

Published on: মে ৯, ২০২৬ at ২৩:৪৩
Reporter: Aniruddha Pal
এসপিটি নিউজ, কলকাতা, ৯ মে: পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হল। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সমীকরণ ভেঙে রাজ্যের নতুন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন শুভেন্দু অধিকারী। একসময় যে জনসমর্থন শুধুমাত্র মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ক্ষেত্রেই দেখা যেত, এবার সেই একই উন্মাদনা ও আবেগ দেখা গেল শুভেন্দু অধিকারীকে ঘিরে।
রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে বহুদিন ধরেই চর্চা চলছিল শুভেন্দুর সেই চ্যালেঞ্জ নিয়ে— “২০২৬ সালের ভোটে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে প্রাক্তন করব।” অবশেষে সেই দাবিকেই বাস্তবে রূপ দিলেন তিনি। সবচেয়ে বড় চমক, নিজের শক্ত ঘাঁটি ভবানীপুর কেন্দ্রেই প্রায় ১৫ হাজারের বেশি ভোটে পরাজিত হলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। একসময় যিনি বলতেন, “২৯৩ কেন্দ্রে আমি প্রার্থী”, সেই মমতাকেই এবার হার স্বীকার করতে হল শুভেন্দুর কাছে।
ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে বিপুল জনসমাগমের মধ্য দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন শুভেন্দু অধিকারী। তবে শপথ গ্রহণের পর রাজনৈতিক উদযাপনের বদলে তিনি বেছে নিলেন বাংলার সংস্কৃতি, ইতিহাস ও আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের পথ।
জোড়াসাঁকো থেকে সূচনা
শপথের পরই শুভেন্দু অধিকারী প্রথমে পৌঁছে যান কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মস্থান জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে। সেখানে কবিগুরুর মূর্তিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান তিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের আধিকারিকদের সঙ্গেও কথা বলেন।
সেখানে দাঁড়িয়ে নতুন মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “বাংলার সংস্কৃতি ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। সেটাকে আবার ফিরিয়ে আনতে হবে। আজ কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মদিনে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বাংলার সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণের সূচনা হল।”
শ্যামাপ্রসাদের বাড়িতে শ্রদ্ধা
এরপর শুভেন্দু পৌঁছে যান ভারত কেশরী ও জনসংঘের প্রতিষ্ঠাতা ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের বাসভবনে। বিজেপির কাছে দীর্ঘদিনের আক্ষেপ ছিল— শ্যামাপ্রসাদের নিজের রাজ্যেই দল কখনও সরকার গড়তে পারেনি। সেই আক্ষেপ ঘুচতেই বাংলার প্রথম বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শুভেন্দুর এই সফর বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল।
সেখানে তিনি বলেন, “বাংলা অনেক পিছিয়ে গিয়েছে। আমাদের হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনতে হবে। একসময় বাংলা ছিল সংস্কৃতির রাজধানী। সত্যজিৎ রায়, উত্তম কুমার, নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর মতো মনীষীদের বাংলাকে আবার নতুন করে সাজাতে হবে।”
ভারত সেবাশ্রম সংঘে প্রণাম
এদিন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ভারত সেবাশ্রম সংঘেও যান। সংঘের প্রতিষ্ঠাতা প্রণবানন্দজী মহারাজের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন তিনি।
শুভেন্দুর বক্তব্য, বাংলার ইতিহাসে এমন একসময় এসেছিল যখন পূর্ববাংলার পরিস্থিতির কারণে রাজ্যের অস্তিত্বই সঙ্কটে পড়েছিল। সেই সময় ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও প্রণবানন্দজীর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই বাংলার নতুন সরকারের প্রথম দিনেই তাঁদের স্মরণ করাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
কালীঘাটে আবেগঘন মুহূর্ত
এরপর কালীঘাট মন্দিরে পুজো দিতে যান শুভেন্দু অধিকারী। সেখানে সাধারণ মানুষের উচ্ছ্বাস ছিল চোখে পড়ার মতো। বহু মানুষ তাঁকে একবার ছুঁয়ে দেখার জন্য ভিড় করেন।
পুজোর পর নিজের হাতেই সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রসাদ বিতরণ করেন মুখ্যমন্ত্রী। সেখানেই তিনি একটি আবেগঘন ঘটনার কথা তুলে ধরেন। শুভেন্দু বলেন, “ভোটের আগে একদিন আমি কালীঘাটে প্রণাম করতে এসেছিলাম। তখন মায়ের পায়ের ফুল এসে আমার হাতে পড়ে। সেদিনই বুঝেছিলাম মা কালী আমার সঙ্গে আছেন। সেই আশীর্বাদের জোরেই আজ আমি আবার এখানে ফিরতে পেরেছি।”
শেষ গন্তব্য চেতলার মা শীতলা মন্দির
দিনের শেষ পর্বে শুভেন্দু অধিকারী পৌঁছে যান চেতলার মা শীতলাদেবীর মন্দিরে। সেখানে পুজো ও প্রণাম করে নিজের প্রথম দিনের কর্মসূচি শেষ করেন তিনি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শপথের পর শুভেন্দুর এই সফর শুধুমাত্র ধর্মীয় বা সৌজন্যমূলক ছিল না; বরং এর মধ্যে ছিল বাংলার সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণ, ঐতিহ্য এবং বাঙালির আত্মপরিচয়কে সামনে আনার স্পষ্ট বার্তা।
Published on: মে ৯, ২০২৬ at ২৩:৪৩



