কলকাতায় কোলোরেক্টাল ক্যান্সার সচেতনতায় ভয়াবহ ঘাটতি: রক্ত পড়াকে সতর্কবার্তা হিসেবে চেনেন মাত্র ৯.৩%

Main দেশ রাজ্য
শেয়ার করুন

Published on: মার্চ ১৭, ২০২৬ at ১৯:৪৯
Reporter: Aniruddha Pal

এসপিটি নিউজ, কলকাতা, ১৭ মার্চ: কলকাতা-সহ দেশের ১৪টি প্রধান শহর জুড়ে পরিচালিত এক বিস্তৃত সমীক্ষায় কোলোরেক্টাল ক্যান্সার ও পরিপাকতন্ত্রের স্বাস্থ্য বিষয়ে উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। ‘জীবনধারা ও পরিপাকতন্ত্রের স্বাস্থ্য সচেতনতা সমীক্ষা’ নামে এই গবেষণায় দেখা গেছে, কলকাতার মানুষের মধ্যে কোলোরেক্টাল ক্যান্সার সম্পর্কে সচেতনতার মাত্রা অত্যন্ত কম—বিশেষত রোগের প্রাথমিক লক্ষণ চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে।

সমীক্ষাটি ২৫ থেকে ৬৫ বছর বয়সী মোট ১০,১৯৮ জন অংশগ্রহণকারীর ওপর ভিত্তি করে তৈরি। সমীক্ষাটি কলকাতা, আহমেদাবাদ, ব্যাঙ্গালোর, কালিকট, চণ্ডীগড়, চেন্নাই, দিল্লি, হায়দ্রাবাদ, ইন্দোর, জয়পুর, কোচি, লখনউ, মুম্বাই এবং পুনে—ভারতের এমন ১৪টি প্রধান শহরে পরিচালিত হয়। এই গবেষণার সহায়তায় ছিল মার্ক স্পেশালিটিস প্রাইভেট লিমিটেড (Merck Specialities Pvt. Ltd.), যারা একটি ‘পারশেপশন অডিট’ (‘Perception Audit’)-এর মাধ্যমে মানুষের স্বাস্থ্য-সংক্রান্ত আচরণ ও ধারণার বিশ্লেষণ করেছে।

কলকাতার চিত্র: উদ্বেগের একাধিক কারণ

শহরভিত্তিক বিশ্লেষণে কলকাতার ৪৬৬ জন অংশগ্রহণকারীর তথ্য বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। তাঁদের মধ্যে ২২৮ জন নারী এবং ২৩৮ জন পুরুষ। বয়সভিত্তিক ভাগে দেখা যায়—২৫–৩৫ বছর বয়সী ৯৬ জন, ৩৬–৪৫ বছর বয়সী ১৭০ জন, ৪৬–৫৫ বছর বয়সী ১৩৬ জন এবং ৫৫ বছরের ঊর্ধ্বে ৬৪ জন অংশ নিয়েছেন।

এই বিশ্লেষণে উঠে এসেছে—

  • মাত্র ৯.৩% মানুষ মলের সঙ্গে রক্ত পড়াকে কোলোরেক্টাল ক্যান্সারের সতর্কসংকেত হিসেবে চিনতে পারেন
  • ৯১.৯% উত্তরদাতা মলত্যাগের অভ্যাসে পরিবর্তন হলেও চিকিৎসকের কাছে যেতে দেরি করেন
  • ৭৫.৭% মানুষ অনিয়মিত মলত্যাগ বা অন্ত্রের সমস্যায় ভোগেন
  • ৪৪.১% মানুষ তামাক সেবনের কথা স্বীকার করেছেন

এই পরিসংখ্যানগুলি স্পষ্ট করে যে, একদিকে যেমন উপসর্গের প্রকোপ বেশি, অন্যদিকে তেমনি সচেতনতার ঘাটতি এবং চিকিৎসা নেওয়ার ক্ষেত্রে গাফিলতিও মারাত্মক।

জাতীয় স্তরের চিত্র: বিপজ্জনক প্রবণতা

দেশজুড়ে প্রাপ্ত তথ্যও কম উদ্বেগজনক নয়। সমীক্ষায় দেখা গেছে—

  • ৮০% এর বেশি মানুষ অ্যাসিডিটি, কোষ্ঠকাঠিন্য বা বদহজমের মতো সমস্যায় চিকিৎসকের পরামর্শ না নিয়ে নিজে ওষুধ খান
  • ৬৫% এর বেশি মানুষ মলত্যাগের অভ্যাসে অনিয়মের কথা জানিয়েছেন
  • ৫০% এর বেশি মানুষ নিয়মিত বাইরের বা প্যাকেটজাত খাবার খান
  • এর মধ্যে ২৮.১% প্রায় প্রতিদিনই বাইরের খাবার গ্রহণ করেন
  • মাত্র ৪৫.২% মানুষ নিয়মিত ব্যায়াম করেন
  • ৫৪.৮% মানুষ সপ্তাহে তিনবারও শরীরচর্চা করেন না
  • ৩৯.৯% মানুষ তামাক সেবন করেন

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—৮০% এর বেশি মানুষ জানেন না যে মলের সঙ্গে রক্ত পড়া কোলোরেক্টাল ক্যান্সারের প্রাথমিক লক্ষণ হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মত: সচেতনতার অভাবই প্রধান বাধা

নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বোস ক্যান্সার সেন্টার এন্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউট- এর পরামর্শদাতা ও মেডিকেল এবং হেমাটো-অনকোলজিস্ট ডা. পৌলমী বসুর মতে, কোলোরেক্টাল ক্যান্সার সাধারণত পলিপ থেকে শুরু হয়, যা সময়মতো শনাক্ত করলে সহজেই নিরাময়যোগ্য। কিন্তু উপসর্গ অবহেলা করায় রোগ অনেক সময় দেরিতে ধরা পড়ে। তিনি বলেন, “মলের সঙ্গে রক্ত যাওয়া, দীর্ঘদিন মলত্যাগের অভ্যাসে পরিবর্তন, পেটের অস্বস্তি, অকারণে ওজন কমে যাওয়া—এসব উপসর্গ কখনই হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়। কোলোনোস্কোপির মতো স্ক্রিনিংয়ের মাধ্যমে প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ ধরা সম্ভব।”

কলকাতা-স্থিত মণিপাল হাসপাতালের বিভাগীয় প্রধান (HOD) এবং পরামর্শদাতা মেডিকেল ও হেমাটো-অনকোলজিস্ট ডা. সুদীপ দাস বলেন, “জরিপের ফলাফল থেকে দেখা যায় যে, অনেকেই হজম সংক্রান্ত বিভিন্ন লক্ষণ—যেমন মলের সাথে রক্ত ​​যাওয়া কিংবা মলত্যাগের অভ্যাসে দীর্ঘস্থায়ী অনিয়ম—গুলোকে উপেক্ষা করেন অথবা ভুলভাবে ব্যাখ্যা করেন। চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার পরিবর্তে, অনেকেই তখন ঘরোয়া টোটকা বা চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন ছাড়াই কেনা যায় এমন ওষুধের ওপর নির্ভর করেন। এই ধরনের আচরণের ফলে রোগের সঠিক চিকিৎসা-মূল্যায়ন বা পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু হতে দেরি হয় এবং কোলোরেক্টাল ক্যান্সারকে তার প্রাথমিক ও নিরাময়যোগ্য পর্যায়ে শনাক্ত করার সুযোগ কমে যায়।”

অন্যদিকে কলকাতা-স্থিত HCG ক্যান্সার হাসপাতালের পরামর্শদাতা মেডিকেল ও হেমাটো-অনকোলজিস্ট ডা. সঞ্চয়ন মণ্ডল জীবনযাত্রার ভূমিকার ওপর জোর দিয়ে বলেন, “অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, প্রক্রিয়াজাত খাবার, ব্যায়ামের অভাব এবং তামাক সেবন—এসবই কোলোরেক্টাল ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়। ফাইবার-সমৃদ্ধ খাবার, নিয়মিত শরীরচর্চা এবং স্ক্রিনিংয়ের মাধ্যমে এই ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।”

জীবনযাত্রা ও ঝুঁকি: কেন বাড়ছে কোলোরেক্টাল ক্যান্সার

বিশেষজ্ঞদের মতে, শহুরে জীবনের পরিবর্তিত ধরণ এই রোগ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।

  • ফাস্ট ফুড ও কম ফাইবারযুক্ত খাবার
  • দীর্ঘ সময় বসে কাজ
  • মানসিক চাপ
  • অনিয়মিত রুটিন
    —এসবই পরিপাকতন্ত্রের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

এর ফলে কোষ্ঠকাঠিন্য, অ্যাসিডিটি, গ্যাসের মতো সমস্যা বাড়ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে গুরুতর রোগের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

সচেতনতা মাসের প্রেক্ষাপট

প্রতি বছর মার্চ মাস বিশ্বজুড়ে কোলোরেক্টাল ক্যান্সার সচেতনতা মাস হিসেবে পালিত হয়। এই সময় বিভিন্ন স্বাস্থ্য সংস্থা ও হাসপাতাল মানুষকে সচেতন করতে উদ্যোগ নেয়। তবে সাম্প্রতিক এই সমীক্ষা দেখাচ্ছে, সচেতনতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে এখনও অনেক পথ বাকি।

সমীক্ষার ফলাফল স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে— উপসর্গ থাকলেও তা অবহেলা করা, চিকিৎসা নিতে দেরি করা এবং অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন—এই তিনের সংমিশ্রণ কোলোরেক্টাল ক্যান্সারের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের একটাই পরামর্শ—মলের সঙ্গে রক্ত, দীর্ঘদিনের কোষ্ঠকাঠিন্য বা মলত্যাগের অভ্যাসে পরিবর্তন হলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। সময়মতো পদক্ষেপই জীবন বাঁচাতে পারে।


শেয়ার করুন