প্রাণী পালন কৃষির পরেই স্বনির্ভর হওয়ার সবচেয়ে বড় জায়গা- বললেন মন্ত্রী স্বপন দেবনাথ

Main দেশ প্রাণী ও মৎস্য বিজ্ঞান রাজ্য
শেয়ার করুন

Published on: জুলা ২২, ২০২৪ at ২০:৫০
বক্তা পশ্চিমবঙ্গ সরকারের প্রাণিসম্পদ বিকাশ বিভাগের মন্ত্রী স্বপন দেবনাথ
Reporter: Aniruddha Pal

এসপিটি নিউজ, কলকাতা, ২২ জুলাই: “ কৃষির পরে প্রাণী কিংবা মৎস্য পালন কর্মসংস্থানের সবচেয়ে বিরাট যোগ আছে। ইতিমধ্যে কেন্দ্র ও রাজ্য উভয়ই এগিয়ে এসেছে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছেন প্রাণী পালনের মাধ্যমে যাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ বেশি হয়।প্রাণী পালন কৃষির পরেই স্বনির্ভর হওয়ার সবচেয়ে বড় জায়গা।“ সোমবার পশ্চিমবঙ্গ প্রাণী ও মৎস্য বিজ্ঞান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্ত “বায়োটেক কিসান হাব প্রকল্পে”র দ্বারা আয়োজিত রাজ্যের পাঁচটি সম্ভাবনাময় জেলায় নির্বাচিত প্রান্তিক কৃষকদের সাহায্যে কৃষক বিজ্ঞানী সংযোগ ও প্রাণী সহায়তার এক অনুষ্ঠানে উপস্থিত এই কথাগুলি বলেন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের প্রাণী সম্পদ বিকাশ মন্ত্রী স্বপন দেবনাথ।

মন্ত্রী স্বপন দেবনাথ এদিন বলেন- বিজ্ঞানটা পৌঁছে যাক মানুষের কাছে। এতে দুটো সুবিধা হচ্ছে – এক, কর্মসংস্থান হচ্ছে। কৃষির পরে প্রাণী কিংবা মৎস্য পালন কর্মসংস্থানের সবচেয়ে বিরাট যোগ আছে। ইতিমধ্যে কেন্দ্র ও রাজ্য উভয়ই এগিয়ে এসেছে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছেন প্রাণী পালনের মধ্যে যাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ বেশি হয়। প্রাণীপালনের মধ্যে দিয়ে আয় সুনিশ্চিত করতে হবে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী এটা চাইছেন। স্বনির্ভরতার লক্ষ্যে প্রাণী পালন কৃষির পরেই স্বনির্ভর হওয়ার সবচেয়ে বড় জায়গা।

বাস্তব অভিজ্ঞতায় কাজ করতে গিয়ে দেখেছি মাছ, ছাগল, মুরগি বিলি হচ্ছে । মানুষের আয়ও বেড়েছে এটাও ঠিক। দুটো উদ্দেশ্য সাধিত হয়- একদিকে, মানুষের শরীরে প্রোটিন যেটার জন্য দরকার মাছ, দুধ, মাংস। একটা রিপোর্ট আছে প্রতি বছরে কটা ডিম মানুষের দরকার। কতটা মাছ, কতটা মাংস দরকার। তাই মাছ, মাংসের, উৎপাদন যদি বাড়াতে না পারি সেই জায়গায় কিন্তু আমরা পৌঁছতে পারব না। মুরগির ছানা, ডিম পাড়া, মুরগি যাতে উৎপাদন হয় তার প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। তেমনি মাছের চারা পূরণের চেষ্টা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা করে, তার প্রয়োগ যাতে হতে পারে তার ব্যবস্থা করে কিন্তু আরও ব্যপকতা দরকার। আমি কেশব ধারাকে ধন্যবাদ জানাই তার এমন উদ্যোগ নেওয়ার জন্য। যোগ করেন মন্ত্রী স্বপন দেবনাথ।

এরপরেই মন্ত্রী স্বপন দেবনাথ মঞ্চে বসে থাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক শ্যাম সুন্দর দানা ও কেশব চন্দ্র ধারাকে উদ্দেশ্য করে বলেন- “আমার দুটো প্রস্তাব অনেকদিন ধরেই পড়ে আছে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে। এখানে উপাচার্য এবং কেসি ধারা রয়েছেন। আমি বলেছিলাম- পুরুলিয়াতে অযোধায় পাহাড়কে কেন্দ্র করে আমরা বনরাজ মুরগি চাষ করছি সুন্দরবনে কিন্তু কালো ছাগলের পক্ষে সবচেয়ে ভাল উপযোগী জায়গা হল পুরুলিয়ার অযোধ্যা পাহাড়। সেখানে যদি বিশ্ববিদ্যালয় তার নিজের উদ্যোগ নিয়ে ওখানে ব্যবস্থা নেন আমার মনে হয় মানুষের জীবিকা যেমন হবে তেমন মানুষের ঘাটতি পূরণ হবে। মানুষ আয়ের পথ খূঁজে পাবে।“

এরপর মন্ত্রী কিছুটা আক্ষেপের সুরে বলেন- মৎস্য বিভাগের বিভিন্ন কাজ হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে যে সমস্ত মাছ এখন বিরল হয়ে যাচ্ছে অথচ প্রোটিন বেশি থাকে। চুনোপুটি, খয়রা, মৌরোলা, বেলে মাছ বলুন আরও যেসব মাছ আছে সেগুলো কিন্তু হারিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এইসব মাছের চাষের বৃদ্ধি দরকার। গ্রামে ডোবা তো কম নেই। গ্রামে খাল বিল তো কম নেই। পুকুরও কম নেই। বেশি আয়ের লক্ষ্যে তাড়াতাড়ি যাতে মাছের উৎপাদন হতে পারে যে মাছ বড় করতে দেড় বছর লাগে আমরা কিন্তু তিন মাসে বড় করে ফেলছি। আমি কিন্তু কারও বিরুদ্ধে বলছি না। এতে ব্যবসায়িক দিক দেখা হচ্ছে। এর ফলে ওই জায়গাটায় আমরা হোচট খাচ্ছি। চুনো মাছের প্রজনন কিংবা সংরক্ষন করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় একটা উদ্যোগ নিক। আমি নিজে একটা জমি বিশ্ববিদ্যালয়কে দেখিয়েও দিয়েছি। বারে বারে গেছেন। কেন বড় মাছ ছোট মাছকে খাবে। শুধু মাত্র ছোট মাছ কোথায় করা যায়। তার জন্য চিহ্নিত করণ করা আছে। বিশ্ববিদ্যলয়ের কর্তৃপক্ষের কাছে আমার আবেদন থাকবে অযোধ্যা হিল এরিয়াকে যেখানে ট্রাইবালরা বাস করে প্রাকৃতিক খাবার সেখানে পেতে পারে। আপনারা পরীক্ষা করে দেখবেন। চুনো মাছের প্রজেক্ট আমি দিয়েছি সেটাও যদি আপনারা করেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক শ্যাম সুন্দর দানা বলেন- আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় কিছু কাজ আমরা করেছি। ২০২৩ সালে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ইস্টার্ন জোনে সবচ্যে ভাল ফল করেছি। এমনকি এডু র‍্যাঙ্কিং-এ এই বিশ্ববিদ্যালয় দশ নম্বর স্থান দখল করেছে। তাছাড়া কিছু দিন আগে জার্মানির খুব বড় বিশ্ববিদ্যালয় সেই ইউনিভার্সিটির সঙ্গে কেওতা কোলাবোরেশন হয়েছে। সবচেয়ে গর্বের বিষয় যে ওনারা ডেকেছিলেন ইন্ডিয়ান ভেটেরিনারি ইন্সটিটিউটকে, তকামিলনাড়ুর ভেটেরিনারি ইউনিভার্সিটি, আরও একটা ভেটেরিনারি ইউনিভার্সিটি রয়েছে তাদেরকে। কিন্তু ওনারা কিন্তু দায়িত্ব দিয়েছে আমাদের ইউনিভার্সিটিকে। এই সমস্ত কাজ পরিচালনা করার জন্য। এটা সম্ভব হয়েছে এখানকার ছাত্র-শিক্ষক-কর্মচারীর মিলিত প্রচেষ্টায়। এই কাজে সবেচেয়ে বেশি সাহায্য করছেন আমার প্রিয় বন্ধু প্রদীপ কুমার দে।

রাজ্যের ক্ষুদ্র-কুটির শিল্পমুন্ত্রী চন্দ্রনাথ সিনহা মুখ্যমন্ত্রীর উদ্যোগের প্রশংসা করে বলেন- “আমাদের মুখ্যমন্ত্রী বার বার বলছেন যে মেয়েদেরও স্বাবলম্বী হতে হবে। মেয়েদেরও এগিয়ে আসতে হবে। মহিলারাও এগিয়ে এসে বাংলার উন্নয়নকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। পুরুষদের জন্য তিনি যেমন চিন্তাভাবনা করছেন ঠিক তেমনই মহিলাদের জন্য সেলফ হেল্প গ্রুপ করছেন। ক্ষুদ্র কুটির শিল্পের মাধ্যমে আমরা যে স্কুল ড্রেস দিচ্ছি তা কিন্তু সেলফহেলফ গ্রুপের মাধ্যমেই তৈরি হচ্ছে। মায়েরাও যাতে কিছু রোজগার করতে পারে সেজন্য তিনি লক্ষীর ভান্ডার তিনি দিচ্ছেন। যাতে মার্কেটটা সচল হয় এবং এই টাকাটা যাতে মায়েদের হাত ঘুরে মার্কেটে আসে এবং সেখানে ক্ষুদ্র কুটির শিল্পে যারা যুক্ত আছেন সেই মার্কেটটাও সচল হয়। তাই আমাদের একটা দফতর নিজেদের মধ্যে সমন্বয় রেখে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। মৎস্য দফতর, প্রাণী সম্পদ দফতর, ক্ষুদ্র কুটির শিল্প দফতর সহ সব দফতের মধ্যে সম্ন্বয় রেখে আমরা কাজ করে যাচ্ছি যাতে বাংলার সার্বিক উন্নয়ন করতে পারি। তার ফলে জিডিপি-হারে ভারতবর্ষের চেয়েও বাংলা অনেকটাই এগিয়ে আছে। মুখ্যমন্ত্রী সেভাবেই রাজ্যটাকে চালাচ্ছেন।

জম্মুর শের-ই কাশ্মীর ইউনিভার্সিটি অফ এগ্রিকালচারের সায়েন্সেস অ্যান্ড টেকনোলজির সহযোগী পরিচালক সম্প্রসারণ,,ডক্টর হেমা ত্রিপাঠী প্রাণি পালনের গুরুত্বকে তুলে ধরে বলেন- “চাষবাসের পাশাপাশি আজ গবাদি পশু পালনের দিকে সরকার নজর দিয়েছে। যাতে এই ক্ষেত্র থেকে মানুষ আয়ের পথ খুঁজে পায়। ব্যবসায়িক আকারে করা হচ্ছে। আজ বহু যুবক চাষবাসের থেকে পালিয়ে শহরে চলে আসছে। প্রতিদিন দুই হাজার যুবক গ্রাম থেকে পালিয়ে শহরে আসছে। সেখানে এসে তারা শ্রমিকের কাজ করছে কিংবা রিকশা চালাচ্ছে। আজ সরকার ‘আয়া’ প্রক্ল্প চালু করেছে। যাতে পশুপালনকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলা যায়। গ্রাম আমাদের কেন্দ্রস্থল। সেখানে আমরা খুব উন্নত মানের প্রযুক্তি দিচ্ছি। যুবকদের এক্ষেত্রে এগিয়ে আসচতে হবে। “

এদিনের অনুষ্ঠানে অন্যান্দের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন  নদিয়া জেলা পরিষদের সভাধিপতি তারান্নুম সুলতানা মীর, বীরভূম-এর মুরারাইয়ের বিধায়ক ডক্টর মোসারফ হোসেন, এবং মুর্শিদাবাদের ভগবানগোলার বিধায়ক রেয়াত হোসেন সরকার।

অনুষ্ঠানের শুরুতে প্রকল্পের মুখ্য পরিদর্শক ডক্টর কেশব চন্দ্র ধারা স্বাগত ভাষণে উল্লেখ করেন- “এটা একটা বিশ্ববিদ্যালয়। এই বিশ্ববিদ্যালয় পঠন-পাঠন এবং গবেষণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত। কিন্তু আমাদের সরকার মনে করে এধরনের প্রাণী এবং মৎস্য বিজ্ঞান বিশ্ববিদ্যালয় প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষের জীবন ও জীবিকাকে সমৃদ্ধ করার জন্য এগিয়ে যায়, এই এগিয়ে যাওয়ার যে লক্ষ্যমাত্রা সেই লক্ষ্যমাত্রা হিসাবে আমাদের এই বায়োটেক কিষাণ হাব পশ্চিমবঙ্গের যে পাঁচটি জেলা আছে –সেই পাঁচটি জেলার লক্ষাধিক মানুষের কাছে পৌঁছতে পেরেছে। ২০১৭ সালের ৫ মার্চ থেকে সুন্দরবনে আমাদের এই পথ চলা শুরু। পরবর্তী পর্যায়ে পশ্চিমবংলার পাঁচটি সম্ভাবনাময় জেলা যার নীতিআয়ন নির্ধারণ করেছে সেই পাঁচটি জেলায় আমাদের কর্মকান্ড শুরু হয়েছে। অনেকের আর্থিক সংহতি অনেক বেড়েছে।  ছাগল পালন, মাছ চাষ এবং মুরগি পালন এর মধ্যে যে জীবিকাকে যে সংঘবদ্ধ করা যায় তার মধ্য দিয়ে মানুষকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়। বিশেষ করে এই ধরনের কর্মসংস্থানের মধ্য দিয়ে তাদের যে জীবিকাকে সমৃদ্ধ  করেছে এবং আমাদের যে লক্ষ্যমাত্রা ছিল মায়েদের স্বাবলম্বী করা। মহিলারা যদি স্বনির্ভর হয় তাহলে সংসার সুখ্কর হয়। বিগত সাত বছর ধরে কাজ করেছি। ভারত সরকার এবং পশ্চিমবঙ্গে যে সরকার আছে তাদের সহযোগিতার মধ্যে । স্থানীয় যে প্রতিনিধি আছে তাদের সঙ্গে নিয়ে আমরা এই কাজকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই। প্রতিবছর প্রতিটি জেলায় ২০০ করে অর্থাৎ এক হাজার করে ছাগল, মুরগি, মাছ প্রদান করব। তার মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথিতযশা শিক্ষকদের সাহয্যে তাদের প্রশিক্ষণ দেব। আমরা ভেবেছি যে আমরা আপনাকে তিনটি ছাগল দিলেন আপনাকেও তিনটি ছাগল কিনতে হবে। আমরা আমাদের অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি যে সকার থেকে যদি তিনটি ছাগল দি পরের হাটে সেটি বেঁচে দেয়। সেটা যেমন আপনার সম্পদ সেই সম্পদকে আপনি রক্ষা করুন।“

অনুষ্ঠানটি সর্বমোট দুটি ভাগে বিভক্ত করা হয়। প্রথম ভাগে রাজ্যের প্রাণিসম্পদ বিকাশ মন্ত্রী স্বপন দেবনাথের সম্মতিতে পাঁচটি সম্ভাবনাময় জেলা (বীরভূম , নদিয়া, মুর্শিদাবাদ , মালদা ও দক্ষিণ দিনাজপুর) থেকে নির্বাচিত সুবিধা ভোগীদের উন্নতমানের বাংলার কালো ছাগল, রাজা মুরগি ও ভারতীয় মেজার কার্প হিসাবে বিতরণ করা হয়  পরে অতিথিদেরকে বরণ করে নেওয়ার মাধ্যমে এই অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্ব শুরু হবে। উল্লিখিত প্রকল্পের মুখ্য পরিদর্শক ডক্টর কেশব চন্দ্র ধারা স্বাগত ভাষণ দেন । তারপর উপস্থিত বিশিষ্ট অতিথিরা তাদের বক্তব্য রাখবেন ।পরবর্তীতে এই প্রকল্পে কৃষি পত্রিকা কিসান বার্তা  সহ এই প্রকল্প থেকে প্রকাশিত বিভিন্ন বইয়ের উদ্বোধন করা হয়।

এই প্রকল্পের থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত উল্লেখিত পাঁচ জেলার খামারীদের মধ্যে থেকে ১২ জনকে শ্রেষ্ঠ কৃষক সম্মান দেওয়াহয় । পাঁচটি সম্ভাবনা জেলা থেকে প্রায় ৩০০ জন কৃষক এবং ৫০ জন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, বিজ্ঞানী, ছাত্র এবং সরকারি কর্মকর্তারা এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

Published on: জুলা ২২, ২০২৪ at ২০:৫০


শেয়ার করুন