
এসপিটি নিউজ, কলকাতা, ২ নভেম্বর: দিল্লি থেকে পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়ি হয়ে অসমের গুয়াহাটি পর্যন্ত বুলেট ট্রেন চালানোর প্রস্তাবে দেশের রেল যোগাযোগ ও পর্যটন ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ৩১ অক্টোবর রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব জানিয়েছেন, দিল্লি থেকে গুয়াহাটি পর্যন্ত উত্তর ভারতের প্রস্তাবিত দ্রুতগতির রেল করিডরে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে বলে তিনি ঘোষণা করেছেন। এই করিডর বাস্তবায়িত হলে উত্তরপ্রদেশ, বিহার, পশ্চিমবঙ্গ ও অসমের মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসতে পারে।
প্রস্তাবিত রেলপথটি দিল্লি থেকে শুরু হয়ে আগ্রা, কানপুর, লখনউ, অযোধ্যা, বারাণসী, প্রয়াগরাজ ও পাটনা হয়ে পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়িতে পৌঁছবে। সেখান থেকে রেলপথটি অসমের গুয়াহাটি পর্যন্ত বিস্তৃত হওয়ার কথা। ফলে পশ্চিমবঙ্গের উত্তরাঞ্চল দেশের রাজধানী এবং উত্তর ভারতের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ শহরের সঙ্গে দ্রুতগতির রেল যোগাযোগের আওতায় আসতে পারে।
এই প্রকল্পের ক্ষেত্রে শিলিগুড়ির গুরুত্ব বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। উত্তরবঙ্গের এই শহরটি দার্জিলিং, কালিম্পং, ডুয়ার্স এবং সিকিমের বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে যাওয়ার অন্যতম প্রবেশদ্বার। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকেরা শিলিগুড়িতে পৌঁছে সড়কপথে পাহাড়, চা-বাগান, বনাঞ্চল ও অন্যান্য পর্যটনস্থলে যান। দিল্লি ও উত্তর ভারতের সঙ্গে দ্রুত রেল যোগাযোগ গড়ে উঠলে ভবিষ্যতে এই অঞ্চলে পর্যটকদের যাতায়াত আরও সহজ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
দার্জিলিঙের পাহাড়, চা-বাগান, ঐতিহ্যবাহী টয় ট্রেন এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেশ-বিদেশের পর্যটকদের আকর্ষণ করে। অন্যদিকে, ডুয়ার্সের বনাঞ্চল, বন্যপ্রাণী ও চা-বাগানকেন্দ্রিক পর্যটনেরও যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। দ্রুতগতির রেল পরিষেবা চালু হলে দিল্লি ও উত্তর ভারতের পর্যটকেরা কম সময়ে শিলিগুড়িতে পৌঁছতে পারবেন। সেখান থেকে সড়কপথে বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। তবে প্রকল্পের চূড়ান্ত রুট, স্টেশনের অবস্থান এবং পরিষেবা চালুর সময়সূচি প্রকাশিত না হওয়া পর্যন্ত পর্যটকদের যাত্রার সময় কতটা কমবে, তা নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়।
রেলমন্ত্রী জানিয়েছেন, প্রস্তাবিত করিডরে দিল্লি থেকে আগ্রা যেতে প্রায় ৫৯ মিনিট, কানপুর যেতে প্রায় ১ ঘণ্টা ৪৫ মিনিট এবং লখনউ যেতে প্রায় ২ ঘণ্টা ১২ মিনিট লাগতে পারে। দিল্লি থেকে বারাণসী পৌঁছতে প্রায় ৩ ঘণ্টা ৩৫ মিনিট লাগার সম্ভাবনার কথাও জানানো হয়েছে। এগুলি প্রস্তাবিত যাত্রাসময়ের হিসাব, চালু ট্রেনের সময়সূচি নয়। দিল্লি থেকে গুয়াহাটি পর্যন্ত সম্পূর্ণ যাত্রায় কত সময় লাগবে, তারও চূড়ান্ত সরকারি সময়সূচি এখনও প্রকাশিত হয়নি।
অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা এই করিডর গুয়াহাটি পর্যন্ত সম্প্রসারণের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রথমে প্রস্তাবিত রেলপথটি শিলিগুড়ি পর্যন্ত রাখার পরিকল্পনা ছিল। পরে তিনি রেলমন্ত্রীর কাছে গুয়াহাটি পর্যন্ত সম্প্রসারণের আবেদন জানান। তাঁর মতে, এই যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু হলে উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের যোগাযোগ আরও উন্নত হবে এবং ব্যবসা, শিল্প ও কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
পর্যটন শিল্পের দিক থেকেও এই প্রকল্পের সম্ভাব্য প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ। দ্রুত ও সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থা কোনও পর্যটনকেন্দ্রের জনপ্রিয়তা বাড়াতে সাহায্য করে। পর্যটকের সংখ্যা বাড়লে হোটেল, রিসর্ট, গাড়ি ভাড়া, স্থানীয় গাইড, খাবারের দোকান এবং ভ্রমণ সংস্থাগুলির ব্যবসাও বাড়তে পারে। উত্তরবঙ্গের ছোট পর্যটন ব্যবসায়ীদের কাছে এই ধরনের যোগাযোগ ব্যবস্থা নতুন বাজার তৈরি করার সুযোগ এনে দিতে পারে।
শুধু অবকাশযাপন নয়, সম্মেলন, ব্যবসায়িক বৈঠক এবং বিভিন্ন সংস্থার অনুষ্ঠানকেন্দ্রিক পর্যটনের ক্ষেত্রেও উন্নত রেল যোগাযোগ সহায়ক হতে পারে। কলকাতা ও শিলিগুড়ির মতো শহরে পর্যটন ও ব্যবসায়িক যাতায়াত বাড়লে হোটেল এবং অন্যান্য পরিষেবার চাহিদা বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে পর্যটনকেন্দ্রগুলিতে উন্নত থাকার ব্যবস্থা, পরিচ্ছন্নতা, নিরাপত্তা এবং স্থানীয় পরিবহণের উন্নয়ন প্রয়োজন।
তবে প্রকল্পটি নিয়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখনও স্পষ্ট নয়। প্রস্তাবিত রেলপথের বিস্তারিত নকশা, চূড়ান্ত স্টেশন তালিকা, প্রকল্পের মোট ব্যয়, নির্মাণ শুরুর সময় এবং পরিষেবা চালুর নির্দিষ্ট তারিখ সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশিত হয়নি। তাই এখনই বুলেট ট্রেন চালু হওয়ার নির্দিষ্ট সময় বলা সম্ভব নয়। প্রকল্পের ঘোষণা ও অনুমোদনের খবরকে নির্মাণকাজ শুরু হয়ে যাওয়ার সমান হিসেবে দেখা উচিত নয়।
পশ্চিমবঙ্গের পর্যটন শিল্পের কাছে এই প্রস্তাবিত রেল করিডর তাই ভবিষ্যতের একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা। শিলিগুড়ি যদি দ্রুতগতির রেল যোগাযোগের অন্যতম কেন্দ্র হয়ে ওঠে, তবে দার্জিলিং, কালিম্পং ও ডুয়ার্সের মতো পর্যটনকেন্দ্রের সঙ্গে দেশের বড় শহরগুলির যোগাযোগ আরও সহজ হতে পারে। কিন্তু প্রকল্পের বাস্তবায়ন, চূড়ান্ত রুট এবং অন্যান্য পরিকাঠামোর উন্নয়নের উপরই নির্ভর করবে এই সম্ভাবনা কতটা বাস্তব রূপ পাবে।
এসপিটি বিশেষ প্রতিবেদন
সংবাদ প্রভাকর টাইমস




