হাতি সীমান্ত মানে না, তাই সমাধানও হতে হবে যৌথ— মানব-হাতি সংঘাত মোকাবিলায় ভারত-নেপালের ঐতিহাসিক বৈঠক

Main দেশ বন্যপ্রাণ ভ্রমণ রাজ্য
শেয়ার করুন

মল্লাবাড়িতে সীমান্ত-পার সহযোগিতার রূপরেখা; পর্যটন, বন সংরক্ষণ ও মানুষের নিরাপত্তাকে একসঙ্গে গুরুত্ব

Published on: জুলা ১, ২০২৬ at ২২:৪৯

এসপিটি নিউজ, মল্লাবাড়ি (নকশালবাড়ি), ১ জুলাই: ভারত-নেপাল সীমান্তবর্তী অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান মানব-হাতি সংঘাত মোকাবিলায় দুই দেশের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হল পশ্চিমবঙ্গের নকশালবাড়ির মল্লাবাড়ির ধিমাল কালচারাল সেন্টার ও কমিউনিটি হলে। সীমান্তের দুই প্রান্তের বন দফতর, প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, নিরাপত্তা বাহিনী, স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ও স্থানীয় প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে মানবজীবন, জীবিকা, বন্যপ্রাণ সংরক্ষণ এবং সীমান্তবর্তী পর্যটনের ভবিষ্যৎ নিয়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

বৈঠকে নেপালের ঝাপা জেলার মেচিনগর এলাকার প্রতিনিধিরা জানান, সাম্প্রতিক সময়ে বাহুন্ডাঙ্গি অঞ্চলে বন্য হাতির চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এর ফলে প্রাণহানি, কৃষিজমির ব্যাপক ক্ষতি এবং বসতবাড়ি ধ্বংসের মতো ঘটনা বৃদ্ধি পাচ্ছে। মেচিনগর নগরপালিকার মেয়র, মেচি অঞ্চলের সাংসদসহ নেপালের প্রতিনিধিরা এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় দ্রুত দ্বিপাক্ষিক উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন।

এর জবাবে কার্শিয়াং বন বিভাগের ডিভিশনাল ফরেস্ট অফিসার দেবেশ পাণ্ডে (IFS) জানান, একই ধরনের চ্যালেঞ্জ ভারতের সীমান্তবর্তী এলাকাতেও রয়েছে। তিনি বলেন, ভারত ইতিমধ্যেই মানব-হাতি সংঘাত কমাতে ২৪ ঘণ্টার বিশেষ কন্ট্রোল রুম, হাতির গতিবিধির উপর নিরবচ্ছিন্ন নজরদারি, মাইকিংয়ের মাধ্যমে আগাম সতর্কবার্তা, কেন্দ্রীভূত মানব-বন্যপ্রাণ সংঘাত ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ও কৃষকদের জন্য ক্ষতিপূরণ প্রদানের মতো একাধিক কার্যকর ব্যবস্থা চালু করেছে।

তিনি আরও বলেন, “হাতি আন্তর্জাতিক সীমান্ত চেনে না। তাদের স্বাভাবিক বিচরণ বনভূমির পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই হাতির চলাচল রোধ নয়, বরং বিজ্ঞানভিত্তিক ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমেই দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সম্ভব।”

বৈঠকের সমাপ্তি পর্বে অ্যাসোসিয়েশন ফর কনজারভেশন অ্যান্ড ট্যুরিজম (ACT)-এর আহ্বায়ক রাজ বসু বলেন, মানব-হাতি সংঘাত কেবল একটি দেশের সমস্যা নয়; এটি একটি যৌথ পরিবেশগত ও সামাজিক চ্যালেঞ্জ। তাই দুই দেশের বন দফতর, প্রশাসন এবং স্থানীয় জনগণের মধ্যে নিয়মিত তথ্য বিনিময়, যৌথ পরিকল্পনা এবং সক্রিয় জনসম্পৃক্ততা নিশ্চিত করাই হবে ভবিষ্যতের মূল লক্ষ্য।

বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, নেপাল সরকার আন্তঃবিভাগীয় সমন্বয় ব্যবস্থার সূচনা করবে, যেখানে বন দফতর হবে নোডাল সংস্থা। পাশাপাশি ভারত ও নেপালের মধ্যে একটি যৌথ সমন্বয় ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে, যার মাধ্যমে রিয়েল-টাইম তথ্য আদান-প্রদান, সীমান্তবর্তী এলাকায় দ্রুত প্রতিক্রিয়া এবং প্রযুক্তিগত জ্ঞান বিনিময় নিশ্চিত করা হবে। ভারত এই প্রক্রিয়ায় নেপালকে প্রযুক্তিগত সহায়তা ও অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেবে।

পর্যটনের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ এই উদ্যোগ?

উত্তরবঙ্গ ও পূর্ব নেপালের সীমান্তবর্তী বনাঞ্চল, চা-বাগান, বন্যপ্রাণ অভয়ারণ্য এবং প্রকৃতি পর্যটনের অন্যতম আকর্ষণ। মানব-হাতি সংঘাত কমিয়ে নিরাপদ ও টেকসই পরিবেশ গড়ে তুলতে পারলে এই অঞ্চলে ইকো-ট্যুরিজম, কমিউনিটি-ভিত্তিক পর্যটন এবং সীমান্ত পর্যটনের সম্ভাবনা আরও উজ্জ্বল হবে। একই সঙ্গে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকার নিরাপত্তাও আরও শক্তিশালী হবে।

এই বৈঠক তাই শুধু বন্যপ্রাণ সংরক্ষণের দৃষ্টিকোণ থেকেই নয়, ভারত-নেপাল সীমান্তবর্তী অঞ্চলে টেকসই পর্যটন উন্নয়ন ও আন্তঃদেশীয় পরিবেশ সহযোগিতার ক্ষেত্রেও একটি তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।


শেয়ার করুন