
অনিরুদ্ধ পাল। সংবাদ প্রভাকর টাইমস
এসপিটি নিউজ, তারাপীঠ, বীরভূম, ২৫ অক্টোবর: বাংলার অন্যতম প্রধান শক্তিপীঠ তারাপীঠে মা তারার আবির্ভাব তিথি ঘিরে রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস, সাধন-ভজনের ঐতিহ্য এবং অসংখ্য অজানা কাহিনি। প্রতি বছর আশ্বিন মাসের শুক্লা চতুর্দশী তিথিতে, কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর আগের দিন, বিশেষ ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে উদযাপিত হয় এই উৎসব। প্রচলিত ঐতিহ্য অনুযায়ী, ১৭০১ সালে ঢেকার রাজা রামজীবন চৌধুরী তারাপীঠ মহাশ্মশান থেকে মা তারার শিলাময়ী রূপ নিয়ে এসে মন্দিরে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সেই ঘটনাকে স্মরণ করেই আজও পালিত হয়ে আসছে মায়ের আবির্ভাব তিথি।
তারাপীঠে প্রতিবছর বহু ভক্তের সমাগম হলেও এই বিশেষ দিনের পিছনে থাকা ইতিহাস, মন্দির প্রতিষ্ঠার কাহিনি, প্রাচীন সাধকদের ভূমিকা এবং পুজোর বিশেষ নিয়মকানুন সম্পর্কে অনেকেরই তেমন জানা নেই। সেই ইতিহাসের নানা অজানা দিক সংবাদ প্রভাকর টাইমসের কাছে তুলে ধরেছেন তারাপীঠ মন্দিরের সেবাইত, বিশিষ্ট লেখক, সাহিত্যিক ও গবেষক প্রবোধ কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর লেখা ‘তীর্থভূমি তারাপীঠ’ গ্রন্থে এই তীর্থক্ষেত্রের ইতিহাস ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের বিভিন্ন দিক উঠে এসেছে।
তারাপীঠের আধ্যাত্মিক ইতিহাসে সাধক বশিষ্ঠদেবের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, তিনি তারাপীঠ মহাশ্মশানে কঠোর সাধনা করে মা তারার শিবক্রোড়া রূপের দর্শন লাভ করেছিলেন। সেই বিশ্বাসের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে মহাশ্মশানে মায়ের শিলাময়ী রূপে অবস্থানের কাহিনি। প্রবোধবাবুর বর্ণনা অনুযায়ী, প্রায় দেড় হাজার বছর আগে জয়দেব সওদাগর এই শিলাকে মা তারা রূপে পুজো করার প্রচলন করেন। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন রাজবংশের শাসন পেরিয়ে তারাপীঠের ধর্মীয় ঐতিহ্য ক্রমশ বিস্তার লাভ করে।
এই ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ১৭০১ সাল। প্রবোধবাবুর বক্তব্য অনুযায়ী, সেই সময়ে বাংলার শাসনব্যবস্থায় নবাব মুর্শিদকুলি খাঁর প্রভাব ছিল। ঢেকার রাজা রামজীবন চৌধুরী ছিলেন ঈশ্বরভক্ত ও জনহিতৈষী। রাজ্য পরিচালনার পাশাপাশি বিভিন্ন মন্দিরে পুজো দেওয়া এবং ধর্মীয় কাজে যুক্ত থাকার প্রতি তাঁর বিশেষ আগ্রহ ছিল। প্রচলিত কাহিনি অনুসারে, একবার তারাপীঠ মহাশ্মশানের শিমুলতলায় ধ্যানমগ্ন অবস্থায় তিনি মা তারার স্বপ্নাদেশ পান। মায়ের পুজো ও উপাসনার জন্য মন্দির নির্মাণের নির্দেশ পেয়ে তিনি ঢেকায় ফিরে যান। পরে পাইক-পেয়াদা নিয়ে চণ্ডীপুর গ্রামে এসে স্থানীয় মানুষ ও মায়ের সেবাইতদের সঙ্গে আলোচনা করেন। এরপর মহাশ্মশানের কাছেই মন্দির নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেন।
প্রবোধবাবুর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রাজা রামজীবন ১৬৯৬ সালে মন্দির নির্মাণের কাজ শুরু করেন। তাঁর উদ্যোগে তারামায়ের মন্দির, চন্দ্রচূড় শিবের মন্দির এবং কয়েকটি পুকুর খননের কাজও শুরু হয়েছিল। ১৭০১ সালে সেই কাজ সম্পন্ন হয়। এরপর তন্ত্রসাধক প্রথম আনন্দনাথের সহায়তায় তারাপীঠ মহাশ্মশান থেকে মা তারার শিলাময়ী রূপ ও চন্দ্রচূড় শিবকে নতুন মন্দিরে প্রতিষ্ঠা করা হয়। দিনটি ছিল আশ্বিন মাসের শুক্লা চতুর্দশী, কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর আগের দিন। সেই ঐতিহাসিক ঘটনাকে স্মরণ করেই প্রতি বছর এই তিথিতে মা তারার আবির্ভাব উৎসব পালিত হয়ে আসছে।
প্রথম দিকে মায়ের শিলাময়ী রূপকে বিশ্রামমন্দিরে পশ্চিমমুখী করে বসিয়ে পুজো করা হতো। এই বিশেষ দিকনির্দেশের পিছনে রয়েছে গভীর ধর্মীয় বিশ্বাস। তারাপীঠের পশ্চিম দিকে মুলুটিতে বিরাজ করছেন মা মৌলিক্ষা, যাঁকে মা তারার বোন বলে মানা হয়। অন্যদিকে, মহাশ্মশানে মায়ের পাদপদ্মের কাছে সাধক, সাধু ও সন্ন্যাসীদের সাধনার ঐতিহ্যও রয়েছে। বিশ্বাস করা হয়, বোনের সঙ্গে দেখা করতে এবং মহাশ্মশানে সাধনরত ভক্তদের আশীর্বাদ দিতে মা এই দিনে পশ্চিমমুখী হয়ে অবস্থান করেন। সাধারণ দিনে মায়ের আসন ও পুজোর রীতির সঙ্গে এই বিশেষ দিনের পার্থক্য ভক্তদের কাছে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
প্রথম আনন্দনাথের পর তারাপীঠে আরও এক গুরুত্বপূর্ণ সাধক ছিলেন দ্বিতীয় আনন্দনাথ। প্রবোধবাবুর বর্ণনা অনুযায়ী, তিনি তারাপীঠে পঞ্চপর্ব পুজোর প্রচলন করেন। একটি একাদশী, একটি পূর্ণিমা, দুটি অষ্টমী এবং একটি সংক্রান্তি—এই পাঁচটি তিথিকে কেন্দ্র করে পুজোর বিশেষ রীতি গড়ে ওঠে। একই সঙ্গে মা তারার মধ্যে দুর্গা, কালী, নীল সরস্বতী, জগদ্ধাত্রী, বগলা ও ছিন্নমস্তার মতো দেবীর বিভিন্ন রূপ কল্পনা করে পুজোর প্রচলনেও তাঁর ভূমিকা ছিল বলে জানা যায়। তারাপীঠে রথ উৎসবের সূচনার সঙ্গেও তাঁর নাম জড়িয়ে রয়েছে।
পরবর্তী সময়ে ১৭৫৮ সালে মা তারার যে ধ্যানময়ী মূর্তি আজ ভক্তেরা দেখতে পান, তা প্রতিষ্ঠিত হয় বলে প্রবোধবাবু জানিয়েছেন। এরপর ১৭৭৫ সালে নাটোরের রানি ভবানীর দত্তকপুত্র রাজা রামকৃষ্ণ তারাপীঠ মন্দিরের দেখভালের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তারাপীঠের ধর্মীয় ঐতিহ্য ও পুজোর রীতির বিকাশে বিভিন্ন সময়ে সাধক, সেবাইত ও রাজপরিবারের সদস্যদের অবদান এভাবেই ইতিহাসের সঙ্গে মিশে রয়েছে।
বর্তমানে যে তারাপীঠ মন্দিরটি ভক্তদের কাছে বিশেষ পরিচিত, সেটি নির্মাণের সঙ্গেও জড়িয়ে রয়েছে আর এক দানশীল ব্যক্তির নাম। প্রবোধবাবুর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, পুরনো মন্দিরটি ধ্বংসের মুখে পৌঁছলে ১৮১৮ সালে মল্লারপুরের জমিদার জগন্নাথ রায় বর্তমান মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেন। এই মন্দিরেই পরবর্তী সময়ে সাধক বামাক্ষ্যাপা সাধনায় সিদ্ধিলাভ করেছিলেন বলে ভক্তদের মধ্যে বিশ্বাস প্রচলিত রয়েছে।
মা তারার আবির্ভাব তিথির পুজোর রীতিতেও রয়েছে বিশেষ বৈশিষ্ট্য। এই উপলক্ষে ভোররাতে মূল মন্দির থেকে মায়ের শিলাময়ী রূপকে বিশ্রামমন্দিরে নিয়ে আসা হয়। সেখানে ভক্তদের উপস্থিতিতে স্নানাভিষেকের পর মাকে বিভিন্ন বস্ত্র, মুখোশ, মুণ্ডমালা, হস্তমালা ও নানা ধরনের ফুলের মালা দিয়ে সাজানো হয়। মঙ্গলারতির পর শুরু হয় পুজো। দিনভর বহু ভক্ত মায়ের কাছে পুজো দেন এবং নিজেদের মনোবাসনা পূরণের প্রার্থনা করেন।
এই দিনের একটি বিশেষ প্রথা হল, দুপুরে মাকে সাধারণ নিয়মে অন্নভোগ নিবেদন করা হয় না। সেই প্রথা অনুসরণ করে বহু সেবাইত ও ভক্ত নিজেরাও বাড়িতে রান্না করেন না এবং অন্ন গ্রহণ থেকে বিরত থাকেন। পরিবর্তে ফল, দুধ ও মিষ্টান্ন গ্রহণ করেন তাঁরা। সারাদিন পুজো-অর্চনা চলার পর সন্ধ্যায় মাকে আবার বিশ্রামমন্দির থেকে মূল মন্দিরে ফিরিয়ে আনা হয়। কাঁসর, ঘণ্টা ও বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রের শব্দে মুখরিত হয়ে ওঠে মন্দির চত্বর। মায়ের এই প্রত্যাবর্তন দেখার জন্য ভক্তদের মধ্যে বিশেষ উৎসাহ দেখা যায়।
মূল মন্দিরে ফিরিয়ে আনার পর পুনরায় স্নানাভিষেক ও সাজসজ্জার মাধ্যমে মায়ের পুজো সম্পন্ন হয়। প্রথমে মাকে চিঁড়ে, লুচি, পায়েস ও মিষ্টান্ন নিবেদন করা হয়। পরে বিশেষ আরতির পর নিবেদন করা হয় খিচুড়ি, পোলাও, ভাত, পাঁচ রকমের ব্যঞ্জন, মাছ, ভাজা, বলির মাংস, পায়েস-সহ নানা পদ। পুজোর পর ভক্তদের মধ্যে প্রসাদ বিতরণ করা হয়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই ধর্মীয় রীতি ও আচার পালিত হয়ে আসছে।
একসময় আবির্ভাব তিথিকে কেন্দ্র করে তারাপীঠে ছোটখাটো মেলাও বসত। সময়ের পরিবর্তনে সেই আয়োজনের চেহারা বদলেছে। তবে উৎসবের মূল আকর্ষণ আজও অটুট—মা তারার প্রতি অগাধ বিশ্বাস, ভক্তি ও আত্মনিবেদনের আবেগ। শুধু একটি মূর্তি প্রতিষ্ঠার স্মৃতি নয়, এই দিনটি তারাপীঠের সাধন-ঐতিহ্য, প্রাচীন ধর্মীয় বিশ্বাস এবং বহু প্রজন্মের ভক্তির ধারাকে বহন করে চলেছে।
রাজা রামজীবন চৌধুরীর উদ্যোগে মা তারার শিলাময়ী রূপ প্রতিষ্ঠার যে কাহিনি প্রচলিত রয়েছে, তা আজও তারাপীঠের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। আশ্বিনের শুক্লা চতুর্দশীতে প্রতি বছর ভক্তেরা যখন মায়ের আবির্ভাব তিথি উদযাপন করেন, তখন তাঁরা শুধু একটি বিশেষ পুজোর অংশ হন না; ফিরে দেখেন কয়েক শতাব্দী ধরে বয়ে চলা এক আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যকে। সময় বদলেছে, মন্দিরের রূপ বদলেছে, বদলেছে আয়োজনের ধরন। কিন্তু মা তারার প্রতি মানুষের বিশ্বাস ও ভক্তির প্রবাহ আজও সমানভাবে বহমান।




