পর্ব ৬ | ঋগ্বেদের ‘ধর্মাণি সনতা’—এটাই কি সনাতন ধর্ম?

Main দেশ ধর্ম ভ্রমণ রাজ্য
শেয়ার করুন

একটি বৈদিক পংক্তি, একটি বহুল ব্যবহৃত দাবি এবং তার প্রকৃত অর্থ
Published on: সেপ্টে ২২, ২০২৬ at ১৯:৪৬
✍️ লিখছেন অনিরুদ্ধ পাল। সংবাদ প্রভাকর টাইমস

এসপিটি বিশেষ প্রতিবেদন: ‘সনাতন ধর্ম’—এই শব্দবন্ধকে ঘিরে আজকের ভারতীয় সমাজে একটি অত্যন্ত প্রচলিত ধারণা রয়েছে। অনেকেই মনে করেন, বৈদিক যুগ থেকেই ভারতীয়দের ধর্মের নাম ছিল ‘সনাতন ধর্ম’ এবং তারই প্রমাণ ঋগ্বেদের একটি পংক্তিতে পাওয়া যায়—‘ধর্মাণি সনতা’।

কিন্তু ইতিহাস ও প্রাচীন সংস্কৃত পাঠের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থেকেই যায়— ঋগ্বেদের ‘ধর্মাণি সনতা’ কি সত্যিই ‘সনাতন ধর্ম’ নামের একটি ধর্মকে বোঝায়?

নাকি এই পংক্তির অর্থ সম্পূর্ণ অন্য কিছু?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে কোনও আধুনিক ব্যাখ্যা দিয়ে শুরু করা যাবে না। ফিরে যেতে হবে ঋগ্বেদের মূল সংস্কৃত পাঠে।

ঋগ্বেদের তৃতীয় মণ্ডল, তৃতীয় সূক্ত, প্রথম মন্ত্র

যে পংক্তিটি নিয়ে এত আলোচনা, সেটি রয়েছে ঋগ্বেদ ৩.৩.১-এ। মূল সংস্কৃত পাঠের সংশ্লিষ্ট অংশটি হল— “অগ্নির্হি দেবাঁ অমৃতো দুৱস্যত্যথা ধর্মাণি সনতা ন দূদুষৎ।”

এর একটি প্রচলিত পাঠরূপ— “agnir hi devām̐ amṛto duvasyaty athā dharmāṇi sanatā na dūduṣat”

এই মন্ত্রে অগ্নিকে কেন্দ্র করে স্তোত্র রচিত হয়েছে। সংশ্লিষ্ট অংশের ভাবার্থে বলা হচ্ছে—অমর অগ্নি দেবতাদের সেবা করেন; অতএব প্রাচীন বা চিরস্থায়ী বিধানগুলিকে যেন কেউ নষ্ট বা লঙ্ঘন না করে। বিভিন্ন অনুবাদে ‘ধর্মাণি সনতা’-র অর্থে কিছু পার্থক্য দেখা যায়।

এখানেই আমাদের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা প্রয়োজন। মূল পাঠে ‘সনাতন ধর্ম’ নামে কোনও দ্বিপদী ধর্মনাম নেই। আছে— ধর্মাণি সনতা। এই দুটি শব্দের ব্যাকরণগত অবস্থানও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ধর্মাণিশব্দের অর্থ কী?

‘ধর্মাণি’ হল ‘ধর্ম’ শব্দের বহুবচন রূপ। অর্থাৎ এখানে একটি একক ‘ধর্ম’-এর কথা বলা হচ্ছে না। প্রাচীন বৈদিক ভাষায় ‘ধর্ম’ শব্দের অর্থও কেবল আজকের প্রচলিত অর্থে কোনও নির্দিষ্ট ধর্মসম্প্রদায় নয়।

‘ধর্ম’ শব্দের অর্থের পরিসর অনেক বিস্তৃত। এর মধ্যে থাকতে পারে— বিধান, নিয়ম, কর্তব্য, প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থা, আচরণবিধি, নৈতিক কর্তব্য কিংবা কোনও কিছুকে ধারণ করে রাখার নীতি। ঋগ্বেদের এই মন্ত্রে ‘ধর্মাণি’ বহুবচন। ফলে এটিকে সরাসরি একটি নির্দিষ্ট ধর্মের নাম হিসেবে পড়া ভাষাগতভাবে যথেষ্ট সমস্যাজনক।

আরও গুরুত্বপূর্ণ—‘সনতাকিসনাতন’?

এখানেই এই পর্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। আজকের সংস্কৃত ও ভারতীয় ভাষায় আমরা ‘সনাতন’ শব্দটির অর্থ সাধারণত বুঝি— চিরন্তন, শাশ্বত, অনাদি, অবিনশ্বর বা সর্বদা বিদ্যমান।

কিন্তু ঋগ্বেদের ৩.৩.১-এর মূল পাঠে যে শব্দটি রয়েছে, সেটি হল— ‘সনতা’

সরাসরি ‘সনাতন’ নয়।

প্রাচীন বৈদিক ভাষার শব্দরূপ ও পরবর্তী সংস্কৃতের শব্দরূপকে একইভাবে বিচার করা যায় না। ‘সনতা’-র অর্থ নির্ধারণেও বৈদিক ব্যাকরণ ও শব্দব্যবহারের প্রেক্ষাপট বিবেচনা করা প্রয়োজন। প্রচলিত অনুবাদগুলিতে একে ‘প্রাচীনকাল থেকে’, ‘চিরন্তনভাবে’, ‘প্রাচীন বিধান’ কিংবা ‘চিরস্থায়ী কর্তব্য’ জাতীয় অর্থে নেওয়া হয়েছে।

অতএব— ‘ধর্মাণি সনতা’ দেখেই সেটিকে ‘সনাতন ধর্ম’ বলে অনুবাদ করা ভাষাতাত্ত্বিকভাবে অতিরিক্ত সরলীকরণ।

এখানে শব্দের সাদৃশ্য আছে, কিন্তু তার অর্থ ও ব্যাকরণগত অবস্থান পরীক্ষা না করে দুটিকে এক করে ফেলা ঠিক হবে না।

তাহলেধর্মাণি সনতাবলতে কী বোঝানো হয়েছে?

ঋগ্বেদের মন্ত্রটির সম্পূর্ণ প্রেক্ষাপট দেখলে বোঝা যায়, এখানে অগ্নি ও দেবতাদের উদ্দেশে বৈদিক স্তোত্র রচিত হচ্ছে। শেষাংশে বলা হচ্ছে—‘ধর্মাণি সনতা ন দূদুষৎ।’

এর ভাবার্থ দাঁড়ায়— প্রাচীনকাল থেকে প্রতিষ্ঠিত বিধান বা কর্তব্য যেন নষ্ট না হয়। এখানে ‘ধর্মাণি’ বহুবচন এবং ‘সনতা’ সেই ধর্মসমূহের প্রাচীনতা বা স্থায়িত্বের ধারণা বহন করছে।

অর্থাৎ— ‘ধর্মাণি সনতা’ = প্রাচীন বা চিরস্থায়ী বিধানসমূহ / কর্তব্যসমূহ

এমন ব্যাখ্যা মূল পাঠের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

কিন্তু— ‘ধর্মাণি সনতা’ = ‘সনাতন ধর্ম’ নামে একটি নির্দিষ্ট ধর্ম

এমন সরাসরি সমীকরণ মূল পাঠ নিজে প্রতিষ্ঠা করে না।

একটি শব্দের সঙ্গে একটি ধর্মের নামকে গুলিয়ে ফেলা যাবে না

এখানে একটি মৌলিক পার্থক্য মনে রাখা দরকার।

একটি প্রাচীন গ্রন্থে যদি বলা হয়— “এই কর্তব্য চিরন্তন”

তার অর্থ এই নয় যে— “এই ধর্মের নাম চিরন্তন ধর্ম।”

প্রথমটি একটি ধারণা বা গুণের কথা বলে। দ্বিতীয়টি একটি ধর্মীয় পরিচয়ের নাম নির্দেশ করে।

প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্যে ‘সনাতন’ বা তার বৈদিক রূপের ব্যবহার বহু ক্ষেত্রেই চিরস্থায়ী, প্রাচীন, অব্যাহত বা সর্বকালীন কোনও নীতি, কর্তব্য বা সত্যের ধারণা প্রকাশ করে।

তাই কোনও একটি শব্দবন্ধের উপস্থিতিকে আধুনিক অর্থে একটি পূর্ণাঙ্গ ধর্মের নামের প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করার আগে তার সময়কাল, ব্যাকরণ, প্রসঙ্গ এবং অন্যান্য প্রাচীন ব্যবহারের সঙ্গে তুলনা করা প্রয়োজন।

তাহলে কিসনাতন ধর্মশব্দবন্ধ প্রাচীন নয়?

এখানে আবার একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য করতে হবে। ‘সনাতন’ শব্দটি প্রাচীন। ‘ধর্ম’ শব্দটিও অত্যন্ত প্রাচীন।

‘সনাতন ধর্ম’ বা তার বিভিন্ন ব্যাকরণগত রূপও প্রাচীন সংস্কৃত সাহিত্যে পাওয়া যায়। কিন্তু এখান থেকে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায় না যে— প্রাচীনকাল থেকেই সমগ্র ভারতীয় ধর্মীয় পরম্পরার একটি একক, সর্বজনস্বীকৃত নাম ছিল ‘সনাতন ধর্ম’।

আধুনিক গবেষণায় এই দুই বিষয়কে আলাদা করে দেখা হয়। পিটার হীহসের সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখানো হয়েছে, ‘সনাতন ধর্ম’ শব্দবন্ধটি শাস্ত্রীয় ও মধ্যযুগীয় সংস্কৃত সাহিত্যে বহুবার ব্যবহৃত হলেও তখন এটি ভারতের মানুষের সমস্ত ধর্মীয় বিশ্বাস ও আচরণের সাধারণ নাম হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে—এমন প্রমাণ নেই। তাঁর গবেষণা অনুযায়ী, পরবর্তী ঔপনিবেশিক যুগে, বিশেষত উনিশ শতকের শেষভাগে, ‘সনাতন ধর্ম’ ধীরে ধীরে বর্তমান অর্থে হিন্দু ধর্মের সমার্থক পরিচয় হিসেবে ব্যবহৃত হতে শুরু করে।

অর্থাৎ— শব্দটি প্রাচীন, কিন্তু তার আধুনিক ধর্মপরিচয় হিসেবে ব্যবহার অনেক পরের ঘটনা। এই পার্থক্যটিই এই গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

মহাভারতেসনাতন ধর্ম’—কী বলা হয়েছে?

ঋগ্বেদের পরবর্তী সংস্কৃত সাহিত্যে আমরা আরও স্পষ্টভাবে এমন বাক্য দেখতে পাই— “এষ ধর্মঃ সনাতনঃ”

অর্থাৎ— “এটাই সনাতন ধর্ম”

কিন্তু এখানে আবার প্রসঙ্গটি দেখতে হবে। মহাভারতের বিভিন্ন স্থানে এই ধরনের বাক্য কোনও নির্দিষ্ট ধর্মসম্প্রদায়ের নাম হিসেবে ব্যবহৃত হয়নি। বরং কোনও বিশেষ কর্তব্য, আচরণ বা নীতিকে চিরন্তন বা সর্বকালীন কর্তব্য হিসেবে বোঝাতে এই ধরনের বাক্য ব্যবহৃত হয়েছে।

অর্থাৎ— ‘সনাতন ধর্ম’ কথাটির প্রাচীন ব্যবহার ছিল মূলত একটি নীতি, কর্তব্য বা চিরস্থায়ী বিধানের ধারণার সঙ্গে যুক্ত।

এটি আধুনিক অর্থে একটি সুসংগঠিত ধর্মীয় পরিচয়ের নাম ছিল—এমন সিদ্ধান্ত সরাসরি টানা যায় না।

মনুস্মৃতিতেও একই ধরনের ব্যবহার

মনুস্মৃতির একটি বহুল আলোচিত শ্লোকে বলা হয়েছে—

সত্যং ব্রূয়াত্ প্রিয়ং ব্রূয়ান্
ব্রূয়াত্ সত্যমপ্রিয়ম্।
প্রিয়ং নানৃতং ব্রূয়াদ্
এষ ধর্মঃ সনাতনঃ॥

ভাবার্থ— সত্য কথা বলবে, প্রিয় কথা বলবে; কিন্তু অপ্রিয় সত্য এমনভাবে বলবে না যা অনর্থ সৃষ্টি করে। আবার মনোরম হলেও মিথ্যা কথা বলবে না—এই হল সনাতন ধর্ম। এখানে ‘সনাতন ধর্ম’ বলতে কোনও পৃথক ধর্মসম্প্রদায়ের নাম বোঝানো হচ্ছে না। এখানে একটি নৈতিক কর্তব্যকে চিরন্তন ধর্ম বলা হচ্ছে।

অর্থাৎ— সনাতন = চিরন্তন

ধর্ম = কর্তব্য বা নীতি

দুটি মিলে এখানে অর্থ দাঁড়াচ্ছে— চিরন্তন নৈতিক কর্তব্য।

ভগবদ্গীতাতেও কিসনাতন ধর্মধর্মের নাম?

ভগবদ্গীতার একাদশ অধ্যায়ের অষ্টাদশ শ্লোকে কৃষ্ণকে উদ্দেশ করে বলা হয়েছে—

শাশ্বতধর্মগোপ্তা
সনাতনস্ত্বং পুরুষো মতো মে।

এখানে ‘শাশ্বত ধর্ম’-এর রক্ষক এবং ‘সনাতন পুরুষ’-এর কথা রয়েছে। অর্থাৎ ‘সনাতন’ শব্দটি সেখানে একটি চিরন্তন সত্তা বা পুরুষের বিশেষণ হিসেবে ব্যবহৃত। এখানেও ‘সনাতন’ শব্দটি একটি ধর্মের নাম হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে—এমন সরাসরি প্রমাণ পাওয়া যায় না।

বরং দেখা যাচ্ছে— সনাতন = চিরন্তন

ধর্ম = নীতি, কর্তব্য বা বিধান

এই অর্থগত পরিসরেই শব্দগুলি ব্যবহৃত হচ্ছে।

তাহলে ঋগ্বেদেরধর্মাণি সনতাআমাদের কী শেখায়?

এই একটি বৈদিক পংক্তি আমাদের অন্তত তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শেখায়।

প্রথমত, ‘ধর্ম’ শব্দের ইতিহাস অত্যন্ত প্রাচীন এবং বৈদিক যুগেই এর ব্যবহার ছিল। দ্বিতীয়ত, চিরস্থায়ী বা প্রাচীন বিধান, কর্তব্য ও নীতির ধারণাও বৈদিক সাহিত্যে উপস্থিত। তৃতীয়ত, কিন্তু ঋগ্বেদের ‘ধর্মাণি সনতা’কে সরাসরি আধুনিক অর্থে ‘সনাতন ধর্ম’ নামের একটি ধর্মের প্রাচীনতম নাম বলে ঘোষণা করা যায় না।

কারণ মূল পাঠে রয়েছে ‘ধর্মাণি সনতা’, আর তার ব্যাকরণগত ও প্রসঙ্গগত অর্থ আধুনিক ধর্মপরিচয়ের চেয়ে অনেক বিস্তৃত।

তাহলেসনাতন ধর্মনামটি কখন আধুনিক অর্থ পেল?

এই প্রশ্নের উত্তর আমাদের গবেষণার পরবর্তী পর্বগুলির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

প্রাচীন সংস্কৃত সাহিত্যে ‘সনাতন’ এবং ‘ধর্ম’—দুটি শব্দই বহু পুরনো। বিভিন্ন প্রসঙ্গে তাদের সমন্বিত অর্থও পাওয়া যায়। কিন্তু সমগ্র ভারতীয় ধর্মীয় পরম্পরার একটি সাধারণ নাম হিসেবে ‘সনাতন ধর্ম’-এর ব্যবহার অনেক পরের ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার ফল।

আধুনিক গবেষক পিটার হীহসের মতে, ঊনবিংশ শতকের শেষভাগে ধর্মীয় পরিচয়, সংস্কার, ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয় নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, তার মধ্যে ‘সনাতন ধর্ম’ একটি নতুন শক্তিশালী আত্মপরিচয়ের ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে শুরু করে।

অর্থাৎ ইতিহাসের ছবিটি এমন নয় যে— প্রাচীন যুগ → একই নামে একটি একক ধর্ম → আধুনিক যুগ। বরং ছবিটি অনেক বেশি জটিল। প্রাচীন শব্দ → চিরন্তন কর্তব্য ও বিধানের ধারণা → বিভিন্ন শাস্ত্রে বিভিন্ন প্রসঙ্গে ব্যবহার → মধ্যযুগীয় নানা ধর্মীয় পরম্পরা → ঔপনিবেশিক যুগের ধর্মীয় আত্মপরিচয়ের নতুন নির্মাণ → আধুনিক ‘সনাতন ধর্ম’ পরিচয়। এই দীর্ঘ পরিবর্তনকে না বুঝলে ‘সনাতন ধর্ম’ শব্দটির ইতিহাসও বোঝা সম্ভব নয়।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন: তাহলে কিসনাতন ধর্মভুল নাম?

না। ইতিহাসের দৃষ্টিতে এমন সিদ্ধান্তও সঠিক হবে না। আজ বহু মানুষ নিজেদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয় হিসেবে ‘সনাতন’ বা ‘সনাতন ধর্ম’ ব্যবহার করেন। সেটি একটি বাস্তব আধুনিক পরিচয়।

কিন্তু একজন ইতিহাস-অনুসন্ধানীকে আলাদা করে দেখতে হবে— একটি শব্দের প্রাচীন অর্থ কী ছিল, একটি শব্দবন্ধ প্রাচীন সাহিত্যে কোন প্রসঙ্গে ব্যবহৃত হয়েছিল, এবং কোন সময়ে সেটি একটি বৃহত্তর ধর্মীয় পরিচয়ের নাম হয়ে উঠল। এই তিনটি বিষয় এক নয়।

ঋগ্বেদেরধর্মাণি সনতা’—শেষ কথা কী?

এই পর্বের অনুসন্ধান থেকে সবচেয়ে সতর্ক ও তথ্যনির্ভর সিদ্ধান্ত হল— ঋগ্বেদ ৩.৩.১-এ ‘ধর্মাণি সনতা’ শব্দবন্ধ রয়েছে।

এখানে ‘ধর্মাণি’ বহুবচন এবং প্রসঙ্গটি বৈদিক বিধান, কর্তব্য বা প্রতিষ্ঠিত নীতির সঙ্গে সম্পর্কিত। ‘সনতা’ শব্দটিকে সরাসরি পরবর্তী সংস্কৃতের ‘সনাতন’ এবং ‘ধর্মাণি সনতা’কে সরাসরি ‘সনাতন ধর্ম’ নামে একটি ধর্মপরিচয়ের সঙ্গে এক করে দেখা ভাষাতাত্ত্বিকভাবে নিরাপদ নয়।

তাই— ঋগ্বেদে ‘ধর্ম’ ও চিরস্থায়ী বিধানের ধারণার প্রাচীন উপস্থিতির প্রমাণ আছে; কিন্তু এই পংক্তিকে আধুনিক অর্থে ‘সনাতন ধর্ম’ নামের একটি ধর্মের প্রমাণ বলা যায় না।

এটি বিশ্বাসের প্রশ্ন নয়। এটি মূল পাঠ, ভাষা, ব্যাকরণ এবং ইতিহাসের প্রশ্ন।

আর সেই কারণেই এই গবেষণায় একটি নীতিই সামনে রাখা জরুরি— প্রাচীন শাস্ত্রে কোনও শব্দ পাওয়া গেলেই তার আধুনিক অর্থ সেখানে বসিয়ে দেওয়া যাবে না। শব্দের ইতিহাসকে তার নিজের সময়ের ভিতরেই বুঝতে হবে।

এই পর্বের সূত্রসমূহ
. ঋগ্বেদতৃতীয় মণ্ডল, তৃতীয় সূক্ত, প্রথম মন্ত্র
‘ধর্মাণি সনতা’ পংক্তির মূল সংস্কৃত পাঠ ও পাঠভিত্তিক অনুবাদ।
. ঋগ্বেদের প্রাচীন অনুবাদ ব্যাখ্যাগ্রন্থ
মূল পাঠের বিভিন্ন অনুবাদ ও ব্যাখ্যার তুলনা।
. মহাভারত মনুস্মৃতি
‘এষ ধর্মঃ সনাতনঃ’ ধরনের ব্যবহারের প্রাচীন উদাহরণ।
. ভগবদ্গীতা, একাদশ অধ্যায়, অষ্টাদশ শ্লোক
‘শাশ্বতধর্মগোপ্তা’ ও ‘সনাতন পুরুষ’—শব্দদুটির প্রসঙ্গগত ব্যবহার।
. পিটার হীহসের গবেষণা
‘সনাতন ধর্ম’-এর ঐতিহাসিক বিকাশ এবং আধুনিক ধর্মপরিচয় হিসেবে এর ব্যবহারের ইতিহাস নিয়ে সাম্প্রতিক গবেষণা।
পরবর্তী পর্ব
পর্ব উপনিষদে কিসনাতন ধর্ম’?

উপনিষদেধর্ম’,
সনাতন’,
আত্মা,
ব্রহ্ম,
মোক্ষকীভাবে এসেছে?

এখানে একটি বিষয় অত্যন্ত সতর্কভাবে করা দরকার:

কোন উপনিষদে ঠিক কোন শব্দ আছে, সংস্কৃত মূলপাঠে তা যাচাই করে তারপর দাবি করতে হবে।

লিখছেন অনিরুদ্ধ পাল
বিশ্বাসের প্রতি শ্রদ্ধা, ইতিহাসের প্রতি দায়বদ্ধতা।

Published on: সেপ্টে ২২, ২০২৬ at ১৯:৪৬


শেয়ার করুন