SUNDAY HORROR: ভোমা

Main রাজ্য সাহিত্য
শেয়ার করুন

লেখক: সুমিত গুপ্ত

Published on: ডিসে ১৫, ২০১৯ @ ১৭:০০

(১)

সুরুল থেকে রতনপুর অনেক দূরের পথ । একটা বদ্ধপাগল  রোগীকে  নিয়ে একা এদদূর কি করে এলেন,একটা নিমগাছের তলায় বসে তাই ভাবছিলেন নিতাই। রতন পুরের নাম বলায় বাসের কনডাক্টর ওদের এখানেই নামিয়ে দিয়ে গেছে। পিচ রাস্তার ধারে এই নিম গাছটার বেশ ঘন ছায়া । জ্যৈষ্ঠ মাসের ঠা ঠা রোদ্দুরে তারই ছায়ায় ভাইকে নিয়ে বসে একটু জিরিয়ে নিচ্ছিলেন নিতাই সাঁপুই।  ভাই রাঘব, বয়স কুড়ির বেশি নয় । প্রায় বছর দুয়েক সে আর স্বাভাবিক জগতে নেই। সারা দিন নিজের ঘরে থাকে, খায় না, ঘুমায় না। মাটির দিকে তাকিয়ে শুধু নিজের মনে বিড়বিড় করে। মাঝেমধ্যে কাউকে চিনতে পারে না। এমন কেঁপে ওঠে যে ছেড়ে রাখা দায় হয়ে পড়ে। তখন ঘরে তালাবন্ধ করে কিংবা উঠোনের কোনে কাঁঠাল গাছের সঙ্গে পায়ে শিকল দিয়ে বেঁধে  রাখতে হয় তাকে। কখন কি করে বসে, বলা কি যায়! বাড়িতে ভাইয়ের দেখাশোনা শুশ্রুষা নিতাই নিজেই করে । পাগল ভাইকে এদদিন ধরে তো অন্যের ভরসায় ছেড়ে দেওয়া যায় না। অথচ দু’বছর আগেও সব ঠিকঠাক ছিল। নিতাইয়ের মুদিখানার ব্যবসার কাজকর্ম দেখতে সব ঠিকঠাক ছিল । নিতাইয়ের মুদিখানার ব্যবসার কাজকর্ম  দেখতো, খেলতো, ঘুরতো আড্ডা মারতো । কারো কোনো কাজে না ছিল না তার।বড় সাদা সিধে ছেলে ছিল রাঘব । নেশা ছিল একটাই, মাছ ধরা । নিত্যদিন গাঁয়ের এ পুকুরে ও দীঘিতে সে বাঁওড়ে ছিপ ফেলে বেড়াতো রাঘব । সেই মাছ ধরাই যে তার কাল হয়ে যাবে কে জানতো । নিতাইদের গ্রামে মালোপাড়ার পশ্চিম দিকে একটা বড় মাঠ আছে । মাঠের পরেই বিরাট জলা-জঙ্গল ।মাঠ আর সেই জলার মাঝে একটা বড় মজা পুকুর আছে । গাঁয়ের কেউ কখনো সে পুকুরে জাল ফেলেনি । রাঘবের কি খেয়াল গেলো একদিন রাতে একটা গাঁতি জাল নিয়ে সে একাই নামলো সেই পুকুরে । ব্যাস, সেদিন থেকেই তার এ অবস্থা ।

এই দু’বছরে ভাইকে নিয়ে কম ডাক্তার – বদ্দি করেনি নিতাই । কোথাও কিছু হয় নি । উল্টে দিন দিন পাগলামো আরো বেড়েছে ।হাল প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলো নিতাই, সেই সময় নিতাইয়ের সুমুন্দি হারানের মুখে রতনপুরের মাধব মুখুয্যের নাম শুনলো সে । মাধব তাদের তল্লাটের একজন দাপুটে রোজা । সেই সঙ্গে সে আবার ঘোর তান্ত্রিক । তার থাপ্পড় খেয়ে কত ভুত-প্রেতের নাকি কাছা খুলে গেছে । জীন, পিশাচদের নিয়ে সে নাকি ঘর করে । কত লোকের কত জটিল ব্যাধি নাকি তার চিমটার এক ঘায়ে জল হয়ে গেছে । শুনে নিতাই ভাবলো একটা শেষ চেষ্টা করেই দেখা যাক না । লাভ বই ক্ষতি তো কিছু নেই ।

পিচ রাস্তা থেকে যে মেঠো রাস্তাটা ধান খেতে নেমে গেছে সেটা বড় জোর আরো ক্রোশ দুয়েক হবে । এখান থেকে রতনপুরের ছোট-ছোট বাড়িঘর, গাছপালাগুলো দেখা যাচ্ছে । রাস্তাটাও এঁকে বেঁকে সেদিকেই গেছে । ভাই এখন একটু ভালো ।এইবেলা ওকে নিয়ে রওনা দিলে বিকেলের আগেই রতনপুর পৌঁছে যাওয়া যাবে । এই ভেবে ছাতাটা খুলে রাঘবকে নিয়ে তপ্ত মাঠে নেমে পড়লো নিতাই ।

গ্রামে পৌঁছে মাধবের বাড়ি খুঁজে পেতে কোনো অসুবিধাই হলো না নিতাইয়ের । অনেকটা জমি নিয়ে একতলা বাড়ি , বড় উঠোন । চার-পাঁচটা ঘর। তারই একটায় বসে মাধব ।শনি-মঙ্গলবার বাদে । ঘর রোগীদের ভিড়ে ঠাসা । মাধবের দেখা পাওয়া তো দূরের কথা ভিড় ঠেলে ঘরে ঢুকতেই পারলো না নিতাই ।উঠোনের একদিকে মা বগলামুখীর মন্দির । মায়ের মন্দিরের সামনে শান বাঁধানো ছোট্ট এক টুকরো চাতাল । ভাইকে  নিয়ে তাতেই বসে রইলো নিতাই । মন্দিরের গায়ে বিশাল ঝাঁকড়া একটা তেঁতুল গাছ।সেই গাছের গোড়ায় এবার একটা জিনিস চোখে পড়লো তার । জিনিস নয় জীব । একটা কুচকুচে কালো বেড়াল কুন্ডলি পাকিয়ে শুয়ে আছে । এরপর হঠাৎ যেটায় চোখ পড়ল নিতাইয়ের তাতে সে বেশ অবাকই হয়ে গেলো ।বেড়ালটার গলায় বাঁধা আছে একটা মোটা তাগড়াই লোহার শিকল । গেরস্থ বেড়াল অনেক দেখেছে নিতাই ।তবে এমন কালো বেড়াল খুব একটা কাউকে পুষতে দেখেনি সে । আর একেবারেই যেটা কোনোদিন দেখেনি, সেটা হলো বেড়ালকে গলায় শিকল দিয়ে বেঁধে রাখতে । হঠাৎ রাঘব একটা কান্ড করে বসলো । বেড়ালটাকে সেও এতক্ষন লক্ষ্য করছিলো, নিতাই সেটা খেয়াল করেনি । বেড়ালটাকে দেখে  হঠাৎ তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলো রাঘব।কাছাকাছি পড়ে থাকা একটা খান ইঁট কুড়িয়ে বেড়ালটাকে প্রায় মারতে যাচ্ছিলো সে । শেষ মুহূর্তে তাকে ধরে ফেললো নিতাই । অমনি বেড়ালটাও এমনভাবে দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে উঠলো যে তাই দেখে বুকের ভিতরটা হীম হয়ে গেলো নিতাইয়ের । কি ভাগ্যি অন্য কেউ লক্ষ্য করেনি ঘটনাটা তাই রক্ষে।অনেক কষ্টে ভাইকে শান্ত করলো নিতাই । তারপর থেকে সারাক্ষন বেড়ালটা রাঘবের দিকেই তাকিয়ে রইলো ।

(২)

সন্ধ্যার একটু আগে রোগীদের ঘর ফাঁকা হয়ে গেলে একজন বেঁটে খাটো ধুতিপরা কম বয়সী ছেলে বেরিয়ে এলো । নিতাইদের  বসে থাকতে দেখে সে কাছে এসে একটু বিরক্তি দেখিয়ে জিজ্ঞাসা করল, “কে তোমরা ? কোথা থেকে এসেছো ? কি দরকার ?”নিতাইয়ের কাছে সবকিছু শোনার পর সে একটু নরম হলো । সে আবার ফিরে গিয়ে রোগীদের ঘরে ঢুকে গেলো । একটু বাদে ঘরের রোয়াকে বেরিয়ে এসে হাত দিয়ে ইশারা করে ওদের ভিতরে ডাকলো ।

ঘরে ঢুকে নিতাই দেখলো ঘরের মাঝখানে মেঝেয় পাতা লাল কিংখাবের আসনে বসে আছেন এক গেরুয়াধারী সাধুবাবা । একগাল দাঁড়ি-গোঁফ । চোখদুটো আধবোঁজা ।বয়স যে কত বোঝা শক্ত । আসনের ডানপাশে একটা হাকিকের মালা, কয়েকটা মানুষের হাড়গোড় আর একটা খুলি । বাঁদিকে কয়েকটা মোটা মোটা পুরোনো বই আর একটা বেতের ঝুড়িতে রাখা কিছু টাটকা জবাফুল । বাবা ওই  অবস্থায় নিতাইদের ইশারায় মাটিতে বসতে বললেন । বেঁটেখাটো লোকটা ঘরের এক কোনে ঠায় দাঁড়িয়েই রইলো ।এইভাবে কিছুক্ষন কাটার পর গমগম করে উঠলো বাবার গলা ।

জিজ্ঞাসা করলেন,”বাড়িতে আগে বেলগাছ ছিল?”নিতাই আমতা আমতা করে বললো, “আজ্ঞে ।বাবার আমলে ছিল । কাটা পড়েছে অনেকদিন আগে ।”

বাবা আবার প্রশ্ন করলেন, “গাছটা বাড়ির কোন দিকে ছিল, ঈশান কোনে ?”নিতাই কান চুলকে হেঁচকি খেয়ে বললো, “আ–আজ্ঞে হ্যাঁ।”

বাবার তৃতীয় প্রশ্ন, “যে পুকুরে ভাই নেমেছিল সেটা কি প্রতিষ্ঠা করা পুকুর ?”নিতাই একটু ভেবে নিয়ে বললো, “সেটা ঠিক জানি না বাবাজি।”

বাবা আর কথা বাড়ালেন না, উঠে পড়লেন । নিতাইও সঙ্গে সঙ্গে জোড়হাত করে উঠে পড়লো । ব্যস্ত হয়ে বললো , “বাবা আমরা কি তাহলে —!!”

মাধব বাবা বললেন, “এখন এখানে কিচ্ছু হবে না । পরশু অমাবস্যা । ঐদিন রাতে পঞ্চমুন্ডীর আসনে বসে যা করার করবো খন। ওই দিন এস ।ভেবো না, ও ঠিক হয়ে যাবে ।যদি অবিশ্যি কালকের ফাঁড়াটা কেটে যায় ।এই দু’দিন ভাইকে একটু চোখে চোখে রেখো ।ভুলেও কিন্তু ওকে একা ছেড়ো না ।”

কেন ফাঁড়া , কিসের ফাঁড়া জিজ্ঞেস করতে গিয়েও করতে পারলো না নিমাই ।

বাবা চলেই যাচ্ছিলেন হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে নিতাইকে জিজ্ঞাসা করলেন, “এ গাঁয়ে কোনো আত্মীয়-স্বজন আছে ? চেনা শুনো ?” অসহায়ের মতো মাথা নাড়লো নিমাই ।

এবার বেঁটে ছেলেটাকে বাবা বললেন, “নন্দ, এদের কাছেপিঠে কোথাও দু’একদিন থাকার ব্যবস্থা করো ।যা খরচ লাগে আমি দেব ।” এই বলে বাবা বেরিয়ে গেলেন ।

বাবার বাড়ির কাছেই নন্দর বাড়ি ।শেষমেশ তার  বাড়িতেই একটা ঘরে নিতাইদের থাকার ব্যবস্থা হয়ে গেলো ।পৈতৃক বাড়িতে নন্দ একাই থাকে ।বাপ্-মা মরা ছেলে । ও পাড়ার এক বামুন-ঝি সকালে এসে দু’বেলার রান্না করে দিয়ে যায় । নন্দ ছেলে ভালো ।এসে ইস্তক নিতাইয়ের ভাইয়ের সঙ্গে তার বেশ ভাব জমে গেলো ।রাঘব ভালো থাকলে তার ব্যারাম কিছু বোঝার উপায় নেই ।লোকের সঙ্গে মিশে গিয়ে বেশ খোশ-গপ্পো করে ।কিন্তু একটিবার যেই বিগড়েছে অমনি তার অন্য মূর্তি ।রাতে নন্দর কাছে নিতাই জানতে পারলো, বাবা রোগ-বালাই-সমস্যার উপাচার করে টাকা পয়সা কিছু নেন না । কেউ কিছু খুশি হয়ে দিতে চাইলে মায়ের মন্দিরে দান করে যায় ।এ ছাড়া আরো এমন একটা কথা নন্দর মুখে শুনলো নিমাই যেটা ঠিক তার বিশ্বাস হলো না ।নন্দ বলেছিলো, যে সব রুগীর গায়ে অন্যরকমের হাওয়া- বাতাস, ঝড়-ফুঁক, তন্ত্র-মন্ত্র-জাগ-যজ্ঞে তারা জব্দ হয় না । এই সব বেয়াড়া অশরীরীদের গোঁয়ার্তুমি ঠান্ডা করতে ওই শেকল বাঁধা বেড়ালটাকে কাজে লাগান মাধব বাবাজি । দেখতে বেড়াল হলেও সে আসলে একটা আস্ত বেয়াদব জীন ।বিশেষ তিথিতে পবিত্র দেহ-মনে পঞ্চমুন্ডীর আসনে বসে তবেই তাকে কায়দা করা যায় ।

পরেরদিন বিকেলের দিকে, কোনো কাজ না থাকায় গ্রামটা একটু ঘুরে দেখতে ইচ্ছে করল নিতাইয়ের । গ্রামে আসার পর থেকে রাঘব অনেকটা ভালো আছে । স্বাভাবিক কথাবার্তা বলছে, খাচ্ছে-ঘুমুচ্ছে। তাই তাকে ঘরে রেখেই গ্রাম দেখতে বেরোলো নিতাই । গ্রামের প্রান্তে একটা নদী আছে । তার ধারে হাট বসে । আজ মঙ্গলবার । নদীর ধারে আজ হাট বসার কথা । সেদিকেই হাঁটা লাগলো সে । গ্রামের হাট ঘুরে দেখতে খুব ভালো লাগে নিতাইয়ের ।রাস্তায় কয়েকটা পাড়া ঘর পেরিয়ে নদীর ধারে পৌঁছলো সে।জমজমাট গ্রাম্য হাট । শাক-সবজি, চাল-ডাল যেমন আছে, তেমনি বাসন কোসন, মাটির হাঁড়ি-কুরি,হাঁস-মুরগি ছাগলও নিয়ে বসেছে অনেকে । হাটে এক জায়গায় লোহার শিকল বিক্রি হতে দেখে হঠাৎ কি মনে করে চমকে উঠলো নিমাই ।সর্বনাশ !বেরোনোর সময় তো ঘরের শিকলটা দিয়ে আসা হয় নি ! আজ মঙ্গলবার ।নন্দও তো বাড়িতেই ছিল ।তাকেও কিছু বলে আসা হয় নি । ভয়ে-দুশ্চিন্তায় এক মুহূর্তে হাত-পা  ঠান্ডা হয়ে গেলো নিমাইয়ের । পড়িমরি করে সে বাড়ি ফেরার পথ ধরলো । প্রায় ছুটতে ছুটতে বাড়িতে পৌঁছে সে দেখলো ঘরের দরজা হাট করে খোলা, ঘরে কেউ নেই । নিতাই বুঝলো বিরাট ভুল করে ফেলেছে সে । কোনদিকে যাবে, কোথায় খুঁজবে রাঘবকে, কয়েক মুহূর্ত কিছু ঠিক করতে পারলো না নিতাই । হঠাৎ মনে হলো, মাধব বাবার বাড়ির কথা ।রাঘব তো এ গ্রামের ওই একটা জায়গাই চেনে ।ওখানে যায়নি তো ?

একই মায়ের পেটের ভাই । ভাই হয়ে ভাইয়ের মনের হদিশ জানবে না ! নিতাইয়ের অনুমানই সত্যি হলো । মাধব বাবার বাড়ি গিয়ে সে দেখে, রাঘব চুপচাপ গুটিসুটি মেরে মন্দিরের দালানে বসে আছে । বাবা আজ বাড়িতে নেই ।আশপাশের কোনো গ্রামে জরুরি উপাচারে গেছেন । চুপচাপ  ভাইকে নিয়ে বাড়ি ফিরলো নিমাই।বিপদ কেটে গেছে দেখে নন্দকেও কিছুই বললো না নিমাই । কিন্তু বিপদ যে কাটেনি কিছুক্ষন পরেই সেটা বোঝা গেলো । সন্ধে হবো হবো করছে । নন্দর বাড়ির দাওয়ায় বসে দু’ভাই মুড়ি-ছোলা সেদ্ধ খাচ্ছে । কি একটা কাজে নন্দ গেছে কাছেই এক যজমানের বাড়ি ।হঠাৎ রাঘবের ডান হাতের কব্জির দিকে নজর পরে গেলো নিতাইয়ের । চমকে উঠে রাঘবকে জিজ্ঞাসা করলো, “একী ! তোর কব্জি কেটে রক্ত পড়ছে কেন ?”রাঘব হেসে বললো, “ও কিছু না । ভোমার আঁচড় লেগেছে ।”

নিতাই জিগ্যেস করলো, “ভোমা কে ?”

হেঁয়ালি করে রাঘব বললো, “ভোমা কে, জানে মাধব বাবা । তাকে আজ তুমি কোথায় পাবে ! তিনি তো বাড়ি নেই । যাও, নন্দদাকে জিজ্ঞেস করো,যদি বলে ।”রাঘবের কথাবার্তা ভালো ঠেকলো না নিতাইয়ের ।

তাকে ঘরে রেখে বাইরে থেকে শিকল দিয়ে দিল নিতাই । হাত-পা তার কাঁপছে ।

দাওয়ায় বসে রইলো নিতাই নন্দের ফেরার অপেক্ষায় । বাড়ি ফিরে নিতাইয়ের মুখে ব্যাপারখানা শুনে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে চুপ করে গেলো নন্দ । দূরে, গোধূলির লালচে-নীল আকাশে এক জায়গায় কয়েকটা উঁচু পাকুড় গাছের মাথার উপর একসঙ্গে অনেকগুলো কাক ঝাঁক বেঁধে চক্কর খেতে খেতে কা-কা করে তারস্বরে চেঁচাচ্ছিলো । সেই দিকে একদৃষ্টে কিছুক্ষন তাকিয়ে থেকে নিতাইকে সে শুধু বললো, “গুরুজী বারণ করার পরেও ভাইকে একা রেখে বেরোনো আপনার উচিত হয়নি ।উনি জানতে পারলে আর রক্ষে থাকবে না ।”আর কোনো কথাই নন্দর মুখ থেকে বের করতে পারলো না নিতাই ।

রাত্তিরে বিছানায় শুয়ে কিছুতেই ঘুম আসছিলো না নন্দর । কুঁজো গড়িয়ে এক গেলাস জল খেয়ে ফের শুতে যাবে, দেখলো ওদিকের ঘরে এখনো আলো জ্বলছে । তার মানে, নিতাইবাবুরা এখনো ঘুমোয়নি। এতো রাত্তির পর্যন্ত  জেগে কি করছে ওরা দুভাই! বিছানায় শুয়ে এপাশ-ওপাশ করতে করতে প্রায় ঘুম এসে গেছে এমন সময় দরজায় ঠক ঠক শব্দ । হারিকেন উঁচিয়ে দরজা খুলে নন্দ দেখে নিতাই দাঁড়িয়ে । চোখে-মুখে উদ্বেগের ছাপ ।

(৩)

নিতাই একটু সংকোচ নিয়ে বললো, “এতো রাতে বিরক্ত করলাম বলে কিছু মনে করো না । একটা লেপ বা মোটা তোষক হবে ?”

নন্দ আকাশ থেকে পড়লো, “এই জষ্ঠি মাসে লেপ!”

নিতাই বললো, “রাঘবের কাঁপুনি দিয়ে  জ্বর এসেছে । ভুল বকছে। আমার কাছে চাদর, কাপড়-চোপড় যা ছিল সব চাপিয়েছি । কিন্তু কাঁপুনি থামছে না।”

নন্দ বললো, “কই, চলুন তো দেখি কি ব্যাপার ।”

নিতাইয়ের ঘরে গিয়ে হারিকেনের অল্প আলোয় নন্দ যা দেখলো তা সত্যি অবাক করার মতো । তক্তপোষে রাঘব নেই !  সে শুয়ে আছে মেঝেয় শতরঞ্চি পেতে, কুঁকড়ে কুন্ডলি পাকিয়ে । গায়ে তার রাজ্যের জামা-কাপড়,চাদর, এমনকি নিজের পাশ-বালিশটাও চাপিয়ে দিয়েছে নিতাই । কাপড়ের সেই স্তুপের আড়াল থেকে শুধু মুখটা বের করে কাত হয়ে খুব জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছে রাঘব ।আর সেই সঙ্গে থর-থর করে কেঁপে কেঁপে উঠছে তার শরীরটা । দাঁতে দাঁত ঠুকে কিড়মিড় করে শব্দ করছে মুখে । ব্যাপারখানা বুঝে নিচু হয়ে রাঘবের কপালে হাত ছুঁয়ে দেখতে গেলো নন্দ।অমনি একটা বিশ্রী ঘড়ঘড়ে গলায় খিলখিল করে হেসে উঠলো সে । চমকে উঠে তিন পা পিছিয়ে গিয়ে নিতাইয়ের গায়ে গিয়ে পড়লো নন্দ । হারিকেনের ক্ষীণ আলোয় সে দেখলো, কাঁচা সোনার মতো চক চক করছে রাঘবের ফিকে হলদে রঙের দুটো চোখ । মনি দুটো গাঢ় সবুজ । দু’চোখের চারপাশে ঘন কালো দাগ, যেন এইমাত্র কেউ তার চোখে গাঢ় করে কাজল লাগিয়ে দিয়েছে । রাঘবের  নাকের দু’পাশে আর কপালে এমন কতগুলো ভাঁজ দেখা দিয়েছে যে হাসলে তাকে ভীষণ হিংস্র দেখাচ্ছে ।অমন ভয়ঙ্কর চোখ-মুখ রাঘবের হলো কি করে ! আরো একটা জিনিস লক্ষ্য করে তার হৃদপিন্ডে খিল ধরার উপক্রম হলো । মুখের সবকটা দাঁত বের করে হাসছে রাঘব। আর সেই সারির উপরের পাটির দুপাশে দু’টো দাঁত বেয়াড়া রকমের বড় আর ছুঁচোলো ।রাঘবের থেকে মুখ ফিরিয়ে সে নিতাইয়ের দিকে তাকালো । সে দেখলো নিতাইয়ের অবস্থা তার চেয়েও খারাপ, বড় বড় চোখ করে সেও ভাইয়ের মুখের দিকেই তাকিয়ে আছে ।কপালে তার বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে ।

বেশ একচোট হেসে নিয়ে রাঘব ফিসফিসিয়ে বললো, —–

“পোষ মানে না ঘড়েল ,

বাঘ, বাগদি, সড়েল—”

মাধব রোজার শিষ্য নন্দ। আজ অব্দি কত কিম্ভুত ব্যাপার স্যাপারই চোখের সামনে ঘটতে দেখেছে ।এসব কবেই তার ধাতে সয়ে গেছে । তবু একটা অজানা আশংকায় বুকের ভিতর ঢিপঢিপানি । মনের ভয়-ভীতি যতটা সম্ভব চেপে রেখে সহজ গলায় সে বললো, “বেশ গোলমেলে ব্যারাম বাধিয়েছে দেখছি তোমার ভাই । কাল সকালে ওকে তৈরী রেখো, মুকুন্দ ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হবে ।” এই বলে নিতাইয়ের ঘর থেকে বেরিয়ে নিজের ঘরে ঢুকেই ভালো করে দরজায় খিল এঁটে শুয়ে পড়লো নন্দ । শুয়ে তো পড়লো, কিন্তু ঘুম কি আর আসে! কেবলই যেন মনে হয় তার কানের কাছে কে যেন ফিসফিস করে বলছে, “পোষ মানে না ঘড়েল, বাঘ, বাগদি, সড়েল—–।”শেষে জোর করে চোখ বন্ধ করে মড়ার মতো শুয়ে রইলো নন্দ ।কখন ঐভাবে ঘুমিয়ে পড়েছিল মনে নেই নন্দর । হঠাৎ কিসের একটা অস্পষ্ট শব্দে ঘুমটা ভেঙে গেলো তার । শুয়ে শুয়েই কান খাড়া করে শব্দটা শুনতে চেষ্টা করলো নন্দ । আর  কোথাও কোনো শব্দ নেই । পাশ ফিরে নিশ্চিন্ত মনে আবার ঘুমোতে যাবে , ঠিক সেই সময় আবার শব্দটা শুনতে পেল নন্দ । এবার একেবারে স্পষ্ট ।ভালো করে শুনে নন্দ বুঝলো শব্দটা  আসলে আসছে নিতাইদের ঘরের দিক থেকে । একটা ভীষণ হুটোপুটি-ঝাপ্টাঝাপ্টির আওয়াজ, সেই সঙ্গে একটা বিশ্রী গরগর-ঘরঘর শব্দ । কেউ যেন ভীষণ আক্রোশে ফুঁসছে । শব্দটা কিন্তু ওই একবার হয়েই থেমে গেলো । নন্দর খুব ইচ্ছে করল একবার জানালা দিয়ে উঁকি মেরে দেখে নিতাইয়ের ঘরের দিকটা, কিন্তু তার দেহ নড়লো না, পা সরল না । চুপ করে সে শুয়েই রইলো ।বড়োজোর মিনিট পাঁচেক  গড়িয়েছে সবে , আবার একটা অদ্ভুত শব্দ ।  এবার সেটা আরো কাছে , একেবারে দোরগোড়ায় । দম বন্ধ করে আওয়াজটা আন্দাজ করতে চেষ্টা করল নন্দ । আবার — “খচ-খচ,খচ-খচ”! কেউ বা কিছু যেন আঁচড় কাটছে তার দরজায় ।আওয়াজটা বারকয়েক হয়েই থমকে গেলো । এরপর আরো কিছুক্ষন কেটে গেলো, সব চুপচাপ । তারপর যা ঘটলো তাতে নন্দর সাহসী ছাতির ভিতরটাও ধড়াস করে লাফিয়ে উঠলো । নন্দর ঘরের পুব দিকের জানালাটা খোলাই ছিল । সেটা দিয়ে বাইরে উঠোনের কৃষ্ণা চতুর্দশীর চাঁদের একচিলতে ম্লান আলো ঘরের অন্ধকার দেয়ালে এসে পড়েছে । সেই আলোয় নন্দ দেখলো তার জানলায় কিছু একটা উঁকি দিচ্ছে ।তারই আবছায়া এসে পড়েছে দেওয়ালে । ঘরের বাইরে থেকে একটা লোমশ কুকুর জানালায় দু’থাবা তুলে শার্সির ফাঁক দিয়ে ঘরে উঁকি দিচ্ছে ।

নাঃ , কুকুর তো নয় । সাধারণ কুকুরের মাথার চেয়ে অনেকটা বড়োসড়ো, কালো কুচকুচে । চোখদুটো অন্ধকারে ধিক ধিক করে জ্বলছে ।মুখের ফাঁকে ঝিলিক দিচ্ছে সাদা দাঁতগুলো, লকলক করে বাইরে ঝুলছে জিভ ।জানালায় প্রাণীটাকে ঐভাবে উঁকি দিতে দেখে ধড়ফড় করে বিছানায় উঠে বসলো নন্দ ।প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই জানালা থেকে অদৃশ্য হলো মাথাটা । কিছুক্ষনের নীরবতা, তার পরেই পাড়ার সব ক’টা সমস্বরে চিৎকার জুড়ে দিলো । কিছু একটা দেখে যেন হঠাৎ ক্ষেপে উঠেছে ওরা।কুকুরগুলো আরো কিছুক্ষন চেঁচিয়ে থেমে গেলো ।তারপরই অনেক দূরে কোথায় যেন একটা কুকুর ডুকরে কেঁদে উঠলো ।একবার, দু’বার, তারপর সব চুপচাপ, নিস্তব্ধ ।

বিছানায় ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে বসে থেকেই রাত ভোর করে ফেললো নন্দ । দিনের আলো ফুটতেই দরজা খুলে সে দেখলো নিতাইয়ের ঘরের দরজা আধ খোলা । ঘরে ঢুকে নন্দ যা দেখলো, তাতে কাল রাত্তিরের ঘটনার বাকিটুকু বুঝতে তার আর দেরি হলো না । নিতাইয়ের ঘরের একেবারে লণ্ডভণ্ড অবস্থা, বিছানা-বালিশ, চাদর তছনছ।হারিকেনটা মেঝেয় উল্টে পড়ে রয়েছে ।তা থেকে তেল বেরিয়ে মাটিতে গড়াচ্ছে । এরই মধ্যে মেঝেয় কয়েকটা চেনা  জিনিস পড়ে থাকতে দেখে চোখ স্থির হয়ে গেলো নন্দর । একটা  শতছিন্ন পোশাক, একটা লোহার বালা আর একটা তামার আংটি । এ সবই তো  রাঘবের । কিন্তু রাঘব কোথায় গেলো ? নিতাইই বা কোথায়?

রাঘবকে আর দেখতে না পেলেও নিতাইকে বেশিক্ষন খুঁজতে হলো না নন্দর । ওই ঘরেরই এক কোনে মেঝেয় গুটিশুটি মেরে বসেছিল নিতাই । একটা হাত মুঠো করা, তাতে একগোছা কুচকুচে কালো লোম । তাকে ঘর থেকে বের করে আনতে শেষ পর্যন্ত পাড়ার লোকজন ডাকতে হলো নন্দকে ।কারন, সে আর স্বাভাবিক অবস্থায় ছিল না । অনেকবার তাকে রাঘবের কথা জিজ্ঞেস করা হয়েছিল । উন্মত্ত নিতাই বারবার একই উত্তর দিয়েছে, “ভোমা বাড়ি ফিরে গেছে ।”প্রতিদিন সকালে মন্দিরের তেঁতুলতলায় গিয়ে মাধবের পোষা বিড়ালকে একবাটি দুধ দিতো নন্দ । সেদিন আর সেটা তাকে দিতে হয়নি । সাত সকালে ছুটতে ছুটতে গিয়ে মাধবকে সে খবর দিলো, ভোমা মারা গেছে। আগের দিন রাতে কেউ এসে তার টুঁটি কামড়ে ছিঁড়ে দিয়ে গেছে ।

Published on: ডিসে ১৫, ২০১৯ @ ১৭:০০


শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

− 5 = 5