মহাশিবরাত্রিতে নাগেশ্বর মহাদেবের লীলা: স্বপ্নাদেশ থেকে প্রতিষ্ঠা—বাখারপুরে আধ্যাত্মিক জাগরণ

Main দেশ ধর্ম রাজ্য
শেয়ার করুন

Published on: ফেব্রু ১৫, ২০২৬ at ২২:৫১
Reporter: Aniruddha Pal

এসপিটি নিউজ, বাখারপুর (পূর্ব মেদিনীপুর), ১৫ ফেব্রুয়ারি : আজ মহাশিবরাত্রি। শিবভক্তদের কাছে এই তিথি শুধু একটি ব্রতদিন নয়—এ এক মহা আধ্যাত্মিক উৎসব। লোকশ্রুতি অনুযায়ী এই দিনেই দেবাদিদেব মহাদেব ও দেবী পার্বতীর শুভ বিবাহ সম্পন্ন হয়েছিল। সারা দেশের দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গে আজ মহোৎসবের আবহ, লক্ষ লক্ষ ভক্তের সমাগম। তবে জ্যোতির্লিঙ্গের বাইরেও ভারতের নানা প্রান্তে নানা নামে, নানা রূপে শিব আরাধনার যে ধারাবাহিকতা, তারই এক অনন্য নিদর্শন উঠে এল পশ্চিমবঙ্গের পূর্ব মেদিনীপুর জেলার বাখারপুর গ্রামে।

রামনগর থানার অন্তর্গত এই প্রত্যন্ত গ্রামেই অবস্থিত আচার্য দেবানন্দ শাস্ত্রী প্রতিষ্ঠিত অখণ্ড শ্রী ক্রিয়াযোগ সাধন মন্দির সেবাশ্রম সংঘ। এখানেই অধিষ্ঠিত রয়েছেন বাবা নাগেশ্বর মহাদেব। আজ মহাশিবরাত্রির পুণ্যতিথিতে তাঁর মাথায় জল ঢালতে সকাল থেকেই ভিড় জমিয়েছেন অসংখ্য ভক্ত। গোটা গ্রাম জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে ভক্তি, বিশ্বাস ও আধ্যাত্মিক চেতনার এক নিবিড় আবহ।

এই নাগেশ্বর মহাদেবের প্রতিষ্ঠা ঘিরে রয়েছে এক আশ্চর্য আধ্যাত্মিক কাহিনি। আশ্রমের প্রতিষ্ঠাতা আচার্য দেবানন্দ শাস্ত্রী—যিনি ভক্তদের কাছে ‘গুরুজি’ নামে পরিচিত—নিজেই শোনালেন সেই লীলাকথা। সময়টা ২০০৯ সাল। এক রাতে স্বপ্নাদেশে স্বয়ং নাগেশ্বর মহাদেব গুরুজিকে নির্দেশ দেন, নর্মদা নদী-এর অন্তর থেকে তাঁকে তুলে এনে আশ্রমে প্রতিষ্ঠা করার জন্য। সেই সময় আশ্রমে মা কনেকেশ্বরী কালীর উপস্থিতি থাকলেও নানা কারণে তাঁরও প্রতিষ্ঠা সম্ভব হচ্ছিল না। শিবলিঙ্গ নর্মদা থেকে কীভাবে আনা হবে—এই প্রশ্নে গুরুজি দিশেহারা হয়ে পড়েন। এভাবেই কেটে যায় দীর্ঘ সাত বছর।

পরবর্তীতে গুরুজির এক শিষ্য অজয় চক্রবর্তীর সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ স্থাপিত হয়। কর্মসূত্রে রাউরকেল্লা হয়ে ২০১৬ সালে তাঁর পোস্টিং হয় মধ্যপ্রদেশের জব্বলপুরে। সেই সময় গুরুজি তাঁকে নির্দেশ দেন—“তুমি যখন জব্বলপুরে আছো, একদিন নর্মদার ঘাটে ঘুরে এসো।” গুরুজির নির্দেশে অজয় চক্রবর্তী একদিন নর্মদার ঘাটে গেলে সেখানে সাক্ষাৎ হয় সাধু অখিলেশ পুরীর সঙ্গে। গুরুজির কথা শুনে এবং নর্মদার তলায় অধিষ্ঠিত নাগেশ্বর মহাদেবের প্রসঙ্গ উঠতেই অখিলেশ পুরী তৎক্ষণাৎ অজয়ের ফোনে গুরুজির সঙ্গে কথা বলেন। গুরুজির ছবি দেখে ও কথা বলে তিনি আশ্বস্ত হন এবং নর্মদা থেকে শিবলিঙ্গ তুলে দেওয়ার আশ্বাস দেন।

অবশেষে যথাযথ ব্যবস্থাপনায় সেই পবিত্র শিবলিঙ্গ ট্রেনে করে আনা হয় বাখারপুরের আশ্রমে। তবে তখনই প্রতিষ্ঠা করা হয়নি। কারণ দীর্ঘদিন নর্মদার শীতল জলের তলায় থাকা শিবলিঙ্গকে হঠাৎ বাখারপুরের উষ্ণ পরিবেশে স্থাপন করা সমীচীন হবে কি না—এই ভাবনায় পড়েন গুরুজি। বিষয়টি জানানো হয় অখিলেশ পুরীকে। তিনি নিজেই আশ্রমে আসার প্রতিশ্রুতি দেন। শেষ পর্যন্ত ২০১৭ সালে তিনি বাখারপুরে এসে সমস্ত আচার-অনুষ্ঠান সম্পন্ন করে নাগেশ্বর মহাদেবকে প্রতিষ্ঠা করে যান।

সেই থেকে আজ পর্যন্ত একইভাবে আশ্রমে বিরাজমান বাবা নাগেশ্বর মহাদেব। আর আজ, মহাশিবরাত্রির পবিত্র তিথিতে, তাঁর আরাধনায় মেতে উঠেছে গোটা বাখারপুর গ্রাম। ধূপ-ধুনো, মন্ত্রোচ্চারণ আর ভক্তদের শ্রদ্ধার্ঘ্যে মুখর হয়ে উঠেছে আশ্রম প্রাঙ্গণ। বিশ্বাস আর ভক্তির স্রোতে এক অনন্য আধ্যাত্মিক চেতনায় পূর্ণ হয়ে উঠেছে পূর্ব মেদিনীপুরের এই প্রত্যন্ত জনপদ।

Published on: ফেব্রু ১৫, ২০২৬ at ২২:৫১


শেয়ার করুন