
বাখারপুরে বন্যা পরিস্থিতির মধ্যে পাশে অখণ্ড শ্রী ক্রিয়াযোগ সাধন মন্দির সেবাশ্রম, আচার্য দেবানন্দ শাস্ত্রীর উদ্যোগে ত্রাণ বিতরণ
Published on: সেপ্টে ৪, ২০২৬ at ২১:৫০
এসপিটি নিউজ, বাখারপুর (পূর্ব মেদিনীপুর), ৪ সেপ্টেম্বর: টানা বৃষ্টিতে জলমগ্ন কাঁথি মহকুমার রামনগর বিধানসভার বাখারপুর-সহ বিস্তীর্ণ এলাকা। কোথাও গলা সমান জল, কোথাও কোমর সমান জল পেরিয়ে চলছে মানুষের যাতায়াত। দিনের পর দিন জলবন্দি অবস্থায় থাকা পরিবারগুলির কাছে এবার পৌঁছল ত্রাণ। বাখারপুরের অখণ্ড শ্রী ক্রিয়াযোগ সাধন মন্দির সেবাশ্রম থেকেই জলবন্দি পরিবারগুলির হাতে তুলে দেওয়া হল প্রয়োজনীয় ত্রাণসামগ্রী।
জলবন্দি মানুষের পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগ নেন অখণ্ড শ্রী ক্রিয়াযোগ সাধন মন্দির সেবাশ্রমের প্রতিষ্ঠাতা শ্রীশ্রী ১০০৮ মহন্ত আচার্য দেবানন্দ শাস্ত্রী। স্থানীয় জলবন্দি পরিবারগুলিকে তিনি আশ্বাস দিয়েছিলেন, তাঁদের কাছে যাতে ত্রাণ পৌঁছয়, তার জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে। সেই মতো বিভিন্ন জায়গায় সাহায্যের জন্য আবেদন জানান তিনি।
তাঁর সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে এগিয়ে আসে রাজ্য সরকারি কর্মচারী কল্যাণ সঙ্ঘ, পূর্ব মেদিনীপুর জেলা শাখা। সংগঠনের পক্ষ থেকে স্থানীয় জলবন্দি পরিবারগুলির জন্য ত্রাণের ব্যবস্থা করা হয়। আশ্রম প্রাঙ্গণে আয়োজিত কর্মসূচিতে আচার্য দেবানন্দ শাস্ত্রীর উপস্থিতিতে তাঁর হাত দিয়েই জলবন্দি পরিবারগুলির হাতে ত্রাণসামগ্রী তুলে দেওয়া হয়।
আচার্য দেবানন্দ শাস্ত্রী বলেন, বর্ষার সময় এই এলাকার মানুষ অত্যন্ত অসহায় হয়ে পড়েন। ঘরবাড়িতে জল ঢুকে যায়, ফলে খাবার ও থাকার সমস্যা তৈরি হয়। আশ্রমের পক্ষ থেকে যতটা সম্ভব মানুষের পাশে থাকার চেষ্টা করা হয়। এবারও আশ্রমের আহ্বানে রাজ্য সরকারি কর্মচারী সঙ্ঘ এগিয়ে এসেছে এবং তারাই এই ত্রাণের ব্যবস্থা করেছে।
তিনি আরও বলেন, “আমরা চাই, এই সব মানুষের পাশে সকলেই থাকুন। যাঁদের যতটুকু সামর্থ্য রয়েছে, তাঁরা নিজেদের সাধ্য অনুযায়ী জলবন্দি পরিবারগুলির পাশে দাঁড়িয়ে সাহায্য করুন।”
জল নামলেও কাটেনি দুর্ভোগ
বাখারপুর-সহ রামনগরের বিস্তীর্ণ এলাকায় টানা বৃষ্টির জেরে পরিস্থিতি কার্যত বন্যার চেহারা নিয়েছিল। রাস্তা, বসতভিটে এবং বিভিন্ন জনপরিসর দিনের পর দিন জলের নিচে ছিল। বর্তমানে কোথাও কোথাও জল কিছুটা নামলেও সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ এখনও কাটেনি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কোনও কোনও এলাকায় কয়েক কিলোমিটার পথ জল পেরিয়ে বাজারে যেতে হচ্ছে। প্রয়োজনীয় কাজ সারতেও অনেককে গলা কিংবা কোমর সমান জল ঠেলে হাঁটতে হচ্ছে। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ হয়ে উঠেছিল যে কোথায় রাস্তা, কোথায় পুকুর বা জলাশয়—তা বোঝা কঠিন হয়ে পড়েছিল বলে দাবি স্থানীয়দের।
জল ঢুকে পড়ায় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্ধ রাখতে হয়েছে বলেও স্থানীয় সূত্রের দাবি। এমনকি জল ঢুকে পড়েছিল অখণ্ড শ্রী ক্রিয়াযোগ সাধন মন্দির সেবাশ্রমের প্রাঙ্গণেও। জলবন্দি মানুষের জন্য তৈরি ত্রাণ শিবিরগুলির পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা।
গলা সমান জলে ওষুধ নিয়ে ছুটছেন আশা কর্মীরা
এই দুর্যোগের মধ্যে সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে এলাকার আশা কর্মীদের। সরকারি নির্দেশ মেনে জলবন্দি মানুষের বাড়ি বাড়ি ওষুধ পৌঁছে দিতে গিয়ে তাঁদের একাংশকে গলা সমান জল পেরিয়ে কয়েক কিলোমিটার পথ হাঁটতে হয়েছে বলে অভিযোগ।
কোথাও নৌকা বা অন্য কোনও জলযানের ব্যবস্থা না থাকায় হাতে ওষুধের প্যাকেট নিয়ে, কখনও আবার মাথার উপরে ওষুধ তুলে জল ঠেলে মানুষের কাছে পৌঁছতে হয়েছে তাঁদের। ফলে স্বাস্থ্য পরিষেবা পৌঁছে দিতে গিয়ে নিজেদের জীবন ও স্বাস্থ্যের ঝুঁকিও নিতে হয়েছে এই কর্মীদের।
অন্যদিকে প্রশাসনিক আধিকারিক থেকে জনপ্রতিনিধিদের কখনও ট্রাক্টরে, কখনও জলযানে করে জলমগ্ন এলাকা পরিদর্শন করতে দেখা গিয়েছে। কিন্তু স্থানীয়দের প্রশ্ন, পরিদর্শনের পরও কি সমস্যার কোনও স্থায়ী সমাধানের পথ তৈরি হয়েছে?
যোগাযোগ ব্যবস্থার স্থায়ী সমাধানের দাবি
বাখারপুরবাসীর অভিযোগ, এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরেই দুর্বল। রামনগর মূল শহর থেকে গ্রামের দূরত্বও যথেষ্ট। পরিবহণ ব্যবস্থা সীমিত এবং রাস্তার অবস্থাও দীর্ঘদিন ধরে খারাপ। স্বাভাবিক সময়েই যেখানে যাতায়াত কঠিন, সেখানে টানা বৃষ্টির পর সেই রাস্তাগুলি কার্যত জলের নিচে চলে যায়।
স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ, আগের সরকারের আমলে যে সমস্যা ছিল, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পরও তার উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়নি। যদিও প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এটি দীর্ঘদিনের সমস্যা এবং নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর পরিস্থিতির বিভিন্ন দিক খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি আগের সরকারের দীর্ঘদিনের অব্যবস্থার অভিযোগও উঠেছে।
তবে জলবন্দি মানুষের বক্তব্য, প্রশাসনিক পরিদর্শনের পাশাপাশি এবার প্রয়োজন বাস্তব ও স্থায়ী পদক্ষেপ। জরুরি সময়ে নিরাপদ যাতায়াতের ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত ত্রাণ ও খাদ্য পৌঁছে দেওয়া, স্বাস্থ্য পরিষেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে রাস্তা উঁচু করা এবং কার্যকর জল নিষ্কাশন ব্যবস্থা গড়ে তোলার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
বৃষ্টির জল কিছুটা কমলেও বাখারপুরের মানুষের দুর্ভোগের ছবি তাই এখনও স্পষ্ট। আর সেই দুর্যোগের মধ্যেই আশ্রম প্রাঙ্গণ থেকে জলবন্দি পরিবারগুলির হাতে পৌঁছে যাওয়া ত্রাণ কিছুটা হলেও স্বস্তি এনে দিয়েছে বানভাসি মানুষের জীবনে।


Published on: সেপ্টে ৪, ২০২৬ at ২১:৫০




