বতধর্মগোপ্তা’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে?

শ্লোকের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল ‘শাশ্বতধর্মগোপ্তা’। শব্দটিকে ভেঙে দেখলে পাওয়া যায়—‘শাশ্বত’, অর্থাৎ চিরস্থায়ী বা চিরন্তন; ‘ধর্ম’, যার অর্থ প্রসঙ্গভেদে কর্তব্য, নীতি, বিধান, নৈতিক শৃঙ্খলা বা জীবনধারণের আদর্শ হতে পারে; এবং ‘গোপ্তা’, অর্থাৎ রক্ষক বা সংরক্ষণকারী।

এই অর্থে ‘শাশ্বতধর্মগোপ্তা’ বলতে শাশ্বত ধর্মের রক্ষক বা চিরন্তন নীতি ও বিধানের সংরক্ষক বোঝানো যেতে পারে। কিন্তু ‘ধর্ম’ শব্দটির অর্থ সব যুগে, সব গ্রন্থে এবং সব প্রসঙ্গে এক ছিল না। কখনও তা কর্তব্য, কখনও নৈতিক আচরণ, কখনও সামাজিক বিধান, আবার কখনও বৃহত্তর বিশ্বব্যবস্থা বা আধ্যাত্মিক সত্যের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়েছে। গীতার এই শ্লোকে অর্জুন শ্রীকৃষ্ণের বিশ্বরূপের মহিমা বর্ণনা করছেন। তাই ‘শাশ্বতধর্মগোপ্তা’ কথাটিকে এই ভক্তিমূলক ও দার্শনিক প্রসঙ্গের মধ্যেই বিচার করা প্রয়োজন।  শুধু শব্দটির আধুনিক ব্যবহার দেখে একে একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় পরিচয়ের নাম বলে ধরে নেওয়া মূল পাঠের প্রতি সুবিচার হবে না।

তাহলে কি গীতায় ‘সনাতন ধর্ম’ নেই?

এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সময় দুটি বিষয় আলাদা করে দেখা দরকার।

প্রথমত, গীতার একাদশ অধ্যায়ের অষ্টাদশ শ্লোকে ‘সনাতন’ শব্দটি শ্রীকৃষ্ণকে বর্ণনা করতে ব্যবহৃত হয়েছে এবং ‘শাশ্বতধর্মগোপ্তা’ শব্দের মাধ্যমে তাঁকে শাশ্বত ধর্মের রক্ষক বলা হয়েছে। এই শ্লোকের সরাসরি বক্তব্যে ‘সনাতন ধর্ম’ কোনও ধর্মসম্প্রদায়ের নাম হিসেবে উপস্থিত নয়।

দ্বিতীয়ত, একটি শ্লোকের ভিত্তিতে গোটা গীতার ভাষা, ভাবনা বা পরবর্তী ধর্মীয় ঐতিহ্যের ইতিহাস সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। তার জন্য গীতার অন্যান্য শ্লোক, বিভিন্ন ভাষ্য, অন্যান্য প্রাচীন গ্রন্থ এবং পরবর্তী কালের ধর্মীয় পরিভাষার বিকাশও বিচার করতে হয়।

সুতরাং, এই শ্লোককে ‘সনাতন ধর্ম’ নামের একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় পরিচয়ের প্রাচীনতম বা চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করার আগে তার ভাষা ও প্রসঙ্গের যথাযথ ব্যাখ্যা প্রয়োজন।

আবার এই শ্লোকের মধ্যে ‘সনাতন ধর্ম’ শব্দবন্ধটি ধর্মপরিচয়ের নাম হিসেবে নেই বলে বৃহত্তর ঐতিহ্যে এই শব্দবন্ধের গুরুত্বও অস্বীকার করা যায় না। ঐতিহাসিক অনুসন্ধানে কোনও শব্দের প্রাচীন ব্যবহার এবং পরবর্তী কালে সেই শব্দের পরিচয়গত অর্থে প্রতিষ্ঠিত হওয়া—দুটি বিষয়ই আলাদা করে দেখা উচিত।

বিশ্বাস, দর্শন ও ইতিহাসের মধ্যে পার্থক্য

গীতা হিন্দু ধর্মীয় ও দার্শনিক ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ। বহু মানুষের কাছে এর বক্তব্য আধ্যাত্মিক বিশ্বাস, নৈতিক জীবন ও ঈশ্বরচিন্তার পথনির্দেশক।

কিন্তু কোনও গ্রন্থের ধর্মীয় গুরুত্ব এবং সেখানে ব্যবহৃত একটি শব্দের ঐতিহাসিক অর্থ একই প্রশ্ন নয়। বিশ্বাসের জায়গা থেকে কেউ গীতার বক্তব্যকে চিরন্তন ধর্মের প্রকাশ হিসেবে গ্রহণ করতে পারেন। অন্যদিকে ইতিহাস ও ভাষার গবেষণায় দেখতে হয়, মূল পাঠে কোন শব্দটি কীভাবে ব্যবহৃত হয়েছে এবং সেই ব্যবহার থেকে কত দূর পর্যন্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায়।

এই দুই দৃষ্টিভঙ্গিকে গুলিয়ে না ফেলাই জরুরি।

গীতার একাদশ অধ্যায়ের অষ্টাদশ শ্লোক আমাদের দেখায়, ‘সনাতন’ শব্দটি শ্রীকৃষ্ণের চিরন্তন স্বরূপ বর্ণনা করতে ব্যবহৃত হয়েছে এবং ‘শাশ্বত ধর্ম’ তাঁর রক্ষকসত্তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। কিন্তু এই ব্যবহারকে সরাসরি আধুনিক অর্থে ‘সনাতন ধর্ম সমগ্র হিন্দুধর্মের নাম’—এই দাবির সমতুল্য ধরে নেওয়া যায় না।

একটি শব্দের ইতিহাস বুঝতে হলে তার প্রাচীন পাঠ, ব্যাকরণ, প্রসঙ্গ এবং সময়ের সঙ্গে অর্থের পরিবর্তন—সবকিছুকেই গুরুত্ব দিতে হয়।

এই ধারাবাহিকের পরবর্তী পর্বে আমরা দেখব, বিভিন্ন পুরাণে ‘সনাতন’, ‘ধর্ম’ এবং ‘সনাতন ধর্ম’ শব্দগুলির ব্যবহার কীভাবে এসেছে। বৈষ্ণব, শৈব ও শাক্ত পরম্পরার সঙ্গে এই শব্দগুলির সম্পর্কও সেখানে আলোচনার বিষয় হবে।

এই পর্বের সূত্র
১. শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা, একাদশ অধ্যায়, অষ্টাদশ শ্লোক।
২. শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার সংস্কৃত মূলপাঠ—শ্লোকের শব্দার্থ ও ব্যাকরণগত গঠন যাচাইয়ের জন্য।
৩. গীতার প্রাচীন ও প্রচলিত ভাষ্যসমূহ—‘সনাতন’, ‘শাশ্বত ধর্ম’ এবং ‘পুরুষ’ শব্দের ব্যাখ্যা তুলনা করার জন্য।

পরবর্তী পর্ব

পর্ব ১১ — পুরাণে সনাতন ধর্ম

বিভিন্ন পুরাণে ‘সনাতন’, ‘ধর্ম’, ‘সনাতন ধর্ম’ ব্যবহারের প্রকৃতি।

বৈষ্ণব, শৈব, শাক্ত—বিভিন্ন ধারার সঙ্গে এর সম্পর্ক।

— লিখছেন অনিরুদ্ধ পাল

“বিশ্বাসের প্রতি শ্রদ্ধা, ইতিহাসের প্রতি দায়বদ্ধতা।”

Published on: অক্টো ১৪, ২০২৬ at ২১:৪১


শেয়ার করুন